খালেদ খান আর নেই

প্রকাশ:| শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর , ২০১৩ সময় ১১:৫৮ অপরাহ্ণ

খালেদ খানবিশিষ্ট মঞ্চ ও টিভি অভিনয়শিল্পী এবং নির্দেশক খালেদ খান আর নেই (ইন্নালিল্লাহি …. রাজিউন)। রাত ৮টা ২০ মিনিটে তিনি বারডেম হাসপাতালের আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর। তিনি স্ত্রী বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী মিতা হক ও একমাত্র মেয়ে ফারহিন খান জয়িতা এবং অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। খালেদ খান সোমবার অসুস্থ বোধ করলে তাকে বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর থেকেই তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। খালেদ খান দীর্ঘদিন ধরে মোটর নিউরন সমস্যায় ভুগছিলেন। এর ফলে তার শরীরের মাংসপেশী অকেজো হয়ে যায়। দেশীয় নাট্যাঙ্গনের জনপ্রিয় অভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক খালেদ খান। বন্ধুমহলে তিনি যুবরাজ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৫৮ সালের ৯ই ফেব্রয়ারি টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনে ১৯৮১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম এবং ১৯৮৩ সালে ফিন্যান্স বিষয়ে এম কম সম্পন্ন করেন খালেদ খান। দীর্ঘ ২৮ বছর নিয়মিত থিয়েটার ও টিভি নাটকে অভিনয় করে শক্তিমান এক অভিনেতায় পরিণত হয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে নব্বই দশকে একাধিক টিভি নাটকে অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা পান। এদিকে ১৯৭৮ সালে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে মঞ্চ নাটকে তার যাত্রা শুরু হয়। মঞ্চে তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’, ‘অচলায়তন’, ‘নুরালদীনের সারা জীবন’, ‘ঈর্ষা’, ‘দর্পণ’, ‘গ্যালিলিও’ ও ‘রক্তকরবী’। ‘ঈর্ষা’ নাটকে অভিনয়ের জন্য তিনি কলকাতা থেকেও ডাক পান। এদিকে নাটকে সফলভাবে পথচলার পর পরিচালনাও শুরু করেন খালেদ খান। তার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’, ‘পুতুল খেলা’, ‘কালসন্ধ্যায়’, ‘মাস্টার বিল্ডার’, ‘ক্ষুদিত পাষাণ’সহ আরও বেশ কিছু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় আলী যাকের, সারা যাকের, আতাউর রহমান, ফেরদৌসি মজুমদারদের অভিনয় দেখে অনুপ্রাণিত হতেন খালেদ খান। ১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে টিভি নাটকে অভিষেক হয় তার। তার অভিনীত প্রথম টিভি নাটক হলো ‘সিঁড়িঘর’। এরপর অসংখ্য টিভি নাটকে অভিনয় করে দর্শক হৃদয় জয় করেছেন খালেদ খান। একাধিক নাটকে তার বেশ কিছু সংলাপও জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে নব্বই দশকের নাটক ‘রূপনগর’ এ তার ‘ছিঃ ছিঃ, তুমি এতো খারাপ’ শীর্ষক সংলাপটি চলে আসে মানুষের মুখে মুখে। তার অভিনীত জনপ্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘এইসব দিনরাত্রী’, ‘তুমি কোন কাননের ফুল’, ‘রূপনগর’, ‘মফস্বল সংবাদ’, ‘অথেলো এবং অথেলো’, ‘দমন’, ‘লোহার চুড়ি’, ‘সকাল সন্ধ্যা’সহ আরও বেশ কিছু। এদিকে মঞ্চ ও টিভি নাটকের ক্ষেত্রে খুব বেছে বেছে কাজ করার পক্ষপাতী ছিলেন খালেদ খান। সে কারণেই তার করা বেশিরভাগ নাটকই ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। এদিকে অভিনয়ের পাশাপাশি পেশাগতভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময় কর্মরত ছিলেন খালেদ খান। এর মধ্যে ১৯৮৯ সালে ‘অক্সফাম’ নামক একটি এনজিওতে কাজ শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পদে বেক্সিমকো ফার্মায় কর্মরত ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে একুশে টিভির জেনারেল ম্যানেজার, ২০০২ সালে ইউনিভার্সাল টেলিভিশনের হেড অব প্রোগ্রাম ও নিউজ, ২০০৫ সালে বেঙ্গল গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, ২০০৭ সাল থেকে ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে ডেপুটি ডিরেক্টর (এডমিনিস্ট্রেশন) এবং ২০০৯ সাল থেকে সর্বশেষ তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মঞ্চ নাটকে অনবদ্য অবদানের জন্য ‘মোহাম্মদ জাকারিয়া পদক’, সেরা অভিনেতা হিসেবে ‘নুরুন্নাহার স্মৃতিপদক’, সেরা পরিচালক হিসেবে সিজেএফবি পুরস্কার এবং সেরা টিভি অভিনেতা হিসেবে ‘ইমপ্রেস-অন্যদিন’ পুরস্কার অর্জন করেছিলেন তিনি। কীর্তিমান এই গুণী শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আগামীকাল সকাল সাড়ে ১০টায় তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে।