খানখানাবাদ শুধুই ধ্বংসস্তূপ

প্রকাশ:| রবিবার, ২২ মে , ২০১৬ সময় ১১:৩৩ অপরাহ্ণ

জোয়ারে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বাড়ি-ঘরের দেয়াল ধসে ও পানিতে ডুবে শুধু বাঁশখালীতেই নয়জন শিশু, নারী-পুরুষের মৃত্যু হয়েছে। বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। রোববার দুপুর ১২ টা পর্যন্ত বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নে ৯ জন নারী, শিশু ও বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খানখানাবাদে মারা গেছেন, আবু ছিদ্দিক (৫০), রুবি আক্তার (৫০), জালাল উদ্দিন (৩) জান্নাতুল মাওয়া (৪), শাহেদা আক্তার (৩)। গণ্ডামারা ইউনিয়নে চরের পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে মারা গেছেন নুরুল কাদের (৫৫) ও আবুল হোসেন (৪০) নামে দুই ভাই। ছনুয়া ইউনিয়নে দেওয়াল চাপা পড়ে মারা গেছেন মো. হারুনের স্ত্রী তাহেরা বেগম (৩৫)। এছাড়া দেড় মাস বয়সী এক অজ্ঞাত শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের প্রেমাশিয়া বাজারটি একেবারে সাগর উপকূলে। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আঘাত হানার আগে বাজারের আশপাশে ছিল শত শত বাড়িঘর। রোয়ানুর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ওই এলাকায় আজ রোববার গিয়ে দেখা গেল শুধুই ধ্বংসস্তূপ।
ওই এলাকার একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে আজ সকালে উদ্ধার করা হয় আয়েশা খাতুন (৫৫) নামের এক নারীর মরদেহ। শনিবার আঘাত হানা রোয়ানু এই খানখানাবাদ ইউনিয়নেই কেড়ে নিয়েছে নারী, শিশু বৃদ্ধসহ সাতজনের প্রাণ।
প্রেমাশিয়া বাজার এলাকায় ধ্বংসস্তূপের ওপরে বসে ঘুরে দাঁড়ানো চিন্তায় নিমগ্ন তাঁরা। ছবি: জুয়েল শীলখানখানাবাদ ছাড়াও বাঁশখালীর গণ্ডামারা, পুকুরিয়া, ছনুয়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন রোয়ানুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছনুয়াতে মারা গেছে দুজন। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নের নাম খানখানাবাদ। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) হিসাবে এখানে মোট ঘর ছিল ছয় হাজার ৪৯০ টি। এর মধ্যে অন্তত দুই হাজার ঘর একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ঘরগুলোর মধ্যে কোনোটির চাল উড়ে গেছে, কোনোটির দেয়াল পড়ে গেছে আবার কোনো ঘরের ভেতরে এখনো থই থই করছে পানি।
খানখানাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান আবু ছিদ্দিক তাঁর কার্যালয়ে বসে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে এমন কোনো বাড়ি-ঘর কিংবা দোকানপাট নেই যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি কিংবা পানি ঢোকেনি। বেশি ক্ষতি হয়েছে পশ্চিমাংশে। দুই হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। এখনো মানুষ সাইক্লোন সেন্টারে অবস্থান করছে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিয়নটির পশ্চিম রায়ছটা গ্রাম এখনো পানির নিচে। পানি রয়েছে উত্তর এবং পূর্ব রায়ছটা এলাকায়ও। রাস্তাঘাট খাল-বিল ঘর বাড়িতে এখনো জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে পানি উঠছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইউনিয়নের ২,৩, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের।
ঘূর্ণিঝড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ঘরবাড়ি। এর মধ্যেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজছেন কয়েকজন। ছবিটি প্রেমাশিয়া বাজার এলাকা থেকে তোলা। ছবি: জুয়েল শীলপ্রেমাশিয়া বাজারটি পড়েছে সাত নম্বর ওয়ার্ডে। বাজারের শেষ মাথায় সাগর। কিন্তু সাগর থেকে রক্ষার জন্য কোনো বেড়িবাঁধ নেই। ছোট একটি আইলের মতো মাটির বাঁধ থাকলেও রোয়ানুর আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে পানি এসেছে বাঁধের ওপর দিয়ে।
বাজারের সঙ্গে লাগোয়া সাগরের কূল ঘেঁষে তলাইয়ার বাড়িতে ৪০টির মতো পরিবার বাস করত। আজ দেখা গেল, সেখানে কোনো বাড়ি ঘরের অস্তিত্বই নেই। ঘরের চিহ্ন হিসাবে মাটির চুলার ভগ্নাংশ, বেড়া কিংবা ছাউনির একটি অংশ পড়ে রয়েছে। এই বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে রোববার সকালে উদ্ধার করা হয় দিনমজুর আবদুল খালেকের স্ত্রী আয়েশা বেগমের লাশ।
আবদুল খালেক বলেন, ‘ঝড়ের সময় আমরা বের হয়ে রাস্তায় চলে আসি। কিন্তু সে বের হতে পারেনি। আমরা কোনোরকমে একটি বড় বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আজ সকালে তাঁর লাশ ধ্বংসস্তূপ উদ্ধার করি।’
রোয়ানু কেড়ে নিয়েছে এই এলাকার মো. ইসমাইলের তিন বছরের শিশু কন্যা জান্নাতুল মাওয়াকে। ইসমাইল বলেন, ঝড় যখন শুরু হয়, ঘরে পানি ঢুকতে শুরু করলে আমরা এক গলা পানি ডিঙিয়ে বের হচ্ছিলাম। তখন হাত থেকে মেয়েটি ছুটে যায়। বলতে বলতে গলা ভারী হয়ে আসে ইসমাইলের।
ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ঘরবাড়ি। আবার বেঁচে থাকার সংগ্রাম শুরুর চেষ্টা প্রেমাশিয়া বাজার এলাকার এই পরিবারটির। ছবি: জুয়েল শীলএই এলাকার তলাইয়ার বাড়ি, রোসাঙ্গির পাড়া, মৌলভীপাড়ার সব বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন। তলাইয়ার বাড়ির নেজাম উদ্দিন বলেন, ‘আপনারা দেখেন এখানে কোনো বাড়িঘর আছে কি না। আমরা এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছি।’
প্রেমাশিয়া বাজারে প্রায় ৬০টি দোকান রয়েছে। সবগুলো দোকানেই পানি ঢুকেছে। এ ছাড়া ছাউনি কিংবা বেড়া উড়ে চলে গেছে। বাজারের চা দোকানি নূরুন্নবী দোকানের ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমরা সবাই নিঃস্ব গেছি।’
বাজারের পাশে দক্ষিণ প্রেমাশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, শত শত নারী ও শিশু। সঙ্গে গবাদিপশুও। তাদের চিড়া আর গুড় দেওয়া হচ্ছিল।
পশ্চিম রায়ছটা গ্রামের সোহেল বলেন, ‘আমাদের বাড়িঘর এখনো পানির নিচে। আমি এখন বাড়ির লোকজনের জন্য চাল-ডাল নিয়ে যাচ্ছি। কোথায় রান্না হবে তা বলতে পারছি না।’
সকালে দুর্গত এলাকাটি পরিদর্শনে যান স্থানীয় সাংসদ মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, পুরো বাঁশখালীর দুর্গত মানুষের জন্য ৫০০ টন চাল এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর জন্য এক লাখ টাকার চিড়া বরাদ্দ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ত্রাণ দেওয়া হবে।
বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামসুজ্জামানের হিসাবে বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নে ১০ হাজারের মতো বাড়িঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ছাড়া চিংড়ি ঘের এবং লবণ মাঠেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আংশিক বিধ্বস্ত বাড়িঘরও কম নয় বলে তিনি জানান।


আরোও সংবাদ