ক্রেতাদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে পেঁয়াজ

প্রকাশ:| শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর , ২০১৩ সময় ১০:৪৩ অপরাহ্ণ

পেঁয়াজক্রেতাদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে পেঁয়াজ। কোনোভাবেই পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যাচ্ছে না। কিছু উদ্যোগ নিয়েও পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
এরই মধ্যে আবার সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। তা-ও আবার বেশি দামে। প্রতি কেজি ৫৫ টাকা কেজি দরে। এর আগে টিসিবি পেঁয়াজ বিক্রি করেছিল ৪৭ টাকা কেজি দরে।
দেশের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়ায় প্রতিবছরই কয়েক লাখ টন পেঁয়াজের ঘাটতি থেকে যায়। এ ঘাটতি মেটাতে হয় আমদানি করে। আর দেশে বেশির ভাগ পেঁয়াজই আমদানি হয় ভারত থেকে। ভারতে অব্যাহতভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণেই দাম বাড়ছে।
আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের পেঁয়াজের চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি মেটানো হয় ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ দিয়ে। ভারতে গত কয়েক দিনে পেঁয়াজের কেজি আবারও ৮০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। তাই বেশির ভাগ আমদানিকারকই ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির সাহস দেখাচ্ছেন না। মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আসছে খুবই কম পরিমাণে। বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ-সংকট দেখা দেওয়ায় সুযোগ বুঝে ক্রেতার কাছ থেকে দাম বেশি নিচ্ছেন বিক্রেতারা।
কারওয়ান বাজারে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাজার করতে এসে দুই কেজি দেশি পেঁয়াজ কেনেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোশাররফ হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে কখনো পাঁচ কেজির নিচে পেঁয়াজ কিনতাম না। এখন এক কেজি, দুই কেজিও কিনতে হচ্ছে।’
রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে গতকাল প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৭৫ আর ভারতীয় পেঁয়াজ ৯০ টাকা দরে বিক্রি হয়। চীনের কিছু পেঁয়াজও বাজারে দেখা গেছে।
শ্যামবাজারের আমদানিকারক পপুলার বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী রতন সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পেঁয়াজের জন্য আমরা ভারতের ওপর নির্ভরশীল। সে কারণে ভারতে না কমা পর্যন্ত দেশেও দাম কমবে না।’
শ্যামবাজারে গতকাল প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৩, আর ভারতীয় পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া চীন ও পাকিস্তান থেকে আমদানি হওয়া কিছু পেঁয়াজও বিক্রি হচ্ছে। চীনের পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ আর পাকিস্তানের পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি। এর মধ্যে চীনের পেঁয়াজে ক্রেতাদের আগ্রহ কম। আবার পাকিস্তানের পেঁয়াজ আমদানি করে আনতে আনতে অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আমদানি) মনোজ কুমার রায় গতকাল মন্ত্রণালয়ে পেঁয়াজ আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আমদানিকারকেরা তাঁকে জানান, ভারতে নতুন পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি স্বাভাবিক হবে এবং বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক হবে।
পেঁয়াজের আমদানি কমেছে
ভারত থেকে এ দেশে বেশি পেঁয়াজ আমদানি হয় মূলত সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে। ভোমরা বন্দর দিয়ে চলতি সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি পেঁয়াজবাহী ট্রাক এ দেশে প্রবেশ করেছে। গত বুধবার এসেছে ১৩টি ট্রাক।
বন্দরের সহকারী কমিশনার উত্তম বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, দুই মাস আগেও এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ১৬০ ট্রাক পেঁয়াজ দেশে আসত। ভারত রপ্তানিমূল্য ৬৫০ ডলার বেঁধে দেওয়ার পর পেঁয়াজের আমদানি কমে যায়।
সোনামসজিদ আর হিলি স্থলবন্দর দিয়েও ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি কমেছে। সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ ট্রাক পেঁয়াজ দেশে ঢুকছে। অথচ এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০টি পেঁয়াজবাহী ট্রাক আসে।
বন্দরকেন্দ্রিক আমদানিকারকেরা জানান, ভালো মানের ভারতীয় পেঁয়াজ প্রতিটন ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকায় আমদানি হয়েছে। আর কিছু পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে টনপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা দরে।
হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আগে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫টি ট্রাকে পেঁয়াজ এলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ থেকে ১৫টিতে। গত সপ্তাহে এক হাজার ১২২ টন পেঁয়াজ আমদানি হলেও চলতি সপ্তাহের বুধবার পর্যন্ত হয়েছে ৮৮২ টন। প্রতিটন পেঁয়াজের দাম পড়েছে ৫১ হাজার টাকায়।
দাম বাড়াল টিসিবিও
পেঁয়াজসোমবার থেকে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করছে টিসিবি।
জানতে চাইলে টিসিবির তথ্য কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘পণ্য বিক্রির দাম নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বেশি দামে আমদানি করতে হওয়ায় এবার পেঁয়াজের দামও বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।’ তিনি জানান, আগেরবারের চেয়ে এবার কেজিতে ১২ টাকা বেশি দরে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে।
টিসিবির সূত্র জানায়, সরাসরি পদ্ধতিতে পেঁয়াজ আমদানির অংশ হিসেবে দু-এক দিনের মধ্যে ভারত থেকে ১০০ টন পেঁয়াজ দেশে এসে পৌঁছেছে। ওই পেঁয়াজটাই সোমবার থেকে বিক্রি হবে।
আন্তর্জাতিক দরপত্রের মধ্যমে পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে আমদানিকারকদের সাড়া পায়নি টিসিবি। ৫০০ টন পেঁয়াজ আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও কেউই এতে আগ্রহ দেখায়নি।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক কল্যাণ ব্যানার্জি (সাতক্ষীরা) ও আনোয়ার হোসেন (চাঁপাইনাবগঞ্জ) এবং হাকিমপুর প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম]
সূত্র-প্রথমআলো.কম


আরোও সংবাদ