কৈ মাছের চাষ

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১৫ মে , ২০১৪ সময় ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

কৃষিবিদ নিতাই চন্দ্র রায়।।
কৈ মাছ২এক সময় শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে ভারী বৃষ্টি হলে খালবিলের আশপাশে দূর্বাঘাসেও কৈ মাছ দেখা যেত। মেঘের ডাকে কৈ মাছ জলাশয় থেকে ডাঙায় উঠে আসে। বৃষ্টির পর ফসলের মাঠ থেকে কত কৈ মাছ ধরেছি, এখনও সেসব কথা মনে আছে। কৈ দেশীয় প্রজাতির একটি সুস্বাদু মাছ। সবুজাভ-সোনালি রঙের এ মাছ প্রাচীনকাল থেকে এ জনপদের প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। কৈ মাছ বাংলাদেশসহ এশিয়ার প্রায় ১৭টি দেশে পাওয়া যায়। দেশভেদে এদের বর্ণ, স্বাদ ও বৃদ্ধি ভিন্ন ধরনের হয়। বাংলাদেশে নির্বিচারে ফসলের মাঠে কীটনাশকের ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক জলাভূমির পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে দেশি জাতের এ সুস্বাদু মাছটির প্রাপ্যতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের কারণে স্বল্প আয়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে কৈ মাছ একটি দুষ্প্রাপ্য বিলাসী খাবার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুকুরে কৈ মাছের বৃদ্ধি কম হয়, তাই ২০০২ সালে থাইল্যান্ড থেকে এ কৈ প্রজাতির দ্রুত বর্ধনশীল জাতের কৈ বাংলাদেশে মৎস্য চাষে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু হ্যাচারিগুলোতে পোনা উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইনব্রিডিং বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণে থাই কৈ তার দ্রুত বর্ধনশীল বৈশিষ্ট্যটি হারিয়ে ফেলে; হারিয়ে ফেলে ইউনিট প্রতি উৎপাদন ক্ষমতাও। এছাড়া থাই কৈ-এর ফ্যাকাসে ধূসর বর্ণের জন্য উৎপাদনকারীরাও কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছিলেন না। এ অবস্থা উত্তরণের লক্ষ্যে স্বর্ণলতা এগ্রো ফিশারিজ লিমিটেড ২০১১ সালে ইনোভিশন কনসালটিং (প্রা.) লিমিটেড ও ক্যাটালিস্টের সহায়তায় ভিয়েতনাম থেকে দ্রুত বর্ধনশীল জাতের ভিয়েতনাম কৈ মাছের ব্রুডস্টক সংগ্রহ করে। ভিয়েতনাম কৈ-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি দ্রুত বর্ধনশীল, কিন্তুএর রঙ, স্বাদ ও চেহারা অনেকটা দেশি কৈ মাছের মতো।

ভিয়েতনাম কৈ মাছের গুরুত্ব : আমাদের দেশে আবহাওয়া ও জলবায়ু এ মাছ চাষের জন্য উপযোগী। এ মাছ দ্রুত বর্ধনশীল। মাত্র চার মাসে ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম ওজন হয়। দেশি কৈ মাছের মতো আকর্ষণীয় সবুজাভ-সোনালি বর্ণের জন্য এ মাছের বাজারমূল্য ও চাহিদা থাই কৈ মাছের চেয়ে অনেক বেশি। এর চাষ ব্যবস্থাপনা সহজ এবং অন্য মাছ চাষের চেয়ে তুলনামূলক লাভ বেশি। থাই কৈ মাছের সঙ্গে শিং ও মাগুর মাছের মিশ্র চাষ করে এর সঙ্গে বাজারজাত করা যায়।

ভিয়েতনাম কৈ মাছের চাষ : ভিয়েতনাম কৈ মাছের ভালো উৎপাদনের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে :

১. পুকুর নির্বাচন : ভিয়েতনাম কৈ মাছের জন্য কাদাযুক্ত এবং চার থেকে ছয় মাস পানি থাকে, এমন ১৫ থেকে ১০০ শতাংশ আয়তনের পুকুর নির্বাচন করতে হবে। তবে এর চেয়ে ছোট বা বড় পুকুরেও এটি চাষ করা যাবে।

২. পুকুর প্রস্তুতি : পুকুর সেচের মাধ্যমে শুকিয়ে অবাঞ্ছিত মাছ ও অন্যান্য প্রাণী দূর করতে হবে। পুকুরের তলায় অতিরিক্ত কাদা থাকলে তা উঠিয়ে ফেলতে হবে। পুকুরের পাড় মেরামত করতে হবে এবং পাড়ে গাছপালা থাকলে ডাল কেটে দিতে হবে। প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন বা বিস্নচিং পাউডার প্রয়োগ করতে হবে।

৩. পোনা সংগ্রহ : পুকুরে চাষের জন্য ভিয়েতনাম কৈ মাছের পোনা স্বর্ণলতা এগ্রো ফিশারিজ লিমিটেড, রাধাকানাই, ফুলবাড়িয়া, ময়মনসিংহের হ্যাচারি থেকে সংগ্রহ করা যাবে। পোনা পলিথিন ব্যাগে অঙ্েিজন দিয়ে পরিবহন করতে হবে।

৪. পোনা মজুদ : ০.১৫ থেকে ০.২০ গ্রাম আকারের সুস্থ ও সবল পোনা এককভাবে চাষে প্রতি শতক আয়তনের পুকুরের জন্য ৬০০ থেকে ৮০০টি হারে মজুদ করা যেতে পারে। মজুদের সময় পোনা পুকুরের পানির সঙ্গে খাপ খাইয়ে ছাড়তে হবে। এছাড়া শিং, মাগুর, রুই, সিলভার কার্প, মৃগেল ও সরপুঁটির সঙ্গে মিশ্র চাষের বেলা শতাংশপ্রতি কৈ মাছের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম হবে। এক শতক আয়তনের একটি পুকুরে শিং, মাগুর, রুই ও সিলভার কার্পের মিশ্র চাষে ভিয়েতনাম কৈ ৫০০ থেকে ৬০০, শিং-মাগুর ১০০, রুই দুই ও তিনটি সিলভারকার্পের পোনা থাকতে পারে। পোনা মজুদের সময় কিছু পোনা মারা যায়; তাই ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পোনা বেশি মজুদ করা উচিত।

৫. পুষ্টি চাহিদা : ভিয়েতনাম কৈ মাছের আমিষ চাহিদা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য থেকে আমিষের চাহিদা কিছুটা পূরণ হলেও ভিয়েতনাম কৈ মাছ চাষের জন্য পুকুরে উচ্চ আমিষযুক্ত ভাসমান খাদ্য প্রয়োগ করা উচিত।

৬. অন্যান্য ব্যবস্থাপনা : ক. প্রতি সাত থেকে ১০ দিন পর পর জাল টেনে মাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করে খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। খ. মাছ নিয়মিত খাবার খায় কিনা, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। গ. পোনা মজুদের এক মাস পর থেকে প্রতি মাসে শতাংশপ্রতি ১৫০ গ্রাম হারে জিওলাইট প্রয়োগ করতে হবে। ঘ. মজুদ পুকুরে এক মাস পর প্রতি ১৫ থেকে ২০ দিন অন্তর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পানি পরিবর্তন করতে হবে। ঙ. প্রতি ১৫ দিন অন্তর পানির গুণাগুণ যেমন তাপমাত্রা, অক্সিজেন, পিএইচ, অ্যামোনিয়া ও মোট ক্ষারত্ব পরীক্ষা করা উচিত। অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়ে গেলে বাজারে প্রচলিত অ্যাকোয়া-কেমিক্যাল ব্যবহার করে আ্যামোনিয়া দূরীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৭. রোগ ব্যবস্থাপনা : উচ্চমজুদ ঘনত্ব ও বদ্ধ জলজ পরিবেশে উচ্ছিষ্ট খাবার মাছের বিপাকীয় বর্জ্য পচে পানি দূষিত হয়ে কৈ মাছের রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। খামারের একবার জীবাণু প্রবেশ করলে তা নির্মূল করা বেশ কঠিন। তাই খামারে জীবাণু প্রবেশের আগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবস্থাগুলো হলো ক. ইনব্রিড বা ক্রসব্রিডমুক্ত সুস্থ ও সবল পোনা সংগ্রহ, খামার ও মাছ চাষের যাবতীয় সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা। খ. এক খামারের মাছ ধরার জাল অন্য খামারে ব্যবহার না করা। গ. খামারের পানি নিয়মিত পরীক্ষা করা। ঘ. উচ্চমজুদ হার পরিহার করা। ঙ. পরিমিত ও সুষম খাবার প্রয়োগ এবং খামার ও মাছের পরিচর্যা নিশ্চিত করা।

এছাড়া পরিবহনের সময় পোনা আঘাত পেলে এবং লালন পুকুরে ক্ষত রোগের সৃষ্টি হতে পারে। এ রোগ দমনের জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শীতের শুরু থেকে ১৫ দিন পরপর প্রতি শতাংশে ২৫০ গ্রাম লবণ ও ১৫০ গ্রাম জিওলাইট প্রয়োগ করতে হবে।

রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে প্রতি কেজি খাবারের সঙ্গে ৫ গ্রাম অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ও ২ গ্রাম ভিটামিন সি মিশিয়ে ১০ দিন প্রয়োগ করতে হবে।

৮. মাছ আহরণ ও উৎপাদন : আধানিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করলে তিন থেকে চার মাসে ভিয়েতনাম কৈ মাছের গড় ওজন ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম হবে। জাল টেনে ও পুকুর শুকিয়ে মাছ ধরতে হবে। এ পদ্ধতিতে তিন থেকে চার মাসে একরপ্রতি ৯ থেকে ১৫ টন উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।

৯. প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরামর্শ : খাবার প্রয়োগের এক ঘণ্টার পর পুকুর পর্যবেক্ষণ করা উচিত। যদি পুকুরে খাবার পাওয়া যায়, তবে বুঝতে হবে পুকুরে কিংবা মাছের কোনো সমস্যা হয়েছে। গ্রীষ্মকালে অনেক সময় পুকুরের পানি কমে যায়। এতে পানির তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে পুকুরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি দিতে হবে। একটানা মেঘলা আবহাওয়া কিংবা অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে অথবা খাবার দেয়া বন্ধ রাখতে হবে। প্রতিবার নতুন করে ভিয়েতনাম কৈ মাছ চাষ শুরু করার সময় অবশ্যই সম্পূর্ণ শুকিয়ে পুকুর প্রস্তুত করতে হবে।

লাভ : এক একর পুকুরে ভিয়েতনাম কৈ মাছের একক চাষ করে যাবতীয় খরচ বাদে ৪.০ থেকে ৪.৬ লাখ এবং মিশ্র চাষ করে ৫.০ লাখ টাকা লাভ করা সম্ভব।


আরোও সংবাদ