কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় পুঁজিবাজারে পতন!

প্রকাশ:| সোমবার, ৩১ মার্চ , ২০১৪ সময় ০৩:৪৭ অপরাহ্ণ

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতন হচ্ছে। আর এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকটি পদক্ষেপকে দায়ী করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার যে নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে তা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে পুঁজিবাজারকে।

সম্প্রতি সরকারের যেসব উদ্যোগে শেয়ারবাজার প্রাণ ফিরে পেয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনার কারণে তা আবার নিভে গেছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও আস্থার সংকট দেখা দেওয়ায় বাজার পতন প্রবণতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

এছাড়া প্রতি ৭ কার্যদিবস পর পর মার্চেন্ট ব্যাংকের বিনিয়োগ তথ্য, এনআরবি বিনিয়োগকারীদের তথ্য, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং অ্যান্টি মানি লন্ডারিং ইস্যুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থান পুঁজিবাজারের এ পতন প্রবণতাকে আরও বেগবান করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনার ফলে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর পোর্টফোলিও লিকেজ হওয়ার আশঙ্কায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে বাজারে সূচক কমছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহম্মেদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের নির্দেশনায় বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে বিনিয়োগ তুলে নেবে। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ছাড়া বাজারে বড় বিনিয়োগ অসম্ভব। এ বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন এ অর্থনীতিবিদ।

ডিএসই’র সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একের পর এক নির্দেশনা জারি করছে যা চূড়ান্তভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গা নষ্ট করে দিয়েছে। বিশেষ করে অ্যান্টি মানি লন্ডারিং ইস্যুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর অবস্থানের কারণে দেশীয় বড় বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে সরে গেছে।

এছাড়া মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি সাত কার্যদিবস পর পর বিনিয়োগ তথ্য চাওয়ায় তথ্য লিকেজ হওয়ার ভয়ও বাজার পতনে বড় ভূমিকা পালন করছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজার সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা জারি করার পূর্বে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাথে আলোচনা, সমন্বয় বা পরামর্শ করার অনুরোধ জানানো হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা করেনি। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এ বিষয়ে বিএসইসি’র নির্বাহী পরিচালক ও কমিশন মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান বলেন, আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বার বার অনুরোধ করেছি পুঁজিবাজার সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা দেওয়ার আগে যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কথা মাথায় রেখে কমিশনের সাথে আলোচনা করে। কিন্তু তারা সেটা না করলে এখানে আমাদের কিছু করার নেই।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, আমরা ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সীমার মধ্যে আনার জন্য এ নির্দেশনা জারি করেছি। তবে ব্যাংকগুলো কোথায় বিনিয়োগ করে সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। কারণ তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে থাকে। তাই এটা পুঁজিবাজারের সাথে খুব বেশি সম্পর্কিত না।

মার্চেন্ট ব্যাংকের বিনিয়োগ তথ্য চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো তাদের সীমার বাইরে গিয়ে বিনিয়োগ করে বাজারকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলে। ফলে চূড়ান্তভাবে তা বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমরা প্রথমে দৈনিক ভিত্তিতে তথ্য চেয়েছিলাম। সেখানে তাদের কোনো অসঙ্গতি পায়নি। তাই এখন প্রতি সাত কার্যদিবস পরপর তথ্য দিতে বলা হয়েছে।

পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক এ দরপতনকে বাজার সংশোধন বলে দাবি করেছেন ডিএসই’র পরিচালক শাকিল রিজভী। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে বাজার যেভাবে বেড়েছে তাতে ধারাবাহিক এ দরপতন ও লেনদেন কমাকে পুঁজিবাজারের পতন বলা যাবে না। এটা মূলত বাজার সংশোধন। তবে এরপরও যদি বাজারে দরপতন ঘটে তবে সেটা পতন পর্যায়ের বলে বিবেচনা করা হবে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেন, মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং পুঁজিবাজার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ দুটি সংস্থার সমন্বয় ছাড়া দুই বাজারের স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হলে বা টাকার প্রবাহ কমাতে উদ্যোগ নিলে তা পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। তেমনি পুঁজিবাজারে নিয়ন্ত্রণে এসইসি ব্যর্থ হলে ব্যাংকসহ সাধারণ নিয়োগকারীর বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়ে। তাই পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতায় এ দুই সংস্থার মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।

মার্চেন্ট ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পুঁজিবাজারে বিএসইসি’র অনুমোদনপ্রাপ্ত মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার শেয়ার ইক্যুইটি রয়েছে। যা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সবকটি ব্যাংকের পরিশোধিত, শেয়ার প্রিমিয়ার ও রিজার্ভের চেয়েও বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন বাস্তবায়ন করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের তাদের বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে বাজার থেকে তুলে নিতে হবে, যা বাজারে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


আরোও সংবাদ