কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে এলো সাপ !

প্রকাশ:| শনিবার, ২৯ অক্টোবর , ২০১৬ সময় ০৯:৪০ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ‌্যালয়ে চলমান ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার শুরুর দিন থেকেই টাকার বিনিময়ে অন্যের হয়ে পরীক্ষা (প্রক্সি) দেওয়ার অভিযোগে ধরা পড়ছেন বিভিন্ন শিক্ষার্থী। শনিবার আইন অনুষদের (ই ইউনিট) ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীনও জীববিজ্ঞান অনুষদের ৫০৫ নম্বর কক্ষ থেকে রমজান আলী নাম ব্যবহার করে পরীক্ষা দেওয়া একজনের সঙ্গে উত্তরপত্র অদল-বদল করছিল উম্মে হাবিবা নামের আরেক শিক্ষার্থী। বিষয়টি হল পরিদর্শকের নজরে আসলে তাদের ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির হাতে তুলে দেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবে অন্যদিনের প্রক্সিকাহিনী গুলোর মতো এটিকেও ধরে নিয়েছিল প্রক্টরিয়াল বডি।

কিন্তু না। কিন্ত এ দুজনের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসল একটি পরিবারের প্রক্সিচক্রে জড়িত থাকার পুরো কাহিনী। এ যেনো কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসা !

রমজান আলী নামে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যুবকের মূল নাম আসলে মোহাম্মদ শোয়েব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ব বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আর তিনি উম্মে হাবিবার আপন বড় ভাই।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। শনিবার বোনকে উত্তীর্ণ করতে শোয়েব পরীক্ষা দিতে আসলেও আসলে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীন তার মূল ‘পেশা’ টাকার বিনিময়ে অন্যের হয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া। আর পরীক্ষার্থী জোগাড় করে টাকা আদায় করার দায়িত্বটা তার বড় ভাই আহমেদ হোসেন সোহেলের। অর্থাৎ সোহেলই চক্রের মূল হোতা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী হিসেবে স্নাতকোত্তর করা আহমেদ হোসেন সোহেল ৩৫ তম বিসিএসে (প্রশাসনিক) ১৩৯ তম এবং নবম সহকারী জজ ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ পরীক্ষায়ও তিনি ৬১ তম হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

পুরো ঘটনাটা খুলে বলা যাক এবার, উম্মে হাবিবা ও শোয়েবকে আটক করার পর প্রক্টরিয়াল বডি তাদের প্রক্টর কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। একই সময়ে প্রক্টর কার্যালয়ের বাইরে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখে মোস্তফা মঈনুদ্দিন মারুফ নামের আরেক পরীক্ষার্থীকে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডি। পরে মারুফ জানান তিনি উম্মে হাবিবা ও শোয়েবের আপন খালাতো ভাই। খালাতো ভাই-বোন আটক হয়েছেন শুনে মারুফ প্রক্টরিয়াল কার্যালয়ের আশাপাশে ঘুরে পরিস্থিতি আঁচ করার চেষ্টা করছিল। তবে মারুফের কাছে কিছু ভূয়া সিল ছাড়া তেমন কিছু পাওয়া যায় নি।

এদিকে শোয়েবের মুঠোফোন তল্লাশি করে সেখানে সোহেল নামের একজনের মুঠোফোন থেকে আসা বেশ কিছু ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত জালিয়াতির বিষয়ে এসএমএস (খুদে বার্তা) পাওয়া যায়। শোয়েব জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল তাদের বড় ভাই বলে নিশ্চিত করেন।

পরে প্রক্টরিয়াল বডি ‘আপনার ভাইবোনদের মুচলেখা দিয়ে নিয়ে যান’ এই টোফ ফেলে সোহেলকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসে। এরপর সোহেলের মুঠোফোন তল্লাশি চালিয়ে আরও বেশ কিছু পরীক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে টাকা আদায়ের খুদে বার্তা পাওয়া যায়। পাশাপাশি একাধিক শিক্ষার্থীর নামে ভর্তি আবেদন করার বেশ কিছু নথিপত্রও পাওয়া যায় তার মুঠোফোনে।

জনৈক পরীক্ষার্থীর মুঠোফোনে পাঠানো সোহেলের একটি খুদেবার্তার বয়ান ছিল এমন, ‘ভাই টাকা কি আজ দিবে। এরকম হলে আমি লোক পাঠাবো না এক্সাম (পরীক্ষা) দিতে। কথা-কাজে কোনো মিল পাচ্ছি না।’ অন্যগুলো ছিল তার বিকাশ নম্বরে দ্রুত টাকা পাঠানোর দাবি নিয়ে করা নানা খুদে বার্তা।

এ সময় সোহেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি প্রক্টরিয়াল বডির কাছে স্বীকার করেন ছোট ভাই শোয়েবের মাধ্যমে ছোট বোন উম্মে হাবিবাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকিয়ে দিতে তিনি এ জালিয়াতি করেন। এসময় তাকে অন্যের বদলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ করিয়ে দেওয়ার বদলে অনেক জনের সঙ্গে টাকার লেনদেনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি প্রক্টরিয়াল বডির কাছে কোনো সদুত্তর দিতে পারেন নি। মোহাম্মদ শোয়েব শুধু আজ না এর আগে কলা অনুষদের অধিভুক্ত বি-৭ পরীক্ষায়ও অন্য নামে অংশ নিয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রক্টরিয়াল বডি এই চারজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের সাজা হওয়ার কথা রয়েছে।

আপত দৃষ্টিতে এই পারিবারিক জালিয়াতি চক্রকে ভর্তি পরীক্ষায় এ পর্যন্ত ধরা পড়া সবচেয়ে বড় চক্র হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর আগে প্রক্সি দিতে গিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কিছু শিক্ষার্থী ধরা পড়লেও এ কাজে জড়িত মূল চক্রকে খুঁজছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি। শনিবার হয়তো বড় একটি চক্রকেই ধরে ফেলল তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোহাম্মদ আলী আজগর চৌধুরী বলেন, ‘প্রথমে দুই শিক্ষার্থীকে উত্তরপত্র অদল-বদল করার সময় আটক করি আমরা। পরে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় তারা ভাই-বোন। এরপর একজনের মুঠোফোন তল্লাশি করে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি সংক্রান্ত কিছু নথি পাওয়া যায়। এরই সূত্র ধরে তাদের বড় ভাইকেও আমরা কৌশলে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসি। তার মুঠোফোনেও একাধিক জালিয়াতি সংক্রান্ত ও টাকা লেনদেনের বিষয়ে নথি পাওয়া যায়। আমাদের সন্দেহ হচ্ছে এই বড় ভাইয়ই জালিয়াতি চক্রের প্রধান।’

আটক চারজনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নিশ্চিত করে প্রক্টর আরও বলেন, ‘জালিয়াতি চক্রকে ধরার বিষয়ে আমরা তৎপর আছি। এর আগেও অনেকজন ধরা পড়েছে। তাদের ইতিমধ্যেই জেল-জরিমাণা হয়েছে। এই চারজনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেবে ভ্রাম্যমাণ আদালত।’

আটক চারজনের বাড়ি চারজনের বাড়ি লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া এলাকায়। এদের মধ্যে তিন ভাই বোন ওই এলাকার মোহাম্মদ আলীর সন্তান।