কৃষি খাতে অগ্রগতি

প্রকাশ:| সোমবার, ১৯ মে , ২০১৪ সময় ০৯:১৪ অপরাহ্ণ

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ|বর্তমানে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান শতকরা ২০ ভাগের কাছাকাছি। স্বাধীনতার সময় এ হার ছিল শতকরা ৬০ ভাগ। জিডিপিতে কৃষির অবদান শতকরা হারে কমে যাওয়া মানে কৃষি খাতের সঙ্কোচন নয়। এর অর্থ হলো, অন্যান্য খাতের বিপুল প্রসার। স্বাধীনতার পর শিল্প খাত ছিল সঙ্কুচিত। সেবা খাতও তখন তেমন উন্মোচিত হয়নি। অথচ বর্তমান সময়ে এ সেবা খাত হলো বিরাট প্রসারিত একটি খাত। তেমনি শিল্প খাতে সমৃদ্ধি উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে পোশাকশিল্পে অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। বিশ্বে এখন পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। আরও কিছু শিল্পে বাংলাদেশ ক্রমেই এগিয়ে চলছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এসব কারণেই জিডিপিতে কৃষি খাতে অবদান হ্রাস পেয়েছে। তবে আমরা যদি উৎপাদনের পরিমাণ বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে কৃষি খাতে বৈপ্লবিক উন্নতি হয়েছে। বিষয়টি সহজেই উপলব্ধি করা সম্ভব।

স্বাধীনতার আগে এবং পরে সাড়ে সাত কোটি মানুষের শতকরা ৬০ ভাগ খাদ্য উৎপাদন হতো দেশে। বাকিটা আমদানি করতে হতো বাইরে থেকে। বর্তমানে দেশের ১৬ কোটি মানুষের সম্পূর্ণ খাদ্য চাহিদা মেটানো হচ্ছে দেশের উৎপাদন থেকেই। এ থেকে বোঝা যায়, কৃষি খাতের উন্নতি কতখানি ব্যাপক। আর এ উন্নতি কোনো জাদুকরী কারণে ঘটেনি। এর পেছনে ছিল সঠিক পরিকল্পনা ও কৃষকের বিপুল শ্রম। আমরা এখন কৃষি খাতে সাফল্যের কিছু কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করব।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ৬০ থেকে ৭০ দশকে অধিকাংশ কৃষি জমি একফসলি ছিল। অনেক জমি অব্যবহৃত পড়ে থাকত।

স্বাধীনতার পর এর ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি খাতের গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে নির্দেশ দিয়েছিলেন কোনো জমিই যেন অব্যবহৃত না থাকে। এমনকি সরকারি জমিও যেন আবাদ করা হয়। এ নির্দেশনা জনগণের মাঝে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ক্যান্টনমেন্টগুলোয় খালি জায়গায় সেনা সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমে ধান চাষ শুরু করেন। ঢাকার অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি, গুলশানসহ অন্যান্য এলাকার বাড়ির সামনে ছোট ছোট খালি জায়গাগুলোয়ও বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করা শুরু হয়। কৃষি খাতে তখন বেশ কিছু সহায়ক কর্মসূচি ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল। এটাই ছিল বাংলাদেশে কৃষি বিপ্লবের সূচনা।

বঙ্গবন্ধুর আগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় কৃষি খাতে বিপুল মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। সরকার থেকে কৃষক পর্যন্ত সব পর্যায়ে উৎসাহ লক্ষ করা যায়। এর প্রভাব পড়ে বিপুলভাবে। কৃষি খাত নিয়ে এরই ধারাবাহিকতায় অনাবাদি জমিতে ফসল চাষ বৃদ্ধি পায়। তারপর শুরু হলো একফসলি জমিকে দ্বিফসলি জমিতে রূপান্তর করা। একই সঙ্গে অধিক ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। শস্যবৈচিত্র্যও বাড়তে থাকে। সরকার নিয়োজিত মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে কৃষকদের উপদেশ ও নির্দেশনা দান করতেন। সরকারি প্রণোদনা পেয়ে কৃষকরা উৎসাহিত বোধ করেন।

বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) কর্মসূচি অনুযায়ী কুমিল্লায় এ ধরনের কর্মসূচির সার্থকতা এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বার্ড পল্লী উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন তথা গ্রামের দারিদ্র্য বিমোচনে প্রভূত ভূমিকা রাখে। কুমিল্লার কোটবাড়িতে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠান ক্রমেই কার্যকর বলে বিবেচিত হয়। এ সাফল্য সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। দুই দশকের মধ্যে অধিকাংশ জমিতে দুই ফসল এমনকি তিন ফসলের আবাদ শুরু হয়। আবার দুই ফসলের মধ্যবর্তী সময় শাকসবজি চাষ বৃদ্ধি পায়। কৃষি খাতে নীরব অগ্রগতি চলতে থাকে।

কৃষি বিপ্লবের আরেকটি উপাদান উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা বিশেষ অবদান রেখেছেন। তারা গবেষণার মাধ্যমে নতুন ধরনের বীজ উদ্ভাবন করেছেন। এসব বীজ দেশের মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে। এছাড়া উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্পসময়ে ফসল তোলা নিশ্চিত করে। উদ্ভাবিত নতুন বীজ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বীজ উৎপাদন খামার পরিচালনা করে। বিএডিসির উৎপাদিত বীজ কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেন সরবরাহকারী ব্যবসায়ী ও বিএডিসির কর্মীরা। বীজ ছাড়াও সার সরবরাহ ও সেচের সুযোগ সৃষ্টিতে বিএডিসি ভূমিকা রাখে। এছাড়া কিছু ভালো বীজ বহির্বিশ্ব থেকেও আমদানি করা হয়। ফলে বাংলাদেশে একরপ্রতি শস্য উৎপাদন বহুগুণে বেড়ে যায়।

কৃষি বিপ্লবের আরও একটি বড় উপাদান সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহার করা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সার কারখানাগুলো প্রচুর পরিমাণে সার উৎপাদন করছে। আশার কথা, দেশে উৎপাদিত সার মানে উন্নত ও পরিমাণে যথেষ্ট। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় অন্যান্য সার বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। সারের মান বজায় রাখার জন্য সরকার মাননিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রবর্তন করেছে। কৃষকের কাছে যথাসময়ে সার পেঁৗছাতেও সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে কৃষকদের তেমন ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। তবে সার ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে সরকারের ভর্তুকি নীতি। একসময় যে সার ৬০ টাকা দরে বিক্রি হতো ভর্তুকির ফলে তার দাম দাঁড়িয়েছিল কমবেশি ২০ টাকা। অবশ্য ভর্তুকির এ ব্যবস্থাটি আওয়ামী লীগ সরকারই প্রবর্তন করেছে। এ নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি থাকলেও সরকার কৃষি খাতের উন্নয়নকেই প্রাধান্য দিয়েছে। তাই কৃষক স্বল্পমূল্যে ও সহজে সার পেয়েছে। একই সঙ্গে জলসেচের ব্যবস্থা করার জন্য পাম্প চালনার ক্ষেত্রে ডিজেলের জন্য মূল্য ভর্তুকি ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল এ সরকার। জমির পরিমাণ ভেদে দুই স্তরে যথাক্রমে ৮০০ ও ১০০০ টাকা হিসেবে ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল কৃষককে। এমনকি সেচ পাম্প চালানোর জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ সরকার নিশ্চিত করতে পেরেছিল। বোরো মৌসুমে অনেক সময় শহরে লোডশেডিং বাড়িয়ে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার প্রয়াস চালানো হয়েছে। মোট কথা, সব কৃষি উপকরণ হাতের নাগালে থাকার ফলে কৃষি খাতে উৎপাদন বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়।

বর্ণিত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণের ফলে কৃষকরা অদম্য উৎসাহ ও দক্ষতা প্রদর্শন করে কৃষি উৎপাদনে অসাধ্য সাধন করেছে। এখানে কৃষকের শ্রম ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার কথা বলতেই হয়। আমাদের কৃষকরা সরকারপ্রদত্ত সুবিধাগুলো জুতসইভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার অপার দক্ষতা কৃষি খাতে উন্নতিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তাই আজকের কৃষি বিপ্লবে কৃষকের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ।

এখন কিছু সমস্যার কথা আলোচনা করা যাক। যে কৃষক হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে উৎপাদন বাড়িয়েছেন, তারা তাদের উৎপাদিত শস্যের উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন না। সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে বাজারে দাম পড়ে যায়। নিম্নমুখী বাজারে শস্য মজুদ করার আর্থিক ক্ষমতা কৃষকের নেই। ফলে তারা কম দামে শস্য বিক্রি করে দেন। প্রতি মৌসুমেই ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষকের মধ্যে হাহাকার ওঠে। তাদের এ করুণ পরিণতি যেন নিঃশেষ হওয়ার নয়। বিভিন্ন সময়ে আমরা লক্ষ করেছি, ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে তারা অভিনব উপায়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কখনও উৎপাদিত ফসল রাস্তায় ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ করছেন। কখনও পানিতে ফেলে দিচ্ছেন। এতে তাদের ক্ষোভের হয়তো ক্ষণিক প্রশমন ঘটে; কিন্তু কোনো ফায়দা হয় না। ফায়দা লুটে নেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। সরকার যদিও ভালো দামে ধান ক্রয় করে; কিন্তু তার সুবিধা চাষিরা পায় না। কারণ, সরকার খাদ্য ক্রয় করে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে। এরা কৃষকদের বেকায়দার ফেলে কিংবা কৃষি যন্ত্রপাতিঅসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কম দামে ফসল কিনে সরকারের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছে। ফলে ক্ষেত্রবিশেষে উৎপাদন খরচ তুলতেই কৃষকদের বেগ পেতে হচ্ছে। তারা যদি সরকারের কাছে সরাসরি উৎপন্ন ফসল বিক্রি করতে পারত, তাহলে ন্যায্যমূল্য পেতে পারত। কিন্তু কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়টিতে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। সরকার কৃষি খাতের প্রণোদনা ও কৃষকের কল্যাণে অনেক কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এখন ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ভূমিকা গ্রহণ জরুরি।

কৃষির আরেকটি বড় সমস্যা চাষাবাদযোগ্য জমির সঙ্কোচন। বছরে শতকরা প্রায় এক ভাগ চাষাবাদের জমি হ্রাস পাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে চাষাবাদ তথা খাদ্য উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কারণ চাষযোগ্য জমি কমে গেলে প্রয়োজনীয় ফসল উৎপাদন শঙ্কায় পড়বে। তখন হয়তো উন্নতমানের সব প্রযুক্তি ও উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার করেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখা সম্ভব হবে না। তেমন হলে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে চাহিদা অনুযায়ী শস্য আমদানি করতে হবে। তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেক উন্নয়ন পরিকল্পনা কাটছাঁট করতে হবে। এ জন্য এখন থেকেই উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।

শিল্পের জন্য যাতে ফসলি জমি ব্যবহৃত না হয় সে জন্য পরিকল্পিতভাবে শিল্প এলাকা গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে কার্যক্রম সরকারি পর্যায়েই গ্রহণ করতে হবে। একটি কার্যকর ভূমি ব্যবহার নীতি গ্রহণ করলে ভালো হয়। কৃষি ও পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি না করেই শিল্প স্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। তাছাড়া শিল্পের বর্জ্য দূষণ যাতে পরিবেশকে দূষিত না করে সে ব্যাপারেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। এ জন্য পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। উন্নয়ন যেন আত্মঘাতী না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মূল কথা, কৃষি ও শিল্পসহ সব ধরনের কাজে জমির ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

লেখকঃসাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।