কুতুবদিয়া উপকূলে গৃহহারা হয়েছে শত শত পরিবার

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি , ২০১৮ সময় ০৮:৫৮ অপরাহ্ণ

বিগত পাঁচ বছরে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে কয়েক’শ কোটি টাকা। অরক্ষিত বেড়িবাঁধ কুতুবদিয়া

লিটন কুতুবী, কুতুবদিয়া-(কক্সবাজার)।

বিগত ছয় বছর ধরে রেড়িবাঁধ না থাকায় মারাতœক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপের ৩০ গ্রামের অর্ধ লক্ষ মানুষ গৃহহারা হয়ে পড়েছে। আর এসব এলাকায় অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে শত শত একর লবণ চাষের জমি। জোয়ারের সময় ঘরের আঙিনাসহ পুকুর ভিটি ভরে যায়। গৃহহারা লোকজনের এমন অর্থ ভিত্ত নেই যে অন্যত্রে গিয়ে মাথা গোজানোর ঠাই করার মতো । অমাবস্যা আর পূর্ণিমার জোয়ারের সময় পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে ঐ ৩০ গ্রামের লোকজন ঘরে থাকা যায় না। জোয়ার ভাটার কারণে এসব গ্রামগুলোর মানুষ পানি আর বায়ুবাহিত রোগে প্রায় সময়ে আক্রান্ত হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার কারণে চলতি শুস্ক মৌসুমে শত শত একর লবণ চাষের জমিতে চাষাবাদ করতে পারছে না চাষীরা।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপের কাইছারপাড়া,নয়াকাটা,পশ্চিম চরধুরুং,পূর্ব চরধুরুং,পূর্ব তারলররচর, পশ্চিম তাবলরচর,আনিচের ডেইল, জেলেপাড়া,পেয়ারাকাট,সতরউদ্দিন এলাকায় প্রায় ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিগত ছয় বছর ধরে ভাঙা থাকায় ঐসব গ্রামের ওপর জোয়ার ভাটা বসার দৃশ্যটি চোখে পড়ে প্রতিনিয়তই। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনের কক্সবাজার জেলার ৭১ পোল্ডার ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙা রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারের লোকজন তাদের জন্মস্থান রক্ষার জন্য এলাকা ভিত্তিক নিজ শ্রমে মাটি কেটে রিং বাঁধ দিয়ে জোয়ার ঠেকানোর জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে বলে আকবরবলী পাড়ার নজির আহমদ (৬৫) দাবী করেন। তিনি আরো জানান, বিগত ছয় বছরে কুতুবদিয়া দ্বীপের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বসবাসরত শত শত পরিবার গৃহহারা হয়েছে। আগামী বর্ষা মৌসুমে ভাঙন এলাকায় বেড়িবাঁধ মেরামত করা না হলে নতুনভাবে আরো অনেক পরিবার গৃহহারা হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ব্যাপারে কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী বলেন, বিগত ছয় বছর ধরে কুতুবদিয়া দ্বীপের ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভাঙ্গা থাকায় উত্তর ধুরুং,দক্ষিণ ধুরুং, লেমশীখালী,কৈয়ারবিল,বড়ঘোপ, আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন গুলোর শত শত একর ফসলি আর লবণ মাঠের জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে। উত্তর ধুরুং ইউপির চেয়ারম্যান ও কুতুবদিয়া বাচাঁও আন্দোলনের সভাপতি আ,স,ম শাহরিয়ার চৌধুরী জানান,পাউবো কর্তৃপক্ষ চরধুরুং আকবরবলীপাড়া, ফয়জানিরবাপের পাড়া, সতরউদ্দিন, কাইছারপাড়া এলাকায় ১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ার ভাটার কারণে কয়েক’শ একর লবণ চাষের জমিতে লবণ উৎপাদন না হওয়ায় শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এসব এলাকার লোকজন উপার্জন ক্ষমতা হারিয়ে দারিদ্র সীমার নীচে চলে গেছে। যার ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে চরম প্রভাব পড়েছে। বেড়িবাঁধ অরক্ষিত থাকায় উত্তর ধুরুং ইউনিয়ন থেকে বিগত ছয় বছরে অর্ধ লক্ষ মানুষ গৃহহারা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থ বছর কুতুবদিয়া দ্বীপের ৭১ পোল্ডারের ১৪ কিলোমিটার অরক্ষিত বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে মেরামত করার জন্য ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়। বর্তমানে ব্লক তৈরীর কাজ শুরু হয়েছে বলে পাউবোর শাখা কর্মকর্তা এলটন চাকমা এ প্রতিনিধিকে নিশ্চিত করেন। তবে চলতি বছর শুস্ক মৌসুমে অরক্ষিত বেড়িবাঁধ নির্মানের কাজ শুরু যায় কি-না সন্দেহ।
আকবরবলী পাড়া আর চরধুরুং এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার বাঁধ না থাকায় ঐ এলাকা দিয়ে জোয়ারের নোনা পানি ঢুকে শত শত একর লবন উৎপাদনের জমি প্লাবিত হচ্ছে। আলী আকবর ডেইল তাবলরচর এলাকার বাসিন্দা ভূমিহীন বিধবা জোলেখা খাতুন (৫৫) জানান, তিনি তিন কন্যা সন্তানের জননী। পুত্র সন্তান নেই। দশ ঘরে ভিক্ষা করে এক যুগ ধরে পশ্চিম তাবলরচর এলাকায় বাধেঁর পাশে ছোট একটি বাঁচাঘর তৈরী করে বসবাস করতো।

বিগত পাঁচ বছর পূর্বে ভিক্ষে করে টাকা জোগিয়ে বাঁেধর পাশে বসতঘর তৈরীর ২ মাসের মাথায় ঘূর্ণিঝড় রোয়ানোর আঘাতে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় তার সাথে ঘরও ভেঙে গেছে। কুতুবদিয়া উপজেলা আ’লীগের সভাপতি আওরঙ্গজেব মাতবর জানান, কুতুবদিয়া দ্বীপের ১৪ কিলোমিটার বাঁধ স্থায়ীভাবে মেরামত করার জন্য ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। চলতি বছর নৌবাহিনীর তত্ববধানে ব্লক তৈরী ও বাঁধ নির্মানের কথা থাকলেও শুধুমাত্র ব্লক তৈরী করা হচ্ছে। ব্লক তৈরীতেও লবণ বালি আর নি¤œমানের পাথর ব্যবহার করছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ তুলেন। কুতুবদিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও আলী আকবর ডেইল ইউপির চেয়ারম্যান নুরুচ্ছাফা বিকম গত বছর ডিসেম্বর মাসের আইনশৃংখলা সভায় ব্লক তৈরীর সময় নৌবাহিনীর দল উপস্থিত না থাকায় অনিয়ম হচ্ছে বলে সভাকে জানান। এছাড়াও তাবলরচর, চরধুরুং, কাইছারপাড়া এলাকায় বেড়িবাঁধ ভাঙা থাকায় বিগত পাচ বছর ধরে শুস্ক ও বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি আর শত শত একর লবণ উৎপাদনের মাঠ অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে। এ এলাকার প্রান্তিক চাষীদের গেল পাঁচ বছরে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে চাষীদের পরিবারে অভাব অনটন নেমে এসেছে।