কুতুপালং বস্তিতে নতুন রোহিঙ্গারা আশ্রয়হীনতায় …

প্রকাশ:| শনিবার, ৩ ডিসেম্বর , ২০১৬ সময় ০৭:৪৫ অপরাহ্ণ

কায়সার হামিদ মানিক, উখিয়া :
%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%82-%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%b0%e0%a7%8bউখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে দালালদের মাধ্যমে আসা নতুন রোহিঙ্গারা আশ্রয়হীনতায় ভোগছে বলে খবর পাওয়া গেছে। জানা যায়, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা, পুলিশ ও রাখাইন মগ সম্প্রদায়ের অমানবিক নির্যাতনের শিকার প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু সে দেশের সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। ইতিমধ্যে অনুপ্রবেশকারী হাজারো রোহিঙ্গা আশ্রয়হীন অবস্থায় উখিয়ার কুতুপালং বস্তিতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। গতকাল শনিবার সকালে এসব রোহিঙ্গাদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে রেজিষ্ট্রার্ড রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।
গতকাল শনিবার সকালে কুতুপালং বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বস্তির ঝুঁপড়ি ঘরের আনাচে কানাছে আশ্রয় নেওয়া বেশ কিছু রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী নারী-পুরুষ-শিশু, তাদের চোখে মুখে ক্লান্তি ও বিষাদের চাপ। জানতে চাওয়া হলে, মংডু নাইছংপাড়া গ্রামের শামশুল আলম (৩৫) জানায়, তার স্ত্রী হাসিনা (২৮), মেয়ে শাহিনা (৭), ছেলে কাউসার (৪), সোহেল (২) কে নিয়ে গত দু’দিন ধরে বস্তির ঝুঁপড়ি ঘরের আঙ্গিনায় দিন কাটাতে হচ্ছে। আসার সময় এক কাপড়ে চলে আসার কারণে শীত নিবারণ করতে না পারায় ঠান্ডায় তার দু’শিশু জ্বরে কাপঁছে। সে জানায়, যাদের আত্মীয় পরিজন আছে, চেনা জানা রোহিঙ্গা পরিবার রয়েছে তারা আশ্রয় পেলেও হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গা পরিবার তার মত খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাচ্ছে।
কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক জানান, ২০১২ সালে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তের নাফনদী পার হয়ে কুতুপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের পার্শ্বে বনভূমির জায়গায় ঝুঁপড়ি বেঁেধ আশ্রয় নেয়। এসব আশ্রিতা রোহিঙ্গাদের নুন আনতে পানতা পুরায় বিধায় একেকটি ঝুঁপড়িতে ৮/১০ জন সদস্যের একেকটি পরিবার গাদাগাদি করে বসবাস করছে। এমতাবস্থায় সদ্য অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মত পরিবেশ বস্তির কোন পরিবারের নেই। তাই অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ঝুঁপড়ি ঘরের আনাচে কানাছে, আঙ্গিনায়, বারান্দায় রাত কাটাতে হচ্ছে। বস্তির বাসিন্দা মোঃ তারেক জানান, আশ্রয়হীন এসব রোহিঙ্গাদের সহায় সম্বল না থাকার কারণে তাদের অনেককেই অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হচ্ছে।
কুতুপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা ফয়সাল আনোয়ার জানান, মংডু আরাকান রাজ্যে প্রায় ২৫টি গ্রাম পুড়ে দিয়ে উচ্ছেদ করেছে হাজার হাজার বসতি। হত্যা ও আটক করা হয়েছে যুবক শ্রেণির লোকজনকে। ধর্ষন করা হয়েছে অসংখ্য নারীদের। ভিটেমাটি, সহায় সম্পদ ও আশ্রয়হীন এসব রোহিঙ্গারা একটু নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করতে পাহাড় জঙ্গলে অপেক্ষায় রয়েছে। সে আরো জানায়, মিয়ানমার সামরিক জান্তা জ্বালাও পোড়াও আপাতত বন্ধ রেখে মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ বুচিদং এলাকায় প্রবেশ করে লুটপাট ও নির্বিচারে রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করছে।
বুচিদং লেমছি পাড়া থেকে আসা আমিনা খাতুন(৩৫) জানায়, মগসেনা, পুলিশ ও রাখাইন যুবকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট করছে, যুবকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, যুবতীদের ধর্ষণ করছে। এসময় কেউ বাধাঁ দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। সে জানায়, মগ সেনাদের পাশবিক ধর্ষণের কবল থেকে রক্ষার জন্য একটি মাত্র মেয়ে লায়লা খাতুন (১৮) কে নিয়ে প্রায় ৪ দিন পায়ে হেঁটে উলুবনিয়া সীমান্ত দিয়ে গতকাল শনিবার ভোর সকালে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তার স্বামী আব্দুল মজিদের কোন খোঁজ খবর জানে না। তার মতো আরো বেশ কয়েকটি পরিবার সম্ভ্রম বাচাঁতে এখানে আসার জন্য সে দেশের সীমান্ত এলাকায় জড়ো হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, মিয়ানমার সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এসব রোহিঙ্গাদের সেবা সহযোগীতা দেওয়া হলে ওপারে থাকা রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশে উৎসাহিত হবে।
কক্সবাজার বিজিবি’র ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল এম এম আনিসুর রহমান জানান, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া, টেকনাফ সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে বিজিবি’র সদস্যরা রাতদিন পরিশ্রম করছে। গত এক মাসে কতজন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীকে পুশব্যাক করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অসংখ্য রোহিঙ্গা নাগরিককে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।