কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর , ২০১৩ সময় ১০:২৪ অপরাহ্ণ

কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর।আজ রাতে কাদের মোল্লার ফাসি

জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। রাত ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন ডিআইজি প্রিজন গোলাম হায়দার। সঙ্গে ছিলেন ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সিভিল সার্জন এবং মসজিদের ইমাম। সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা কাদের মোল্লার সঙ্গে শেষ দেখা করেন। দেখা করে এসে তার ছেলে হাসান জামিল মানবজমিনকে বলেন, আমার বাবা বলেছেন তিনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। তবে প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। এরআগে বেলা ১২টার দিকে তার রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ৫ বিচারপতির বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। এরফলে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরে আর কোন বাধা নেই বলে জানান এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। অন্যদিকে, আসামীপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, কাদের মোল্লা ন্যায় বিচার পাননি।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের সময় নির্ধারণ করেছিল সরকার। এর ৯০ মিনিট আগে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার বিচারপতি ওই ফাঁসির কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেন। গত দুই দিন আপিল বিভাগে কাদের মোল্লার দায়ের করা রিভিউ আবেদনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর শুনানি হয়। বেলা ১২টার দিকে জনাকীর্ণ আদালতকক্ষে আবেদন খারিজের আদেশ ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি। তবে কোন যুক্তিতে আবেদন খারিজ করা হয়েছে তা আদালতের ঘোষণায় বলা হয়নি। এরআগে গত দুই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থা কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার নভি পেল্লাই প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে চিঠি লিখেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি শেখ হাসিনাকে ফোন করে বলেন, কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর আগামী নির্বাচন ভুন্ডুল করে দিতে পারে। দৃশ্যত সরকার এসব অনুরোধ আমলে নেয়নি।
গত ৫ই ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ওই সময় সাঁজার রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিল দায়েরের কোন বিধান ছিল না। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে সরকারকে আপিল দায়েরের সুযোগ দেয়া হয়। এ আপিলের শুনানি শেষে গত ১৭ই সেপ্টেম্বর সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতের ভিত্তিতে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে আপিল বিভাগ। গত ৫ই ডিসেম্বর এ রায় প্রকাশ করে আদালত। পরে ট্রাইব্যুনাল থেকে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়।
মোমেনার সাক্ষ্যে অসংগতি রয়েছে: ব্যারিস্টার রাজ্জাক
কাদের মোল্লার মামলায় রিভিউ শুনানিকে কেন্দ্র করে পুরো সুপ্রিম কোর্ট এলাকাকেই গতকাল নিরাপত্তা চাঁদরে ডেকে ফেলা হয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রতিটি প্রবেশ পথে অবস্থান নেয় বিপুল সংখ্যক র‌্যাব-পুলিশ। আইনজীবী এবং সাংবাদিক ছাড়া কাউকেই আদালত এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। শুনানিতে অংশ নিয়ে কাদের মোল্লার আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক সাক্ষী মোমেনার সাক্ষ্যের বৈপরিত্য তুলে ধরেন। সাক্ষীর বিশ্বাস যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এ সাক্ষীর সাক্ষ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। মোমেনা বেগম একেক জায়গায় একেক রকম বক্তব্য দিয়েছেন। জল্লাদ খানায় এক রকম, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এক রকম এবং ট্রাইব্যুনালে এক রকম বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, বক্তব্যে অসঙ্গি থাকলে সেই সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। আর বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকলে সেই সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কাউকে সাজা দেয়া যায় না। এক্ষেত্রে মোমেনা বেগমের সাক্ষ্যে অসঙ্গি রয়েছে। তাই এর গ্রহণযোগ্যতা নাই। এরপর ব্যারিস্টার রাজ্জাক সর্ম্পূণ ন্যায় বিচার বিষয়ে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্চেদের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল এখতিয়ার বর্হিভুতভাবে মৃত্যু পরোয়ানাা জারি করেছে। জেল কোড অনুযায়ী মুত্যু পরোয়ানা জারি করবে যে আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয় সেই আদালত। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, সংবিধানের ৪৭ (ক)২ অনুযায়ী কাদের মোল্লার রিভিউ করার সুযোগ নেই। তিনি কোন প্রতিকার চাইতে পারেন না। ট্রাইব্যুনাল আইনে সাজা প্রাপ্ত ব্যক্তির আবেদনের সুযোগ থাকবে না। তবে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে শুনতে পারেন। আদালত তা শুনেন নাই। কাদের মোল্লার পক্ষ থেকে এ আবেদন করা হয়েছে। শুনানি শেষে আদেশ দেয় আদালত।
আদালতের আদেশ সর্বসম্মত: এটর্নি জেনারেল
আদেশের পর এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আদালতের সর্বসম্মত আদেশের ফলে আসামি কাদের মোল¬ার ফাঁসি কার্যকরে আর কোনো বাধা নেই। চেম্বার জজের আদেশে যে কার্যক্রম বন্ধ হয়েছিল এখন তা আবার চালু হলো। তিনি বলেন, আদালত তাদের দুটি রিভিউ খারিজ করে দিয়েছেন। কোনো অবজারভেশন দেননি। তাই পূর্ণাঙ্গ অনুলিপির দরকার নেই। আজ কোর্ট যে আদেশ দিয়েছে তার সংক্ষিপ্ত আদেশ যাওয়ার দরকার নেই। জেল কর্তৃপক্ষ চাইলে বাস্তবায়ন করতে পারে। তিনি বলেন, এ মামলার ক্ষেত্রে জেলকোড প্রযোজ্য নয়। কাদের মোল্লার আর প্রাণ ভিক্ষা চাওয়ারও অধিকার নেই।
কাদের মোল্লা ন্যায় বিচার পাননি: খন্দকার মাহবুব
কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদন খারিজের রায়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি বলেন, আমরা রিভিউ আবেদন করেছিলাম। দীর্ঘ সময় শুনানি হয়েছে। শুনানির পর আদালত আমাদের আবেদন বাতিল করে দিয়েছেন। আইনের শাসন যেখানে কায়েম আছে সেখানে আমরা মনে করি, এই রায় দিয়ে ন্যায়বিচার করা হয়নি। কাদের মোল্লা ন্যায় বিচার পাননি। তিনি বলেন, কেন আবেদন খারিজ করা হয়েছে সেটাও আমরা জানি না। পূর্ণাঙ্গ রায় না পেলে এটা বোঝাও যাবে না।
আসামীপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রায় কার্যকরের জন্য রিভিউ আবেদনের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যা করতে হবে জেলকোড এবং আইন অনুযায়ীই করতে হবে। জেলকোডের বাইরে কিছু করা যাবে না।