কাদের নেওয়াজ

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| সোমবার, ১৫ জানুয়ারি , ২০১৮ সময় ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’ (নির্বাচিতদের অন্যতম) খ্যাত মোগল ঐতিহ্যের কবি কাজী কাদের নওয়াজ ১৯০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী আল্লাহ নওয়াজ, পিতামহ কাজী নওয়াজ খোদা, মাতার নাম ফাতেমাতুন্নেছা, মাতামহ ছিলেন ভারতের অন্যতম প্রতাপশালী জমিদার সৈয়দ জিল্লুুর রহমান। তিনি রাজা মিয়া নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। পৈতৃক নিবাস বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোর্ট গ্রামে। পিতা কাজী আল্লাহ নওয়াজ ছিলেন মঙ্গলকোর্টের সম্ভ্রান্ত ও বনেদি জমিদার পরিবারের সন্তান এবং মাতা ফাতেমাতুন্নেছা ছিলেন মুর্শিদাবাদের জমিদার পরিবারের মেয়ে। পিতামাতার এগারো সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। নিঃসন্তান এ কবির স্ত্রীর নাম নাসেরা বিবি। কবির চাচা বিখ্যাত মনীষী, বহু ভাষাবিদ, বিশিষ্ট লেখক কাজী খোদা নওয়াজ তৎকালীন সময়ের আলোড়ন সৃষ্টিকারী পত্রিকা ‘মাসিক মোহাম্মদী’র সহসম্পাদক ছিলেন। মঙ্গলকোর্টের সম্ভ্রান্ত ও বিখ্যাত এ কাজী বাড়ির নামডাক তখন দেশজুড়ে ছিল। তার পিতা আল্লাহ নওয়াজ বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষার সুপণ্ডিত ও লেখক ছিলেন। মা ফাতেমাতুনেচ্ছাও ছিলেন একজন সুশিতিা বিদুষী নারী।
কবি কাজী কাদের নওয়াজ ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু, সংস্কৃতি প্রভৃতি ভাষার সুপণ্ডিত ছিলেন। তার প্রায় দশ হাজারের মতো কবিতা তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো : ‘মরাল’ (কাব্য ১৩৪১), ‘নীল কুমুদী’ (কাব্য ১৯৬০), ‘দুটি পাখি দুটি তীরে’ (উপন্যাস ১৩৭৩), ‘উতলা সন্ধ্যা’, ‘দস্যু লালমোহন’ (গোয়েন্দা কাহিনী), ‘দাদুর বৈঠক’ (স্মৃতিচারণমূলক গল্পকাহিনী-১৮৪৭) প্রভৃতি। ‘ওস্তাদের কদর’ (শিাগুরুর মর্যাদা), ‘মা’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘চাঁদদিঘি’, ‘হারানো টুপি’ ইত্যাদি তাঁর বিখ্যাত কবিতা। অপ্রকাশিত গ্রন্থ : ‘মধুচন্দ্রিকা’ (মহানবীর জীবনী কাব্যাকারে রচিত), ‘চম্পাডাঙ্গার হাট’ (কাব্য), ‘ইসলামী গাঁথা’ (কাব্য), ‘মণিদ্বীপ’ (কাব্য), ‘কালের হাওয়া’ (কাব্য) ইত্যাদি।
কবি কাজী কাদের নওয়াজের কবিতায় মাতৃভক্তি, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা, শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ, দেশপ্রেম ও প্রকৃতির নিঃসর্গের প্রতি ভালোবাসা সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে। ছাত্রজীবনে ‘শিশুসাথী’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘মা’ কবিতায় মায়ের প্রতি গভীর ভক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ‘মা’ কবিতায় লিখেছেন :
“মা কথাটি ছোট্ট অতি, কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর তিন ভুবনে নাই।
সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক, মাথার পরে আজি,
অন্তরে ‘মা’ থাকুক মম, ঝরুক স্নেহরাজী।”
তাঁর এ কবিতা পড়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছিলেন, ‘কবিতা লেখার স্বাভাবিক শক্তি তোমার আছে। …তুমি কাব্য সাধনার ধারাতেই জন্মভূমির মঙ্গল করছ।’
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মরাল’ বহুল সমাদৃত গ্রন্থ। এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মওলানা আকরম খাঁর আজাদ মোহাম্মদী গ্র“পের প্রেস থেকে। তিনি তাঁর ‘হারানো টুপি’ কবিতায় লিখেছেন :
‘টুপি আমার হারিয়ে গেছে হারিয়ে গেছে ভাইরে
বিহনে তার এ জীবনে কতই ব্যথা পাইরে;’
প্রবেশিকা পরীার শেষে কবির ‘ঘুমপাড়ানীয়া গান’ মাসিক ‘শিশুসাথী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ কবিতায় কবির কাব্য প্রতিভার দ্যুতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে :
‘চাঁদের আলোয় ফুল ফুটেছে চকোর উড়ে যায়
ঝিরঝিরিয়ে বইছে হাওয়া আয়রে ও ঘুম আয়।
মেঘগুলো সব হাওয়ায় ভেসে কোন্ অজানা পরীর দেশে
খবর নিয়ে যায়Ñ
বাইরে কোথাও নাইরে সারা আয়রে ও ঘুম আয়।’
কবি একজন আদর্শবান ও অনুকরণীয় শিক ছিলেন। তিনি শিাকেই জীবনে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। দিয়েছেন শিাগুরুর সম্মান। এ কারণে তিনি মোগল হেরেমের বিভিন্ন চরিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন শিকের সম্মান ও মর্যাদার কথা। ওস্তাদের কদর (শিাগুরুর মর্যাদা) কবিতায় তারই প্রতিফলন ঘটেছে :
‘বাদশা আলমগীর
কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লির।
উচ্ছ্বাস ভরে শিক তবে দাঁড়ায়ে সগৌরবে,
কুর্নিশ করি বাদশাহর তরে কহেন উচ্চরবেÑ
আজ হতে চির উন্নত হল শিাগুরুর শির
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।’
কাদের নওয়াজ প্রেম ও প্রকৃতির কবি। তাঁর বিভিন্ন কবিতায় প্রকৃতিপ্রেম ফুটে উঠেছে। তিনি ‘পল্লী দুলাল’ কবিতায় প্রকৃতির স্পর্শ অনুভব করেছেন এভাবে :
‘পল্লী দুলাল আমরা থাকি পল্লীঘেরা গ্রামের কোণে
নৃত্য করি মলয় সনে বেড়াই ছুটে চাঁপার বনে।
কদম ফুলে শিউরে ওঠে, দীঘির জলে কমল কলি
আমরা দেখে হর্ষে মাতি ধাই সেখানে গুঞ্জে অলি।’
কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নীল কুমুদী’ কাব্যে চটুল ভাষারীতি ব্যবহৃত হয়েছে। কবি এ কাব্যের বেশির ভাগ কবিতায় পল্লী বাংলার শ্যামল প্রকৃতির অন্তরালে রূপকের মাধ্যমে ব্যক্তি হৃদয়ের স্মৃতি-বিস্মৃতি, হৃদয় বেদনা ও হৃদয়ানুভূতি মন্থন করেছেন। যেমনÑ
‘চাঁদ ডুবে যায় দূর নীলিমায়
শুকতারা শুধু জাগে
রজনীর শেষে, নীল কুমুদী সে
কাঁদিয়া বিদায় মাগে।’
বস্তুত এ কাব্যের বেশির ভাগ কবিতায় কবির ব্যক্তিজীবনের দীর্ঘ সময়ের বিরহ-বেদনার প্রকাশ ঘটেছে, যা রূপান্তরিত হয়েছে অনন্য সর্বজনীনতায়। প্রথম যৌবনে ১৯৩৪ সালে কবি তার চাচাতো বোন নাসেরা বিবিকে বিয়ে করেন। স্ত্রীকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। স্ত্রীও তার প্রতি অতিশয় বিশ্বস্ত ছিলেন। কিন্তু পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে তিনি দীর্ঘ ২৭ বছর স্ত্রীর সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এ কারণে কবির মনে যে বিরহ-যন্ত্রণা কবিহৃদয়কে তবিত করেছিল, তারই সতত প্রকাশ ঘটেছে ‘নীল কুমুদী’ কাব্যের কবিতাগুলোতে। কয়েকটি কবিতার অংশবিশেষ এ প্রসঙ্গে তুলে ধরছি :
‘অশ্র“সায়রে এ মোর নীল-কুমুদী
এতদিন ছিল ব্যথায় বিধুরা বদন মুদি।’
অথবা ‘নিরালায়’ কবিতায়
‘আজ নিরালায় তারি কথা পড়ে মনে।
ভুলিতে চেয়েছি যাহারে সঙ্গোপনে।
শরতের চাঁদ পারিতাম যদি হতে
দেখিতাম তারে মুক্ত জানালা-পথে
আকাশ হইলে তারার প্রদীপ জ্বালি
দেখিতাম তারে সারা নিশি চেয়ে চেয়ে।’
কবি কাজী কাদের নওয়াজ ছিলেন একজন উঁচুদরের শক্তিমান কবি। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। বলেছেন দেশের পÑে ভাষার প।ে বিজয়ীর বেশে ফিরেছেন তিনি।
বিরহী এ কবি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিণে দাঁড়িয়ে ‘আমার কবিতা’য় শীর্ষক কবিতায় লিখে যান শেষ পঙ্ক্তিমালা :
“দ্বীপগুলি রেখ জ্বেলে
মোর গাঁথা হার, হে প্রিয় আমার
হেলায় দিও না ফেলে
দুঃখ করো না, রেখো গৃহ সাজায়ে যে,
সোনার নূপুর দিও পায়ে বাজায়ে যে।”
কবি কাজী কাদের নওয়াজ জীবদ্দশায় বহু পণ্ডিত মনীষীর সাহচর্য লাভ করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, শিানুরাগী ব্যক্তিদের সাথে পত্রালাপ করতেন। তাঁদের মধ্যে মওলানা আকরম খাঁ, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি বন্দে আলী মিয়া, আবুল মনসুর আহমদ, কবি আহসান হাবীব, কবি জসীমউদ্দীন, আবুল ফজল, সৈয়দ আলী আহসান, আবদার রশীদ, মজিবর রহমান খান, ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী, মুফাখখারুল ইসলাম, ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখ সাহিত্যের দিকপাল। তিনি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে শুরু করে শেলি, কিটস্, বায়রন, ইকবাল, রুমি, ওমর খৈয়াম প্রমুখের কবিতা আয়ত্ত করেছিলেন। বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় এসব কবির কবিতা তিনি অনর্গল পাঠ করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন।
কবি কাজী কাদের নওয়াজ সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’ পদক ছাড়াও ১৯৬৩ সালে শিশুসাহিত্যে ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’, মাদার বকস্ পুরস্কার, ১৯৬৬ সালে রাষ্ট্রীয় ‘প্রেসিডেন্ট পুরস্কার’ লাভ করেন।
১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি যশোর সদর হাসপাতালে এ মহৎ কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।