কাজ করবেন মানুষের জন্যে, পুরস্কারের জন্যে নয়: সৈয়দ হক

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২৪ মার্চ , ২০১৬ সময় ১১:১০ অপরাহ্ণ

তদবির ২তদবির করে পুরস্কার নিচ্ছে দেখলে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায় মন্তব্য করে ‘প্রকাশ্য সভায়’ ধিক্কার জানিয়েছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক।

নগরীর ডিসি হিলে বৃহস্পতিবার রাতে স্বাধীনতার বইমেলা মঞ্চে তার ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া সম্মাননার জবাবে বক্তব্যে এ ধিক্কার জানান।

‘খেলারাম খেলে ‍যা’র স্রষ্টা সৈয়দ হক সাম্প্রতিক ঘটনাবলির দিকে ইংগিত করে বলেন, পুরস্কারের জন্যে কেউ নির্লজ্জ তদবির করতে পারে, পুরস্কার আদায় করে নিতে পারে এটি লজ্জার। সৃষ্টির আনন্দের চেয়ে বড় পুরস্কার আর কি হতে পারে। কাজ করবেন মানুষের জন্যে, পুরস্কারের জন্যে নয়। যখন আবুল ফজল কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তার এক বছর পর অল্প বয়সে আমি পুরস্কারটি পেয়েছিলাম। আমি লজ্জা পেয়েছিলাম। আমার সমসাময়িক কেউ বেঁচে নেই। তারা তো পুরস্কারের জন্যে লেখেননি।

তিনি বলেন, আমরা খর্ব হচ্ছি। নত হচ্ছি। আপস করছি। ভেড়ার পালে মিশে যাচ্ছি।

সৈয়দ হক বলেন, আজকের এ দিনে জাতির জনকের কথা খুব মনে পড়ছে। সত্তরের নির্বাচনের কদিন আগে খুব ইচ্ছে হয়েছিল তার সঙ্গে দেখা করার। ভোর ছয়টা ১০ মিনিটে দেখা হতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা জানালেন একজন। সাড়ে পাঁচটায় ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। ঠিক ছয়টার সময় বঙ্গবন্ধু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বললেন, কই শামসুল হক কই। গায়ে গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি। ছোট্ট একটি ঘরে বসালেন। চারদিকে খবরের কাগজের স্তূপ। পায়ের ওপর পা দিয়ে বসলেন।

জানতে চাইলাম, বঙ্গবন্ধু ছয় দফা সম্পর্কে একটু বলেন। বললেন, বাইরে বলি ছয় দফা। আমার দফা আসলে তিনটা। কত নেছ? কবে দেবা? কবে যাবা?

সৈয়দ হক বলেন, মাঝেমধ্যে হতাশ হই। খালেদা জিয়ার আমলে ১৯৯৩ সালে আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। যশোর শ্বশুর বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। ফেরির ছাদে একজন মাস্টারের সঙ্গে দেখা। তাকে বললাম, দেশটা এমন কেন? গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনলাম তো ছদ্মবেশি স্বৈরতন্ত্র কেন? তিনি পানি দেখিয়ে বললেন, ওই পানির নিচে পলি জমছে। এখনো চর ভাসছে না। একদিন চর জাগবে। সবুজ ক্ষেতে ভরে উঠবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন জানতে চাইবে বাঙালির যে কথা বলি কতটা বাঙালি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যে কথা বলি তা কতটা ধারণ করি, যে ভাষা আন্দোলনের কথা বলি সে ভাষা হৃদয়ের উচ্ছ্বাস, আত্মার ভাষা কিনা?

গভীর উদ্বেগ জানিয়ে সৈয়দ হক বলেন, বাঙালি ক্রমে অসহিষ্ণু জাতিতে পরিণত হচ্ছে। আজ রাজনীতিতে যোগ দিয়ে কাল নমিনেশন চাইছে। পরশু এমপি হয়ে পরদিন আবার মন্ত্রী। অথচ ১৯৪২ সালে মূল স্রোতে রাজনীতি করে বঙ্গবন্ধু নেতা হয়েছিলেন। এখন ঋণখেলাপি না হলে অর্থ হয় না। স্বামীদের যদি স্ত্রীরা প্রশ্ন করতো ফ্ল্যাট কেনার টাকা কোথায় পেয়েছ? বিদেশ ভ্রমণের টাকা কোথায় পাও? অলংকার কিনছো কিভাবে? মায়েরা-মেয়েরা-বোনেরা যদি এভাবে প্রশ্ন করেন তবে কেউ বিপথগামী হবে না।

নিজের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সকালে রোজ মা চিরতার পানি খাওয়াতেন তাই এখনো টিকে আছি। বাঁচতেই যদি হয় অনেক দিন বাঁচবো। ১১৬ বছর পর্যন্ত পৌঁছাবো। জাতির বৈকল্য রোধ করে পজেটিভ রূপ দিতে চেষ্টা করবো। আমার শক্তি ভাষা, সাহিত্য।

সময়জ্ঞান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সময় নষ্ট করার মতো খেলোয়াড় বাঙালির মতো দ্বিতীয়টি নেই। কোনো অফিসে গেলে বলে দু-তিন দিন পর আসেন। কখন আসবো জানতে চাইলে বলেন, সকালের দিকে আসেন। আমি ঢাকা শহরে প্রতিটি অনুষ্ঠানে সময়মতো হাজির হই দেখে স্ত্রী প্রত্যহ বকছেন।

বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়ায় অনুষ্ঠানে সম্মাননা জানানো হয় কবি-কলামলেখক আবুল মোমেনকে।

আবুল মোমেন প্রসঙ্গে সৈয়দ হক বলেন, আবুল ফজল বলতেন প্রতিটি ভালো লেখা পড়লে মনে হয় পুণ্যস্পর্শ পেলাম। আমিও তাই মনে করি। ঈশ্বরচন্দ্রের ছেলেকে সবাই বলতেন সাগরের ছেলে ডোবা। আবুল মোমেনকে দেখলে মনে হয়, সাগরের ছেলে সাগর। তার লেখায় আমি ভাবনার খোরাক পাই। তিনি নিজে যেমন ভাবেন তেমনি আমাদেরও ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করেন। এ জন্য তার কাছে ঋণী।

চট্টগ্রাম একাডেমির পরিচালক রীতা দত্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম মুস্তাফা ও কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন কবি কামরুল হাসান বাদল। মঞ্চে ছিলেন বইমেলা উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক লেখিকা আনোয়ারা আলম ও একাডেমির মহাপরিচালক নেছার আহমদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন আবৃত্তি শিল্পী আয়েশা হক শিমু। আবৃত্তি করেন বাচিকশিল্পী রাশেদ হাসান ও মিলি চৌধুরী।