কলমানি: ৩ দিনে লেনদেন ২২,০০০ কোটি টাকা

প্রকাশ:| সোমবার, ৬ অক্টোবর , ২০১৪ সময় ০৭:০৯ অপরাহ্ণ

নগদ টাকার জমজমাট ব্যবসা। মিনিটে লেনদেন। মিনিটেই মুনাফা। পদ্ধতিটি ব্যাংকিং ব্যবসায় পুরোনো হলেও আলোচনায় আসে মুসলমানদের প্রধান উৎসব দুই ঈদ ও হিন্দুদের দুর্গাপূজায়। এ সময় মানুষের হাতে এক সঙ্গে অনেক টাকার দরকার হয়। ছুটে যায় ব্যাংকে। ব্যাংক তার গ্রাহক চাহিদা মেটাতে দৈনন্দিনের বাজেট ছাড়িয়ে গেলে হাত পাতে অন্য ব্যাংকের কাছে। যদিও এ কোটি টাকাহাত ধারের হাত। চড়া সুদের বিনিময়ে নগদ লেনদেন হয় ব্যাংকগুলোতে। এ ধরনের লেনদেনকে কলমানি বাজার কিংবা আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের লেনদেন বলা হয়। গত সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে কলমানি মার্কেট বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে সুদের হারও। গত তিন দিনে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এ সময় সুদের হার ছিল আট থেকে সাড়ে আট শতাংশ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, ঈদ উপলক্ষে কলমানিতে লেনদেন বাড়ছে। চলতি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে আভাস দেন এ কর্মকর্তা। এদিকে বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে ব্যাংকে পর্যাপ্ত তহবিল থাকলেও ঈদবাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংকই নগদ টাকার সঙ্কটে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে প্রতিটি ব্যাংকেই বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত তহবিল রয়েছে। তাই ব্যাংক ব্যয় কমাতে আমানতের সুদের হার কমাচ্ছে। এ কারণেই কলমানি মার্কেট থেকে ধার নিতে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে না সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর। তবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, অলস অর্থ বলতে যা বোঝায় তা ব্যাংকগুলোর হাতে খুব বেশি নেই। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে উদ্বৃত্ত তহবিলের বেশির ভাগই সরকারের কোষাগারে আটকে গেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ চাহিদা না থাকায় অনেক ব্যাংক সরকারকে ৫ বছর থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে বাধ্য হয়েছে। কারণ সরকার স্বল্প মেয়াদের পরিবর্তে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নিচ্ছে বেশি। এ কারণে অনেক ব্যাংকেরই নগদ টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। নগদ টাকার উত্তোলন বেড়ে গেলেই ব্যাংকগুলোর কলমানি মার্কেট থেকে ধার নেয়া বেড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ৩০শে সেপ্টেম্বর কলমানি মার্কেটে লেনদেন হয়েছে ৭৬৯৭ কোটি টাকা। এ সময় সুদের হার ছিল ৮ শতাংশের একটু বেশি। নগদ অর্থের লেনদেনে অংশ নিয়েছে ৪৩টি ব্যাংক ও ২২টি নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। একইভাবে ২৯শে সেপ্টেম্বর ৭৯০০ কোটি টাকা ও ২৮শে সেপ্টেম্বর ৭২০০ কোটি টাকা ধার করেছে ব্যাংকগুলো। সব মিলিয়ে গত তিন দিনে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে কলমানি মার্কেটে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুন শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে এক লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তহবিল রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে ১০ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর একাউন্টে রয়েছে ৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকাই সরকারের কোষাগারে আটকে রয়েছে। সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট তেমন কার্যকর না হওয়ায় এসব বন্ড লেনদেন করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এর ফলে নগদ টাকার সঙ্কটে পড়লেই সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে হাত পাতছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিশেষ তারল্য সুবিধার আওতায় ব্যাংকগুলোকে ধার দিচ্ছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছেও চড়া সুদ গুনতে হচ্ছে তাদের। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এর বাইরেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার প্রবাহ কমানোর নামে ব্যাংকিং খাত থেকে নানাভাবে নগদ টাকা তুলে নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআরআর) ০.৫% বাড়িয়ে মুদ্রাবাজার থেকে ৩,১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত তুলে নিচ্ছে। পাশাপাশি, ব্যাংকগুলো নগদ টাকায় বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করে বাকিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এভাবেই ব্যাংকের হাতে নগদ টাকার প্রবাহ কমে যাচ্ছে। যে কারণে যে কোন সময় ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন বেড়ে গেলে হয় ওই ব্যাংককে কলমানি মার্কেট থেকে ধার করতে হয়, অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে হাত পাততে হয়। তবে কলমানি মার্কেটে সুদের হার কম থাকায় ব্যাংকগুলো কলমানি মার্কেট থেকেই ধার নিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। কারণ কলমানি মার্কেট থেকে ধার নিতে এত দিন সর্বোচ্চ ব্যয় করতে হতো ৫% সুদ। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করতে ব্যয় হয় সোয়া ৭%। কিন্তু ঈদকেন্দ্রিক টাকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর এখন নগদ টাকার সঙ্কট বেশি দেখা দিয়েছে। এ কারণে সুদের হারও বেড়ে হয়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে ৮%।