কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের বর্ধিত ব্যয় অনুমোদন

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর , ২০১৫ সময় ০৮:৩৫ অপরাহ্ণ

ওয়াসা১চট্টগ্রাম ওয়াসার মেগা প্রকল্পখ্যাত কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পের বর্ধিত ব্যয় অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি। সভায় ১ হাজার ৮শ’ ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

২০০৬ সালে জাপানের আর্থিক সহযোগিতায় শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৯৬৩ কোটি টাকা। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় এখন প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৮৪৮ কোটিতে। নিয়ম অনুযায়ী বর্ধিত ব্যয় একনেক ‍অনুমোদন করেছে।

মঙ্গলবার একনেকের সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রকল্পটির কাজ ২০১০ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিদেশী ঠিকাদারের সঙ্গে স্থানীয় ঠিকাদারের দ্বন্দ্ব, ওয়াসা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও উদাসীনতা, সর্বোপরি সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের চাঁদা দাবিসহ নানা অজুহাতে পদে পদে বাধা দেয়ার কারণেই মেগা প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্পে ৯ বছরে ব্যয় বেড়েছে ৯শ কোটি টাকা। এ বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে বলে আশাপ্রকাশ করেছেন ওয়াসার কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘২০০৬ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০১০ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিদেশী ঠিকাদারদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, এ নিয়ে সৃষ্ট মামলা জটিলতা ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের বাধার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের মেয়দ প্রায় পাঁচ বছর বৃদ্ধি পায়। কাজের মেয়াদ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার একনেকের সভায় বর্ধিত ব্যয়সহ প্রকল্পটির জন্য ১ হাজার ৮শ’ ৪৮ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের সম্পূর্ণ কাজ শেষ হবে। ’

ওয়াসা সূত্র জানায়, কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দৈনিক পানি পাওয়া যাবে প্রায় ১৪ কোটি লিটার। রাঙ্গুনিয়ার পোমরায় কর্ণফুলী নদী থেকে পানি উত্তোলন করে তা পরিশোধন করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে নগরীতে প্রেরণ করা হবে। নগরীর বাটালি হিল ও বায়েজিদ এলাকায় পাহাড়ের ওপর রিজার্ভার স্থাপন করে ওখান থেকে পানি সরবরাহ করার কথা।

সূত্র জানায়, নগরবাসীর তীব্র পানি সংকট দূর করতে সরকার ও জাইকার যৌথ অর্থায়নে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ২০০৬ সালে। এ জন্য সরকার চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইম্পোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএনটিআইইসি) ও বেইজিং সাউন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির (বিএসইইসি) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। ৬১০ কোটি টাকায় রাঙ্গুনিয়ার পোমরা এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা। প্রকল্প মেয়াদ ধরা হয় ২০১২ সাল পর্যন্ত।

কিন্তু চার বছরেও ঠিকাদার কাজ শুরু করতে না পারায় ২০১০ সালে আবার এ প্রকল্প রিভাইজড বা সংশোধন করা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রকল্প মেয়াদ অনুযায়ী ২০১২ সালের জুনে কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু দেখা গেছে, এ মেয়াদেও কাজ শুরু করতে পারেনি মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএনটিআইইসি ও বিএসইইসি। ফলে তারা ২০১১ সালে এসে সাব কন্ট্রাক্টে ওই প্রকল্পের পরিকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশী কোম্পানি প্রজেক্ট বিল্ডার্স লিমিটেডকে (পিবিএল) সাব-কন্ট্রাক্ট দেয়।

সূত্র জানায়, শর্ত অনুযায়ী ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে তাদের কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু দেখা গেছে এই সময়ের মধ্যে পিবিএল মাত্র ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে। দ্রুত কাজ শেষ করতে বহুবার জাইকা ও চীনা দূতাবাস চট্টগ্রাম ওয়াসাকে নিয়ে পিবিএলের সঙ্গে দেন-দরবার করে। পিবিএল কাজের গতি বাড়ায়নি। ইতিমধ্যেই পিবিএলের সঙ্গে উপ-চুক্তির সময় পার হয়ে যায়। এরপর প্রকল্প বাস্তবায়নে চায়না জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি সিএনটিআইইসি ও বিএসইইসিকে জাইকা, চীনা দূতাবাস ও চট্টগ্রাম ওয়াসা উপর্যুপরি চাপ দিতে থাকে। ফলে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএনটিআইইসি ও জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিএসইইসি কোনো ধরনের সাব-কন্ট্রাক্ট ছাড়া নিজেরাই কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং কাজ শুরু করে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাজ শেষ করতে না পারায় সাব-কন্ট্রাক্টর পিবিএলকে বরখাস্ত করা হয় এবং চুক্তির নিয়মানুযায়ী ১৪ দিনের মধ্যে প্রকল্প এলাকা থেকে তাদের মালামাল সরিয়ে নিতে বলে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পিবিএল তাদের মালামাল সরিয়ে না নিয়ে বরং তাদের কেন বরখাস্ত করা হলো এর কারণ জানতে চেয়ে মামলা ঠুকে দেয় আদালতে। সেই মামলা গত বছরের ৭ মে নিষ্পত্তি হয়। পিবিএল আবার হাইকোর্টে ২৭ এপ্রিল বরখাস্তের বিরুদ্ধে ৩ মাসের স্থগিতাদেশ আদায় করে। মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এর স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ এনে কাজ শুরু করে।

এ সময় তারা ওয়াসার সহযোগিতা চেয়ে এমডিকে চিঠি দেয়। মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবার দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা করলেও চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি বাগড়া বসায় স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা।

তারা হয় চাঁদা নয় ঠিকাদারি কাজ দেয়ার জন্য চাপ দেয় বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। অন্যথায় প্রকল্প এলাকায় কোনো ধরনের কাজ করা যাবে না বলে হুমকি দেয়। কিন্তু চাঁদা ও কাজ কোনটিই দিতে রাজি না হওয়ায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা মেগা এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেয়। প্রায় দুই মাস তাদের বাধার মুখে বন্ধ হয়ে থাকে কাজ। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা ফিরে যান। এ ঘটনায় প্রকল্পটির ম্যানেজার ও চীনা নাগরিক রাঙ্গুনিয়া থানায় একটি অভিযোগও দাখিল করেন। সর্বশেষ প্রশাসন ও উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে এ বছরের মার্চের দিকে আবার কাজ শুরু হয়।


আরোও সংবাদ