কর্ণফুলীকে বাঁচাতে অবিলম্বে নগরীতে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা চালু করুন

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২৯ মে , ২০১৪ সময় ০৮:২৩ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের লাইফ লাইন খ্যাত কর্ণফুলীকে বাঁচাতে অবিলম্বে নগরীতে সুয়্যারেজ সিস্টেম (পয়ঃনিষ্কাশন) চালুর দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদ ও গবেষকরা।

কর্ণফুলীকে বাঁচাতে অবিলম্বে নগরীতে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা লাচু করুনবৃহষ্পতিবার সকালে নগরীর ওয়াসা ভবনের সম্মেলন কক্ষে বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর আয়োজিত ‘কর্ণফুলী কি বুড়িগঙ্গা হয়ে যাবে?’ শীর্ষক এক গোল টেবিল বৈঠকে তারা এ দাবি জানান।

বক্তারা বলেন, ‘সুয়্যারেজ ব্যবস্থা না থাকায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এ প্রধান নদীটি ক্রমাগত দূষিত হয়ে বুড়িগঙ্গার অবস্থা ধারণ করছে। একদিকে এই নদীর আশপাশে গড়ে ওঠা ৭০০টি ছোট-বড় কলকারখানার বর্জ্য যেমন অপরিকল্পিতভাবে কর্ণফুলীতে পড়ায় নদীর বাস্তুসংস্থানকে বিনষ্ট হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে নগরীর প্রায় ৬০ লাখ মানুষের পয়ঃবর্জ্য নদীটিকে দূষিত করেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসাকে অবিলম্বে সুয়্যারেজ সিস্টেম চালু করতে হবে।’

আলোচনা সভায় ধারণাপত্র পাঠ করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক জাফর আলম। তিনি বলেন, ‘ওয়াসার সুয়্যারেজ সিস্টেম না থাকা, সিটি কর্পোরেশনের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ উপযোগী ব্যবস্থা না থাকা, নদীর পানি প্রবাহে বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে ঐতিহ্যবাহী কর্ণফুলী নদী দিন দিন ব্যবহার উপযোগিতা হারাচ্ছে। চট্টগ্রামসহ সারা দেশের মানুষের স্বার্থে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ নদীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এক সময় কর্ণফূলী নদীতে মিঠা পানির ৬৬ প্রজাতির এবং মিশ্র পানির ৫৯ প্রজাতির এবং সামুদ্রিক পরিযায়ী ১৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেতো। বর্তমানে মিঠা পানির ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির এবং মিশ্র পানির ১০ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকিগুলোর মধ্যে ১০ থেকে ২০ প্রজাতির মাছ ছাড়া অন্য প্রজাতির মাছ এখন বিপদাপন্ন। মূলত, শিল্প কারখানার বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, নাগরিক কঠিন বর্জ্য ও বাসাবাড়িতে সৃষ্ঠ তরল বর্জ্যের দূষণের কারণে এসব প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে।’

“আমরা ৮টি প্যারামিটারে নিয়মিত কর্ণফুলি নদীর পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করে আসছি। ফলাফলে ডিও (দ্রবীভূত অক্সিজেন) ও পিএইচ (ঋণাত্বক হাইড্রোজেন আয়ন ঘনত্বের পরিমাপক) এর মাত্রা অত্যন্ত ভয়াবহ। তবুও নদীর আঙ্গিক গঠন এবং ক্রমাগত জোয়ার-ভাটার কারণে এই নদী এখনো সম্পুর্ণ ব্যবহার উপযোগিতা হারায়নি। এ অবস্থায় সকলে সচেতন না হলে কর্ণফুলীও বুড়িগঙ্গায় পরিণত হবে।”

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহর সভাপতিত্বে বৈঠকে এছাড়াও বক্তব্য রাখেন সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া, ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজের সহযোগী অধ্যাপক মো. মোশাররফ, রসায়ন বিভাগের শিক্ষক দেবাশীষ পালিত, পরিবেশবিদ ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী, কাউন্সিলর রেহেনা কবির রানু, চন্দনাইশ উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আলো আক্তার চৌধুরী, সংগঠক জুনাব আলী প্রমুখ।

বৈঠকে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘সুয়্যারেজ সিস্টেমের কারণে যে কর্ণফুলী দূষিত হচ্ছে তা অস্বীকার করার কিছু নেই। সুয়্যারেজ সিস্টেম চালু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবুও নগরীতে সুয়্যারেজ চালু করার জন্য বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে একটি মাস্টার প্ল্যান প্রস্তুতের কাজ চলছে। বিশ্বব্যাংক এ কাজে টাকা দিতে আগ্রহী, জাইকার বাংলাদেশ প্রতিনিধিও নিজ থেকে এ কাজে অর্থায়নের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সকলের সহযোগিতা পেলে শীঘ্রই চট্টগ্রাম নগরীকে সূয়্যারেজের আওতায় আনা যাবে।’

তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলী ও হালদাকে বাঁচানোর জন্য যা যা করার তাই করতে হবে। শিল্প কারখানার বিকাশ করতে গিয়ে যেন আমরা এই নদীটিকে ধ্বংস করে না দেই। প্রয়োজনে শিল্প-কারখানা বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে।’

প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘কর্ণফুলীকে রক্ষায় সবার আগে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, চেম্বার, পরিবেশ, সাধারণ নাগরিক সবাইকে নিয়ে এ নদীকে দুষণ দখলের হাত থেকে রক্ষার পদক্ষেপ নিতে হবে। এককভাবে কোন প্রতিষ্ঠান যেমন নদী দূষণ করছে না, তেমনি এককভাবে দূষণ বন্ধও সম্ভব নয়।’

মো. মোশাররফ বলেন, ‘বলা হচ্ছে জোয়ার-ভাটার কারণে নদীতে পড়া শিল্প ও গৃহস্থলী বর্জ্য সাগরে মিশে যাচ্ছে। কিন্তু সেসব বর্জ্য সাগরের মাছের মাধ্যমে ঠিকই আমাদের পেটে ঢুকছে।’

প্রসঙ্গত, কর্ণফুলীকে দূষণমুক্ত করতে একই বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর আগে বুধবারও সিটি কর্পোরেশনের সম্মেলন কক্ষে মেয়রের উপস্থিতিতে ‘কর্ণফুলী কি বুড়িগঙ্গা হয়ে যাবে?’ শীর্ষক এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একই বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।