কবি নির্মলেন্দু গুণ

প্রকাশ:| রবিবার, ২১ জুন , ২০১৫ সময় ১১:৩৭ অপরাহ্ণ

২১ জুন বাংলাদেশের প্রথিতযশা কবি নির্মলেন্দু গুণের ৭০তম জন্মদিন। বাংলাদেশের সমকালীন জনপ্রিয় কবিদের মধ্যে অন্যতম নির্মলেন্দু গুণ। এ ছাড়া সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় রয়েছে তার সফল বিচরণ। নির্মলেন্দু গুণ ১৯৪৫ সালের এ দিনে (২১ জুন) নেত্রকোণার বারহাট্টায় জন্মগ্রহণ করেন।
কবি নির্মলেন্দু গুণ
নির্মলেন্দু গুণ ১৯৬২ সালে বারহাট্টার করোনেশন কৃষ্ণপ্রসাদ ইনস্টিটিউট থেকে দুই বিষয়ে লেটারসহ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করেন৷ উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে৷ মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্টের সুবাদে রেসিডেন্সিয়াল স্কলারশিপ পান৷ ১৯৬৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডের ১১৯ জন প্রথম বিভাগ অর্জনকারীর মাঝে তিনিই একমাত্র নেত্রকোণা জেলার। ভাল ফলাফলের জন্য ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পেয়েছিলেন৷ তাকে প্রতি মাসে ৪৫ টাকা ও বছর শেষে আরও ২৫০ টাকা দেওয়া হতো৷

এরপর সুযোগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে৷ কিন্তু হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কারণে ফিরে আসেন গ্রামে৷ ১৯৬৫ সালে বুয়েটে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷ কিন্তু ভর্তি হতে পারেননি। ১৯৬৯ সালে প্রাইভেটে বিএ পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন৷

মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে নেত্রকোণার ‘উত্তর আকাশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কবিতা ‘নতুন কাণ্ডারী’৷ ১৯৬৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ‘সাপ্তাহিক জনতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘কোনো এক সংগ্রামীর দৃষ্টিতে’৷ সম্পাদনা করেন ‘সূর্য ফসল’ নামের সংকলন৷ কবি সিকান্দার আবু জাফর এতে আশির্বাণী লিখে দেন৷ সংলনের বিভিন্ন কবিতায় ফুটে উঠে শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ফলস্বরূপ মামলা হয় এবং জারি হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা৷ পরে প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা খুরশেদ চৌধুরী ও মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবের মধ্যস্থতায় মামলা প্রত্যাহার করা হয়৷

এরপর তাকে আসামি করে ডাকাতির মামলা করা হয়। তিনি বেছে নেন পলাতক জীবন। কখনও গৌরীপুর, শ্যামপুর, কখনও জারিয়া-ঝাঞ্ছাইলে আত্মগোপনে থেকেছেন৷ এক সময় চলে আসেন ঢাকায়৷ থাকতে শুরু করেন নাট্যকার বন্ধু মামুনুর রশীদের সঙ্গে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের হোস্টেলে৷ কাজ করেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকায়৷ এক সময় তুলে নেওয়া হয় মামলা৷

৬ দফা আন্দোলন চলাকালে ‘সংবাদ’ পত্রিকায় ছাপা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গিত নির্মলেন্দু গুণের কবিতা ‘প্রচ্ছদের জন্য’৷ ঢাকা শহরে তার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা ছিল না৷ কবিতা লিখতেন, ঘুরে বেড়াতেন, আড্ডা দিতেন ও বইয়ের প্রুফ দেখতেন৷ ১৯৬৮ সালের ২৯ জুলাই হোটেল পূর্বাণীতে তরুণ কবিদের কবিতা পাঠের আসরে সুযোগ পান৷ পত্রিকা ও টেলিভিশনের মাধ্যমে বেশ প্রচার পায় এ আসর৷

নির্মলেন্দু গুণ ১৯৬৯ সালে রেডিওতে কবিতা পাঠের আসরে ডাক পান। তখন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে নিয়মিত কবিতা প্রকাশ হতে থাকে৷ ১৯৭০ সালের ২১ জুলাই তরুণ কবিদের কবিতা পাঠের আসরে আবৃত্তি করেন বিখ্যাত কবিতা ‘হুলিয়া’৷ সমালোচনা লিখেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী ‘তৃতীয় মত’ কলামে৷ শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘পূর্ব বাংলার শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থে স্থান পায় কবিতাটি৷ ওই বছরই খান ব্রাদার্স বের করে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’৷

স্বাধীনতার আগে চাকরি করেছেন ‘কণ্ঠস্বর’, ‘নাগরিক’, ‘পরিক্রম’, ‘জোনাকী’ ও ইংরেজী পত্রিকা ‘পিপল্’-এ। স্বাধীনতার পর সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায়৷ আরও কাজ করেন ‘সংবাদ’, ‘দৈনিক বাংলার বাণী’, ‘বাংলাবাজার’ ও ‘দৈনিক আজকের আওয়াজ’ পত্রিকায়।

নির্মলেন্দু গুণের প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে

কাব্যগ্রন্থ

‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ (১৯৭০), ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ (১৯৭২), ‘দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী’ (১৯৭৪), ‘চৈত্রের ভালোবাসা’ (১৯৭৫), ‘ও বন্ধু আমার’ (১৯৭৫), ‘আনন্দ কুসুম’ (১৯৭৬), ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ (১৯৭৮), ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’ (১৯৭৯), ‘চাষাভুষার কাব্য’ (১৯৮১), ‘অচল পদাবলী’ (১৯৮২), ‘পৃথিবীজোড়া গান’ (১৯৮২), ‘দূর হ দুঃশাসন’ (১৯৮৩), ‘নির্বাচিতা’ (১৯৮৩), ‘শান্তির ডিক্রি’ (১৯৮৪), ‘ইসক্রা’ (১৯৮৪), ‘নেই কেন সেই পাখি’ (১৯৮৫), ‘যখন আমি বুকের পাঁজর খুলে দাঁড়াই’ (১৯৮৯), ‘ধাবমান হরিণের দ্যুতি’ (১৯৯২), ‘আনন্দ উদ্যান’ (১৯৯৫), ‘ইয়াহিয়াকাল’ (১৯৯৮), ‘আমি সময়কে জন্মাতে দেখেছি’ (২০০০) এবং ‘বাৎস্যায়ন’ (২০০০)। গল্পগ্রন্থ : ‘আপন দলের মানুষ’, ছড়া : ‘সোনার কুঠার’ (১৯৮৭), আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ : ‘আমার ছেলেবেলা’, ‘আমার কণ্ঠস্বর’ এবং ‘আত্মকথা ১৯৭১’ (২০০৮) এবং অনুবাদ : ‘রক্ত আর ফুলগুলি’ (১৯৮৩)। তার ‘হুলিয়া’ কবিতা অবলম্বনে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তানভীর মোকাম্মেল এবং ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ অবলম্বনে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন মাসুদ পথিক।

নির্মলেন্দু গুণ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বাংলা একাডেমি পদক (১৯৮২) ও একুশে পদক (২০০১)।
– See more at: http://www.alokitobangladesh.com/online/literature/2015/06/21/4867#sthash.8RfQmIMh.dpuf