কখনো ফাঁকি দেই নি

প্রকাশ:| সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি , ২০১৭ সময় ১০:১৯ অপরাহ্ণ

অধ্যাপক খালেদ সম্মাননা স্মারক গ্রহণকালে সিদ্দিক আহমেদ
বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক মনীষী অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের ত্রয়োদশ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক ও অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে গৃহিত কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় গতকাল ২৭ ফেব্র“য়ারি বিশিষ্ট সংবাদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বরেণ্য অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক বর্ষিয়ান সাংবাদিক সিদ্দিক আহমেদ ‘মনীষী অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্মাননা স্মারক-২০১৬’ গ্রহণ করেছেন।
পরিষদের সভাপতি শিল্পপতি মুহাম্মদ ওসমান গণি চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক লেখক-সাংবাদিক শওকত বাঙালি’র নেতৃত্বে পরিষদ নেতৃবৃন্দ তাঁর চান্দগাঁওস্থ বাসায় গিয়ে সম্মাননা স্মারকটি এবং স্মারকের অর্থমূল্য ১৫ হাজার টাকা সিদ্দিক আহমেদের হাতে তুলে দেন।
সংক্ষিপ্ত অনাড়ম্বর আয়োজনে সিদ্দিক আহমেদ বলেন, প্রতিনিয়ত একজন সৎ মানুষ হিসেবে সর্বক্ষেত্রে নিজেকে নির্মাণের চেষ্টা করেছি। ফাঁকি বিহীন শিল্পীত জীবন-যাপন করছি। নিজেকে যেমন কখনো ফাঁকি দেইনি অন্যকেও কোনদিন ফাঁকি দেওয়ার কথা মনে আসেনি। কখনো কারো কাছে কোথাও মাথা নোয়াইনি। আপোষ করিনি। জীবনকে আমি আমার মতো করে উপভোগ করেছি। যথেষ্ট বিত্তশালী পরিবারের সন্তান হয়েও অর্থ-বিত্ত আমার ছিলনা ঠিকই চিত্ত দিয়েই আমি নিজেকে জয়ী করেছি সর্বত্র। আমার যা ছিলো-যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট থেকেছি। নেই বলে কোন হা-পিত্যেশ কিংবা গ্লানি আমার কখনো ছিলো না। আমি কারো কাছে কখনো হাত পাতি নি। আমার যতটুকু আছে ততটুকুতেই সন্তুষ্ট থেকেছি। নিজের ছেলে-মেয়েদের সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছি।
১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী, ’৬৬ সালে দক্ষিণ রাউজান ছাত্র ইউনিয়নের সেক্রেটারী, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অংশগ্রহণকারী, সাপ্তাহিক একতা’র শুরুর দিকে সাংবাদিকতা, ’৭০ সালে সংবাদে যুক্ত হয়ে খেলাঘরের সহ-সভাপতি, ১৩৫ টাকার সম্মানীতে খিলগাঁও স্কুলের শিক্ষকতা, ঢাকার কষ্টকর শিল্পীত জীবন, নিজ গ্রামের গশ্চি হাই স্কুলে শিক্ষকতা এবং রণেশ দাশ গুপ্ত, সত্যেন সেন, বজলুর রহমান প্রমুখ কীর্তিমানদের সান্নিধ্যের গল্পসহ বহুমাত্রিক স্মৃতিচারণ করে এই জীবন্ত পন্ডিত সিদ্দিক আহমেদ পরিষদ নেতৃবৃন্দকে মনীষী অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্মাননা প্রদান করায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, কোন না কোনভাবে আপনারা আমাকে জেনেছেন, জেনে ভালোবেসেছেন-সম্মান জানিয়েছেন। এই সম্মাননা আমি আমৃত্যু মনে রাখবো। আপনাদের মনে রাখবো।
তিনি বলেন, আমি জীবনে কখনো ভেঙে পড়িনি। দুরারোগ্য ক্যান্সারও আমাকে মানসিকভাবে পরাজিত করতে পারে নি। আমি অনেক বিখ্যাত হতে চাইনি। তবে যা হতে চেয়েছি তা হয়েছি। বি.এ, এম.এ ডিগ্রি না থাকার পরও আমার নয়টি বই বেরিয়েছে। এটি কম কথা নয়।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর হাত দিয়ে কমপক্ষে ৫০ জন লোক ভারতে ট্রেনিং-এ গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দিনে মাস্টারি, রাতে দক্ষিণ রাউজান চষে বেড়িয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভূমিকা রেখেছি। আমি মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করেছি। সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধা হতে চাইনি। অনেকেই আমাকে ফরম পূরণের জন্য বলেছে। আমি করিনি। যেহেতু আমি ভারতে ট্রেনিং-এ যাইনি, সেহেতু আবেদনপত্রে কোন মিথ্যা তথ্য দিয়ে সারাজীবনের সততাকে বিকিয়ে দেইনি।
মুক্তিযোদ্ধাদের সাম্প্রতিক যাচাই-বাচাইয়ের প্রক্রিয়ার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, টাকার বিনিময়ে অনেক অ-মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছে। আবার অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়ছে। এটি জঘন্য।
মাইক্রোস্কোপ দিয়েও কোন অসততার চিহ্ন তাঁর জীবনে খুঁজে পাওয়া যাবেনা উল্লেখ করে অনেকটা অহংকার করেই জীবনযোদ্ধা সিদ্দিক আহমেদ বলেন, সমস্ত লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে আমি নির্মোহ জীবন-যাপন করেছি। আমি কোন অর্থ চাইনি, বিত্ত চাইনি, বাড়ি চাইনি, গাড়ি চাইনি, টাকা চাইনি। চেয়েছিলাম শুধু নিজেকে যেন ফাঁকি না দেই।
অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্পর্কে তিনি বলেন, সবাই ভুলে গেলেও বাংলাদেশ তাঁকে ভুলতে পারবে না। অন্যতম সংবিধান প্রণেতা হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানে তাঁর স্বাক্ষর রয়েছে। দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেককে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তিনি বলেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের জন্যই তিনি দৈনিক আজাদী করেছেন। নিজের ভাগ্নে এবং জামাতার মর্যাদা অনুযায়ী একটি কর্মক্ষেত্র তৈরি করে দিতে চেয়েছিলেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের সম্পাদনা গুণে দৈনিক আজাদী জনগণমননন্দিত পত্রিকা হয়েছে। আজাদী হয়েছে বলেই আমি সিদ্দিক আহমেদ আজকের অবস্থানে আসতে পেরেছি।
পরিষদ সাধারণ সম্পাদক লেখক-সাংবাদিক শওকত বাঙালি বলেন, ২০১৪ সালে বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও নাট্যবোদ্ধা অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদকে, ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি বর্ষিয়ান সাংবাদিক আতাউল হাকিমকে এবং চলতি সনে সিদ্দিক আহমেদকে ‘মনীষী অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্মাননা স্মারক’ প্রদান করতে পেরে আমরা সম্মানিতবোধ করছি। এসময় অন্যদের মধ্যে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং দেশ টেলিভিশনের বিভাগীয় প্রতিনিধি সাংবাদিক সৈয়দ আলমগীর সবুজ, পরিষদের কার্যকরী সভাপতি শিল্পপতি ফেরদৌস খান আলমগীর, অর্থ সম্পাদক মুহাম্মদ মহসীন চৌধুরী, কার্যনির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট মোস্তফা আনোয়ারুল ইসলাম এবং সিদ্দিক আহমেদের জ্যৈষ্ঠপুত্র তানিম আহমেদ সিদ্দিক বুলবুল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৮ ফেব্র“য়ারি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ স্মরণায়োজনে অসুস্থতাজনিত কারণে সিদ্দিক আহমেদ উপস্থিত থাকতে পারেন নি। তাই পরিষদ নেতৃবৃন্দ বাসায় গিয়ে সম্মাননা স্মারক তাঁর হাতে তুলে দেন।


আরোও সংবাদ