কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প বিকাশে বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা ও আমাদের করণীয়

প্রকাশ:| বুধবার, ২৭ সেপ্টেম্বর , ২০১৭ সময় ০১:২৬ অপরাহ্ণ

সন্মানিত হোটেলিয়ার, পর্যটন ব্যবসায়ী ও পর্যটনপ্রেমী,
আস্সালামু আলাইকুম।

পর্যটক মানুষের ইতিহাস মানব সভ্যতা বিকাশের ইতিহাস। অজানাকে জানবার অদম্য আকাংখায় মানুষ সেই আদিকাল থেকে ঘর ছেড়েছে, দেশান্তরি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার অধূনা উন্নতিরও বহুকাল আগে থেকে অজানাকে জয় করবার অদম্য নেশায় মানুষ বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় চেপে, জাহাজে ভেসে অভিযাত্রা করেছে। বছরের পর বছর ধরে পর্যটক হয়ে তারা খোঁজে বেড়িয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জীবন যাত্রা, তাদের জীবিকা, তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতা। বিপদসংকূল এসব অভিযাত্রায় বহু মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করেছেন, হারিয়ে গেছেন, কিন্তু আবিষ্কারের চেতনা স্তব্ধ হয়নি। আবিষ্কারের এই নেশা মানুষকে শ্রেষ্ঠ করেছে। এসব সাহসী মানুষের জবানীতেই প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস জানা সম্ভব হয়েছে।
সব অর্থেই পর্যটন মানুষের প্রাচীনতম এক নেশা, যা ক্রমান্বয়ে পেশা হয়ে উঠেছে। আজ এই পেশা শিল্পে পরিণত হয়েছে। লক্ষ মানুষ এতে জীবন অতিবাহিত করছে। পৃথিবীর সমগ্র জনগোষ্ঠার প্রতি ১১ জনের মধ্যে গড়ে ১ জন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন পেশার সাথে জড়িত। বাংলাদেশে যারা এ পেশায় নিয়োজিত তারা সবাই শিক্ষিত, রুচিশীল এবং পর্যটনকে অকৃত্রিম ভালবাসে। তাদেরই প্রচেষ্টায় আমাদের দেশের প্রবৃদ্ধিতে পর্যটন আজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। পর্যটন আজ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা:
নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি, দৃষ্টিনন্দন জীবনাচার বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণসমৃদ্ধ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে। তাই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হয়েছেন। তুরনামুরকভাবে বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের দেশ হলেও বিদ্যমান পর্যটন আকর্ষণে যে বৈচিত্রতা সহজেই পর্যটকদের আকর্ষন করতে পারে। এ দেশে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত- কক্সবাজার, পৃথিবীর একক বৃহত্তম জীববৈচিত্রে ভরপুর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল- সুন্দরবন, একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূযৃাস্ত অবলোকনের স্থান সমুদ্রকন্যা- কুয়াকাটা, দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ রংয়ের নয়নাভিরাম চা পাতার চারনভূমি- সিলেট, আদিবাসীদের বেচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি ও কৃষ্টি আচার -অনুষ্ঠান সমৃদ্ধ উচ্চ বনভূমি ঘেরা – পার্বত্য চট্রগ্রাম, সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষী উত্তরাঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো।
স্বাভাবিকভাবে এ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সম্ভআবনা অপরিসীম। নতুন করে কৌশল ঠিক করে সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পর্যটনে মডেল হতে পারে। পৃথিবীতে পর্যটন শিল্প আজ একটি অন্যতম বৃহত্তম শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। পর্যটন মিল্পের বিকাশের ওপর বাংলাদেশের অনেকখানি সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করছে। দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থান ঘটবে ও বেকারত্ব দূরীকরণের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন সফল হবে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের প্রাচীন যুগের ইতিহাস ও শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রথার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ঐতিহাসিক স্থান দেখার জন্যও পর্যটকরা নিজ দেশের সীমানা পেরিয়ে দূর-দূরান্তে ছুটে চলে প্রতিনিয়ত। পর্যটন হলো একটি বহুমাত্রিক শ্রমঘন শিল্প। এ শিল্পের বহুমাত্রিকতার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সম্ভাবনা তৈরী হয়। সরকারী অনুদান ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় সাধন করার পাশাপাশি উন্নত অবকাঠামো, সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থা দরকার পর্যটনের জন্য। পর্যটন শিল্পের উপাদান হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, পর্যটন স্থাপনা ও ক্ষেত্রগুলো দেশে ও বিদেশে আকর্ষণীয় উপস্থাপনের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, পর্যটনের মুলকথা পর্যটকদের এখানে আসতে উদ্বুদ্ধ করা। শুধু বিদেশিরা নয়, তারা আসার আগে আমাদের নিজ দেশের পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে হবে। নিজেরা প্রথমে নিজ দেশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হবে এবং তারপর বিদেশিদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে স্পটগুলো ভ্রমণ করার জন্য।

প্রেক্ষিত কক্সবাজার:
সারা বিশ্বের ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া অকৃত্রিম বালুকারাশি, মনকাড়া নীল জলরাশি, দিগন্ত জোড়া নারিকেরবিথি, আলোক উজ্জ্বল সৈকত, সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, ঝাউবিথির নির্মল ছায়া আর আনন্দ উল্লাসে মেতে থাকা পর্যটকদের হাসিমাখা মুখ কি নেই ্এতে? যেন একটুকরো স্বর্গ। মাটি আর মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা এবং স্থাপত্য নির্দেমনার সৌন্দর্য এক কথায় অনির্বচনীয়। বায়ু এতই নির্মল যে ভ্রমণকারীরা একবার ঘুরে গেলেই নতুন মানুষ হয়ে উঠে। বিেেশষ করে অগ্রাহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস এ স্থানকে পৃতিবীর অংশ মনে হয় না, মনে হয় কোন স্বর্গীয় অংশ। বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত অসুবিধা ছাড়াও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে পর্যটকরা উদ্বিগ্ন থাকলেও বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন ১২০ কিঃমিঃ বালুকাময় সৈকতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটকের পদভারে মুখরিত হয়। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক কক্সবাজারে ভ্রমণে আসছে। কক্সবাজার সৈকতে গেলে দেখা যায় অভাবনীয় দৃশ্য। হাজার হাজার নারী-পৃরুষ, শিশুর অপূর্ব মিলনমেলা। আদের আনন্দ উচ্ছাসে মুখরিত সাগর তীর।
শহরের অভ্যন্তরে ব্যাপকহারে পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল নিধন, সরকারী খাসভূমি দখল করে অবৈধ ইমারত গড়ে উঠা ও অপরিকল্পিত হোটেল জোন গড়ে উঠার কারণে কক্সবাজার এখন শ্রীহীন। তবুও কক্সবাজারের টানে পর্যটকরা আসছে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, হিমছড়ির ঝর্ণা, দরিয়ানগর, নয়াভিরাম ইনানীর পাথুরে বিচ, টেকনাফের মাথিনের কূপ, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিণ, ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ, রাখাইন সম্প্রদায়ের বৌদ্ধ মন্দির ও প্যাগোডা, বৈচিত্রময় জীবনধারা, ডুলাহাজারার বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত সোনাদিয়া দ্বীপসহ কক্সবাজার জেলার পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় লেগেই থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এ সব পর্যটকদের আবাসন বা রাত্রিযাপনের জন্য গড়ে উঠেছে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে প্রায় ৩৫০ টি হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট-কটেজ-গেষ্ট হাউজ। বেসরকারী উদ্যোগে গড়ে উঠা আন্তর্জাতিক মানের হোটেলগুলো দেশী-বিদেশী পর্যটকদেও গ্রহন করতে ও বিশ্বমানের সেবা প্রদান করতে সদা প্রস্তুত। এ সব হোটেল গড়ে উঠার কারণে বিদেশী পর্যটকসহ দেশীয় পর্যটকদের কক্সবাজারে আগমন বেড়েছে আশাতীত।

এই বিশাল সম্ভাবনার কক্সবাজারের উন্নয়নের রাশ টেনে ধরেছে সমাধানযোগ্য কিছু সমস্যা। সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগই পারে এসব সমস্যার সমাধান করে কক্সবাজারকে বিশ্ব দরবারে আকর্ষণীয় ও সুনামের সাথে তুলে ধরতে। এর ফলে কক্সবাজার হয়ে উঠবে বিশ্ব পর্যটনের একটি অন্যতম প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম পর্যন্ত সড়কের অবস্থা মোটামোটি ভাল হলেও চট্রগ্রাম থেকে কক্সবাজার এবং শহরের অভ্যন্তরের সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। নেই কোন রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। কক্সবাজারে একটি বিমান বন্দর থাকলেও তা আন্তর্জাতিক মানের নয়। বিমান ভাড়া অন্যান্য রুটের তুলনায় বেশী। এ ভাড়া দিয়ে পার্শ¦বতী দেশে ঘুরে আসা যায়।

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পর্যটন স্পটে পর্যটকদের নানা হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়। তারা ছিনতাই সহ নানা রকমের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বিশেষত নারী ও বিদেশী পর্যটকরা বেশী সমস্যায় পড়েন। সমুদ্র সৈকতের লাবনী, সী-ইন, কলাতলী, ইনানী ও টেকনাফ সৈকতে বিদেশিরা নামতে পারেন না। গোসলে নামলেই বখাটেরা উৎপাত শুরু করে। নিরাপওার জন্য টুরিষ্ট পুলিশ থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। দিনের বেলায় রোহিঙ্গা রিক্সাওয়ালা ও অবৈধ টমটম ড্রাইভার কর্তৃক পর্যটক হয়রানী, ফেরিওয়ালা, টোকাইদের উৎপাত ছাড়াও পর্যটন স্পটে জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যের কারণে পর্যটকরা অনুৎসাহিত হন।

কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের জন্য নেই কোন নাম মাত্র বিনোদনের ব্যবস্থা। সমুদ্রে স্নান করা ও বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ভ্রমন ছাড়া তাদের আর কোন বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। নেই কোন শিশু পার্ক, থিম পার্ক, ডিজিটাল সিনেমা হল, নাইট ক্লাব, ডিউটি ফ্রি কোন সুপার ষ্টোর ও বার। কিছু বার থাকলেও সেখানে এলকোহলের মূল্য ঢাকা ও চট্রগ্রামের তুলনায় অনেক বেশী।

ভাটার টানে লাল পতাকার সর্তক না মেনে আবেগ আর উচ্ছাসে মেতে সমুদ্রের পানিতে নেমে দূর্ঘটনারও শিকার হচ্ছে অনেক পর্যটক। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পানিতে ডুবে প্রাণহানির ঘটনা আর যাতে না ঘটে সে জন্য নেটিং ব্যবস্থার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও এ পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। সমুদ্র স্নানে যাওযা পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহত সিগন্যালিং ব্যবস্থা এখনও এনালগ যুগের ও দায় সারা গোছের। উদ্ধার কাজে নিয়োজিত লাইফ গার্ড ব্যবস্থা অপ্রতুল ও কার্যকরী নয়। বিশাল সমুদ্র সৈকতের নেই কোন পরিকল্পিত, কার্যকরী ও আকর্ষণীয় ব্যবস্থাপনা।

বর্ষা মৌসুম এলেই অতি বৃষ্টিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার এূটির কারণে বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় জলবদ্ধতা। বাড়তে থাকে জনভোগান্তির মাত্রা। অপরিকল্পিত আবাসিক, বাণিজ্যিক ও হোটেল-মোটেল-কটেজ-এপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণের ফলে শহর, পার্শ্ববতী এলাকা ও হোটেল জোনে প্রতি বছর বাড়ছে জলবদ্ধতা। বিভিন্ন ড্রেন-নালা-নর্দমা ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি সহজেই সরে যেতে না পেরে জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয় এবং শহরের অভ্যন্তরে ব্যাপকহারে পাহাড় কাটায় বৃষ্টির পানির সাথে পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদায় কোন কোন রাস্তায় বৃষ্টির পানি কাদার সাথে মিশে জলকাদায় ভরে যায়। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন এরাকাবাসী ও পর্যটকরা। এছাড়া টেকসই, কার্যকরী ও সুষ্ঠ তদারকির অভাবে ড্রেনগুলো বৃষ্টির পানি নিস্কাশনে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও উন্নয়নের কারণে কক্সবাজারের হোটেল -মোটেলগুলোর জন্য পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। নেই কোন নির্দিষ্ট ময়লা ফেলার ব্যবস্থা। প্রতিতিন শত টন বর্জ্য নালা বা সমুদ্রে ফেলা হচ্ছে। ফলে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।

পর্যটন শহর কক্সবাজারে দিন দিন বাড়ছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। প্রতি বছর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পাশাপাশি লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় মারাতœক কষ্টে এখানকার মানুষ। বিশেজ্ঞদের মতে পর্যটক ও স্থানীয় জনগনের আবাসিক চাহিদা মেটানোর জন্য কোন রকম বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়াই কক্সবাজারে অপরিকল্পিত ভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ, যেখানে- সেখানে গভীর নলকূপ স্থাপন করে ভু-গর্ভস্থ পানি তোলা হচ্ছে। এতে কক্সবাজার শহর ও হোটেল-মোটেল অঞ্চল সহ আশপাশের এলাকার ভৃ-গর্ভস্থ পানির স্তরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লবণাক্ত পানি এসব এলাকার ভু-গর্ভস্থ পানির আধারে প্রবেশ করে পানযোগ্য সুপেয় পানিকে দূষিত করছে। এতে সুপেয় পানি প্রাপ্তি যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি বিরূপ প্রভাব পড়ঠে পরিবেশে।

বর্তমান বিশ্বে আইসিটি সেক্টরের পর হোটেল শিল্পে নিয়োগের পরিসংখ্যান সবচেয়ে বেশী। কক্সবাজারেও গড়ে উঠা হোটেলগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় হাজার হাজার দক্ষ জনশক্তির । দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন মিটাতে হোটেলগুলো কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, ট্রেনিং সেন্টার, ইনস্টিটিউট হেকে হোটেল ম্যানেজমেন্টের উপর প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দিচ্ছে। যার শতকরা প্রায় ৪০% হচ্ছে কক্সবাজার এলাকার জনগোষ্ঠি। অবশিষ্ট ৬০% অন্যান্য জেলার। চাকুরী পাওয়ার ক্ষেত্রে কক্সবাজার এলাকার মানুষের পিছিয়ে পড়ার কারণ হচ্ছে এ এলাকায় হোটেল ম্যানেজমেন্টের উপর প্রশিক্ষণের জন্য কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি, কিংস্টন একাডেমী, হোটেল সী প্যালেস্ হোটেল ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট, মুক্তি কক্সবাজার সহ হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। নেই কোন সরকারী পর্যটন ইনস্টিটিউট। তাই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এলাকার জনগোষ্ঠি এ সন্মানজনক পেশায় আসতে পারছে না।

কক্সবাজারের পর্যটন বিকাশের আরেকটি বড় বাধা হচ্ছে হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট-কটেজে চাকুরীর অনিশ্চয়তা। কিছু অসাধু হোটেল কর্তৃপক্ষ হোটেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ম বহিভূর্ত বরখাস্ত ও নানাভাবে হয়রানী করে থাকে। বাংলাদেশ শ্রস আইন ২০০৬ এর কোন ধারাই ঐসব অসাধু হোটেল কর্তৃপক্ষ মেনে চলে না। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- কর্মচারীদের নিয়োগপত্র না দেওয়া, ৮-১০ ঘন্টার অধিক সময় কাজ করতে বাধ্য করা, ওভার টাইমের মজুরী নিয়ে টালবাহানা, প্রাপ্য ছুটি না দেওয়া, মূল বেতনের অর্ধেক মজুরীতে কাজ করতে বাধ্য করা, কোন নোটিশ ছাড়া বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানো, হোটেলে আগত অতিথিদের কাছ থেকে কর্মচারীদের নামে সার্ভিস চার্জ গ্রহন করে হোটেল মালিক কর্তৃক পুরাটইি আতœসাৎ করা।

২০১৫-২০১৬ জাতীয় বাজেট ও কক্সবাজারবাসীর স্বপ্ন:
গম্প্রীতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয় ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেট। এ বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায় ওখানে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্থান পেয়েছে ৯ টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এ সব প্রকল্প সমুহ হল টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিষ্ট জোন, টেকনাফের জালিয়ার দ্বীপে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কক্সবাজারে পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র স্থাপন, পর্যটন উপলকে আর্ন্তজাতিক মানের উন্নয়ন, কক্সবাজারে রেললাইন স্থাপন, বিমানবন্দরকে আর্ন্তজাতিক মানের উন্নয়ন, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক উন্নয়ন, কক্সবাজার, মহেশখালী ও সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটন বান্ধব উন্নয়ন এবং মহেশখালীতে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন।
বাজেটে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে স্থান পাওয়া ৯ টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কারণে সকলেই স্বপ্ন দেখছেন পুরা জেলার পর্যটনখাত ও জেলার উন্নয়নের। এ সব প্রকল্প বাস্তবে রুপ নিলে কক্সবাজার হবে আর্ন্তজাতিক মানের পর্যটন নগরী ও দেশের প্রবৃদ্ধিতে তা অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কক্সবাজারকে আর্ন্তজাতিক মানের পর্যটন নগরী হিসেবে দেখতে চাইলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে প্রায় পাঁচ বছর। এর মধ্যে সরকার কক্সবাজারের উন্নয়নের সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করবে বলে আশা করা যায়। যার সুবিধা ভোগ করবে কক্সবাজারের মানুষ। পর্যটন এলাকায় সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য গৃহীত প্রকল্প ইতমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। বীচ এলাকায় সার্বক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা করা হয়েছে। কক্সবাজার বিমান বন্দরকে আর্ন্তজাতিকমানে উন্নয়নের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। চট্রগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২৬ কিঃমিঃ পর্যন্ত রেল লাইনের ভূমি অধিগ্রহণের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। চট্রগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ককে ইতিমধ্যে চার লাইনে উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। কক্সবাজার থেকে সরাসরি সমুদ্র দেথতে দেখতে টেকনাফ পর্যন্ত যাবার মেরিন ড্রাইভ সড়কের কাজ আগামী ডিসেম্বর নাগাদ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। টেকনাফের সাবরাং এলাকায় ১২০০ একর জমিতে বিশেষ পর্যটন অঞ্চল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। জমি অধিগ্রহন করা কাজ চলছে। ওখানে বিদেশী পর্যটকদেও জন্য বিশেষ জোন তৈরীর কাজ চলছে। একই সঙ্গে পর্যটনের উন্নয়নে একটি মেঘা প্রকল্প গ্রহন করা হয়েছে। পর্যটনের মালিকাধীন মোটেল শৈবাল সংলগ্ন ১৩০ একর জমিতে তৈরী হবে ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পর্যটন ”হলিডে কমপ্লেক্স”। এখানে থাকবে তারকা মানের হোটেল, মোটেল, বীচ ভিলা, ওযাটার ভিলা, পুল ভিলা, গলফ কোর্স, কনভেনশন হল, নাইট ক্লাব, বিনোদন পার্ক। পাশাপাশি মোটেল প্রবালের ৬ একর জমিতে তৈরী হবে পর্যটন ইনস্টিটিউট ।

আমাদের করণীয়:
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের বিকাশকে গুরুত্ব প্রদান করে ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ হিসেবে ঘোষনা করে এবং তার ধারাবাহিকতায় ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরের বাজেটে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ৯টি প্রকল্প গ্রহন করে। প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল হলেও সরকারের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের বিকাশে ও কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়নে আমাদের বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও প্রদক্ষেপ নিতে হবে। সম্ভাবনার এই কক্সবাজারকে পর্যটন নগরী গড়ে তুলতে প্রথমে প্রত্যেকটি প্রকল্প থেকে দূর্নীতি দূর করতে হবে। মিয়ানমারের অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হবে। নইলে রোহিঙ্গা রিক্সাওয়ালা কর্তৃক পর্যটক হযরানী, সামাজিক নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। করাতলী থেকে হলিডে মোড় পর্যন্ত প্রত্যেক রিক্সাওয়ালাদের বাধ্যতামূলক ট্যুরিষ্ট জোনে রিক্সা চালানোর লাইসেন্স গ্রহন করতে হবে। কোন ভাবেই পর্যটকদের হয়রানী করা যাবে না। পর্যটক যেখানে যেতে চাইবে, সেখানে যেতে হবে। না হলে ট্যুরিষ্ট জোনে তাদের রিক্সা চালাবার লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। তাদের আশ্রয়-প্রশয়কারীদের চিহিৃত করে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অবৈধ পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল নিধন, সরকারী খাসভূমি দখল, অপরিকল্পিত ইমারত তৈরী, ট্যুরিষ্ট পুলিশকে আধুনিকায়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তা বিধানে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন, নিরাপত্তা হেল্পডেস্ক স্থাপন, বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে আরো গতিশীল, সমুদ্রে নেটিং ব্যবস্থা, লাইফ গার্ড, ওয়াচ টাওয়ার আধুনিকায়ন, সমুদ সৈকত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য বিক্রি বন্ধ, দ্রৃূত বিনোদন পার্ক প্রতিষ্ঠা, যানজট সমস্যার সমাধান, ড্রেনেজ সমস্যার সমাধান, সুপেয় পানি সমস্যার সমাধানসহ সমুদ্র সৈকতে পর্যাপ্ত লাইটিং এর ব্যবস্থা গ্রহন, হোটেল, রেস্তোরার লাইসেন্স এর জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেবা চালু, হোটেল কর্মচারীদের শ্রম আইন অনুযায়ী সকল সমস্যার সমাধান করা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া, পর্যটন বিকাশে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কক্সবাজারের পর্যটনের আলাদা ই-কমার্স ওয়েব পোর্টাল , অনলাইন ডিরেক্টরি চালু সহ বিদেশিদের এখানে অর্থায়নে উৎসাহিত করে ১২০ কিঃমিঃ সমুদ্রকে প্রকৃত ব্যবহার করাসহ সরকারের গৃহীত প্রকল্পগুলো যাতে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়, তার জন্য সরকারের পাশাপাশি ট্রুর অপারেটসহ বেসরকারী উদ্যোগকেও এগিয়ে আসতে হবে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণকেও এতে অংশগ্রহন করতে হবে।
কক্সবাজারে পর্যটন বিকাশে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বা কক্সবাজারের সমস্যা সমাধান করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব না। এ জন্য সবাইকে সম্পৃক্ত হতে হবে। সদিচ্ছা থাকলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে না। সকল সমস্যা চিহিৃত করে জরুরী ভিত্তিতে এর সমাধান করে পর্যটন শিল্পকে বিকমিত করা প্রয়োজন। তবেই বাংলাদেশের অপরিসীম সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প দেমের অর্থনীতিতে আশানুরূপ ভূমিকা রাখতে পারবে।
তাই কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়নে আপনাদের সুনিষ্টি পরামর্শ, মতামত, পরিকল্পনা জানানোর জন্য আহবান জানাচ্ছি। আপনাদের মতামত, চিন্তা-ভাবনা আমাদের আওয়ামী পর্যটন লীগের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি পর্যটনবিদ প্রফেসর ড. এ আর খান ও সাধারণ সম্পাদক জুলফিকার আলী মাসুদ সাহেবদের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী, মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী, মাননীয় রেল মন্ত্রী, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, কক্সবাজার জেলার মাননীয় সংসদ সদস্যগণ, পর্যটন সচিব, জেলা প্রশাসকসহ সরকারের নীতি-নির্ধারকদের কাছে স্মারকলিপি আকারে পেশ এবং কক্সবাজারে সাংবাদিক সম্মেলন ও সেমিনার করে এই সব মতামত তুলে ধরা হবে। যেখানে আপনাদের নাম ও মতামত সম্মানের সাথে উল্লেখ করা হবে।

আসুন আমরা সবাই মিলে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র, সাদা-কালো, ধনী-গরীব, রাজনৈতিক পরিচয়, সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একটা পরিচয়ে সামনে এগিয়ে যাই; আমরা বাংলাদেশী। বাংলাদেশ আমাদের অহংকার এবং ”পর্যটনের মাধ্যমে সাবলম্বী বাংলাদেশ” গড়ে তুলি।

ধন্যবাদান্তে,

মোঃ রাশেদুর রহমান রাসেল
যুগ্ম আহবায়ক,
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী পর্যটন লীগ


আরোও সংবাদ