এমডির স্বেচ্ছাচারিতা: কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানিতে গণপদত্যাগ

প্রকাশ:| শনিবার, ৪ মার্চ , ২০১৭ সময় ১১:২৬ অপরাহ্ণ

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমেটড’র মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) মো.আবু জাফর এবং উপ-মহাব্যবস্থাপক আবদুল হক মজুমদার স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ ও পিআরএল মঞ্জুরের আবেদন করেছেন গত বুধবার। এছাড়া আরও আটজন সংশ্লিষ্ট বিভাগে তাদের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশ পদত্যাগের জন্য মানসিনভাবে প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানা গেছে।এছাড়া আরও আটজন সংশ্লিষ্ট বিভাগে তাদের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আইয়ুব খানের অনিয়ম-দুর্নীতি, যখন তখন চাকরি থেকে ছাটাই, কারণ দর্শানো নোটিশে অতিষ্ঠ এবং অফিসে কর্মপরিবেশ না থাকায় বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পদত্যাগ করছেন। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলছেন পেনশন জটিলতা এবং শারীকিভাবে সুস্থ না থাকায় দুইজন কর্মকর্তা চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অর্থ ও হিসাব বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ও উপ-মহাব্যবস্থাপক গত বুধবার (১ মার্চ) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে অব্যাহতিপত্র জমা দেন। এ ঘটনা জানাজানি হলে একই বিভাগের আটজন কর্মকর্তা-কর্মচারী পদত্যাগপত্র দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগে। আরও অনেকেই পদত্যাগপত্র প্রস্তুত করে রেখেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-মহাব্যবস্থাপক আবদুল হক মজুমদার বাংলানিউজকে বলেন, অফিসে কর্মপরিবেশ না থাকার কারণে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার আবেদন করেছি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে যোগদানের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও সংস্থার ক্ষতি হয় এমন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের ছাঁটাই করে নতুনভাবে নিয়োগ দিতে শুরু করেন। সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও হস্তক্ষেপ করেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে বিনা কারণে ওএসডি বা চাকরিচ্যুত করেন। দিনদিন স্বেচ্ছাচারি মনোভাব বাড়তে থাকলে এমডির রোষানোল থেকে বাঁচার জন্যই মূলত গণপদত্যাগের হিড়িক পড়েছে কেজিডিসিএলে।

সিবিএ নেতা ও ভুক্তভোগি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে নিয়োগ বাণিজ্য ও বদলি বাণিজ্য, ছাঁটাই, শিল্প ও ক্যাপটিভখাতে সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ  বাণিজ্য চলছে। আর এসবই এমডি তার দুই চেলে ও দুইজন কর্মকর্তার মাধ্যমে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। মূলত এসব অন্যায়-অনিয়মের কারণেই সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। উর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা অব্যাহতি চাওয়ার কারণে ক্ষোভ ও অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে।

তারা বলছেন, বিগত সময়ে কেজিডিসিএলে এ ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি কখনো হয়নি। এমডির এমন অনিয়ম-দুর্নীতি এবং বিশৃঙ্খল পরিবেশ কখনো কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। সৎ কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিত এখন এমন যে সারা জীবনের আদর্শ বিসর্জন দেওয়ার চেয়ে পদত্যাগ করাই ভাল।

অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম বহিভর্’তভাবে ৫০ লাখ টাকা খরচ করে একক সিদ্ধান্তে বার্ষিক সাধারণ সভা করেছেন এমডি। নিজের অনিয়ম-দুর্নীতি ঢাকতে বোর্ড সদস্যদের খুশি রাখার জন্য অতিরিক্ত টাকা দিয়েছেন। বার্ষিক সাধারণ সভার জন্য সংস্থা থেকে ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা বৈধভাবে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণে ব্যায়ের কথা বলে বেনিফিশিয়ারি ফান্ড থেকে ২৮ লাখ টাকা সমন্বয়ের কথা বলে কেজিডিসিএল থেকে উত্তোলন করে বার্ষিক সাধারণ সভায় খরচ করেন। এদিকে বেনিফিশিয়ারি ফান্ডের সদস্যদের মতামত ছাড়া ২৮ লাখ টাকা দেওয়া সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কমিটির আহ্বায়ককে না জানিয়ে এমডি নিজেই আরেকজন কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। জমা দেওয়ার শেষ দিন বিকেল ৫টায় সেই প্রতিবেদন না পড়েই স্বাক্ষর করতে বলেন  কমিটির আহ্বায়ককে। কমিটির আহ্বায়ক এ ধরনের প্রস্তাবে রাজি হননি। ফলে এমডির রোষানলে পড়েন।

সূত্র জানায়, এমডির কথা মতো কাজ না করলে নানাভাবে হেনস্থা করে। কারণ দর্শানো থেকে শুরু করে ওএসডি এমনকি চাকরিচ্যুত করার নজিরও রয়েছে। এমডির কথামতো কাজ না করায় এ পর্যন্ত অন্তত ১০জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। নিয়োগ বাণিজ্য করতে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৪৬ জন কর্মচারীকে ছাটাই করা হয়েছে। এরমধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন।

সংস্থার টাকা অপচয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আইয়ুব খান মূলত গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড থেকে কেজিডিসিএলে এসেছেন। ফলে এই সংস্থার প্রতি তার কোন দরদ নেই। একারণেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবসরোত্তর সুযোগ সুবিধা না পেলেও কোম্পানির আড়াইশ কোটি টাকা অন্য দুটি সংস্থাকে মাত্র ২ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়েছেন।

দুইজন কর্মকর্তার স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আইয়ুব খান বলেন, পেনশন নিয়ে সমস্যা এবং শারীরিকভাবে সুস্থ না থাকায় অবসরে যাওয়ার আবেদন করেছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি রোববার (৫ মার্চ) অফিসে যাওয়ার অনুরোধ জানানা।