এভাবে আর কত দিন…

mirza imtiaz প্রকাশ:| রবিবার, ১৪ অক্টোবর , ২০১৮ সময় ০১:০৬ অপরাহ্ণ

মির্জা ইমতিয়াজ শাওন,
প্রধান প্রতিবেদক ও নির্বাহি সম্পাদক:
প্রতিবছর বর্ষায় ঘটে এই একই দুর্ঘটনা। যখন আমরা সবাই জানি কেন কিভাবে কি ঘটছে এই প্রাণহানি আর আমাদেরই অবহেলায় ঝরে যাচ্ছে অগনিত প্রাণ, এরপরও কি আমরা নির্বিকার বসে পরবর্তী কোন মর্মান্তিক সংবাদের জন্য অপেক্ষা করবো? পাহাড় ধসে  মৃত্যু বরণ করে চট্টগ্রাম বিভাগে নানা জেলায় পাহাড়ে বসবাসতে দরিদ্র জনগণ। প্রায় ক্ষেত্রেই দরিদ্ররা এই দুর্ঘটনার শিকার হয় বলে তাদের মৃত্যু শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় কয়েকটি সংখ্যামাত্র। মানুষের মৃত্যুর যে কোন ক্ষতিপূরণ হয় না সেটি যে বিপুল মানবিক বিপর্যয় সে কথা কে মনে রাখে। পাহাড় ধসে মৃত্যু প্রতিরোধের জন্য দরকার আগেই ব্যবস্থা গ্রহণ।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড় ধসে মানুষের করুণ মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে আসে। তারপর যা হয় তা সকলেরই জানা। সংবাদ মাধ্যমে একটু লেখালেখি, শোক প্রকাশ আর টিভি টকশোতে কিছু কথাবার্তা। ব্যস। আর কোন প্রতিক্রিয়া নেই। নেই কোন প্রতিবাদ। কার্যকর ব্যবস্থা তো গ্রহণ করাই হয় না। সাধারণত পাহাড় ধসে দরিদ্র মানুষরাই মারা যান। আর দরিদ্র মানুষের মৃত্যু কি বড় কোন ব্যাপার নাকি? আমাদের দেশে তো আর গরীব মানুষের অভাব নেই। তাই তাদের জীবন বড়ই সস্তা।
অপরিকল্পিত ভাবে পাহাড় কাটা, গাছ কাটা প্রতিরোধের উপায় খুঁজে যেন পাহাড়ি ভূমি ধ্বসের স্থায়ী কোন সমাধান নির্নয়ে একসাথে কাজ করতে পারি আমরা। গাছ তার শেকড়ের সাহায্যে মাটি ধরে রাখে। মাটিকে জমাটবদ্ধ থাকতে সাহায্য করে। আসবাবের কাঠ, জ্বালানি কাঠ , খুটি তৈরির কাঠ -এ সবের জন্য উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে পাহাড়ের বৃক্ষসম্পদ। দুর্বল হয়ে যাচ্ছে পাহাড়। যে ঠিকাদাররা দুর্দমনীয় লোভে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে এই অপকর্মগুলো করে তাদের কিন্তু পাহাড় ধসে মৃত্যু হয় না। মৃত্যু হয় গরীব মানুষের। যারা বাস করে ওই পাহাড়ে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে একই ঘটনা ঘটে বার বার।

প্রথমত তো অতি আবশ্যিকভাবে পাহাড় কাটা আর বৃক্ষ নিধন বন্ধ করতে হবে। এটা শুধু পাহাড় ধস ঠেকানোর জন্য নয়, সেইসঙ্গে পরিবেশ রক্ষার জন্যও অতি জরুরি। কিন্তু এই জরুরি কাজটা করতে হলে লোভী, দুর্বৃত্ত ঠিকাদারদের লাভের ব্যবসায় ভাটা পড়বে। আর ঘুষখোর কর্মকর্তাদের পকেটে ঘুষের টাকার আমদানি কমে যাবে। তাই ধ্বংস হোক পরিবেশ, ধসে পড়ুক পাহাড়, মরুক মানুষ। কুছ পরোয়া নেই। পাহাড় তারা কাটবেই, গাছ তারা কাটবেই। এই অপরাধের যেন কোন শাস্তি নেই, প্রতিকার নেই। আর এই ঘুষখোর কর্মকর্তা আর দুর্বৃত্ত ঠিকাদারদের লোভের বলি হচ্ছে সাধারণ দরিদ্র মানুষ। ঘটছে পরিবেশ বিপর্যয়। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্য ধ্বংস হচ্ছে শুধু কিছু সংখ্যক দুনীর্তিবাজ কর্মকর্তা আর দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীদের অতি লোভের কারণে।

পাহাড় ধসে মৃত্যু প্রতিরোধে আরও ব্যবস্থা নেওয়ার আছে। যেহেতু প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাহাড় ধসের আশংকা থাকে তাই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় বসবাসকারী মানুষজনকে আগেই সরিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার সরকারি উদ্যোগে। সরকারি বিশেষজ্ঞদের পক্ষে তো আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা সম্ভব। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে অধিবাসীদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেলে তো আর এই প্রাণহানি ঘটে না। এবং সেটি করতে হবে শুকনো মৌসুমেই। কিন্তু কার গোয়ালে কে বা দেয় ধুঁয়ো। দরিদ্র পাহাড়ি-বাঙালিকে নিয়ে ভাবে কে, আর সেই কাজে উদ্যোগই বা নিবে কে?

পাহাড় ধস একটি সাংবার্ষিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে এবং এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রতিকার, প্রতিরোধ সবই গ্রহণ করতে হবে। পাহাড় ধস বন্ধে অবিলম্বে কর্তৃপক্ষের টনক নড়া দরকার। বন্ধ করতে হবে পাহাড় কাটা আর বৃক্ষ নিধন। আর যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের পরিবারের সদস্যদের দিতে হবে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ। যদিও মানুষের জীবনের কোন ক্ষতিপূরণ হয় না। তবু দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া দরিদ্র মানুষদের যদি অর্থ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তাদের দুর্বিষহ শোক কিছুটা হলেও তো লাঘব হয়।

এতগুলো প্রাণের অস্বাভাবিক মৃত্যু যেন কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। এমন দৃশ্য খুবই বেদনাদায়ক। আমরা এমন করুণ মৃত্যু আর দেখতে চাই না।


আরোও সংবাদ