এখন আর দেখা মিলে না ‘মহাশোল’

প্রকাশ:| শনিবার, ১৩ আগস্ট , ২০১৬ সময় ১১:৪৬ অপরাহ্ণ

আবাস হিসেবে পছন্দ পাহাড়ি খরস্রোতা স্বচ্ছ পানির নদী। পছন্দ নয় অন্য সব মাছদের মতো যেনতেন খাবার। নদীর পানিতে পাথর-নুড়ির ফাঁকে ফাঁকে ‘পেরিফাইটন’ নামের এক রকমের শ্যাওলা জন্মে। এগুলোই তাদের পছন্দের খাবার। এমন রুচি যে মাছের সে অবশ্যই সাধারণ মাছের তালিকায় পড়ে না। খাবার ও বসবাসের বিশেষ পছন্দ দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এরা মাছের মহারাজা। স্বাদে অতুলনীয় এই মহারাজাদের বাংলা নাম ‘মহাশোল’ আর ইংরেজি নাম Mahseer!

মহাশোল২

মহাশোল

মহাশোল দেখতে অনেকটা মৃগেল মাছের মতো। তবে এর আঁশগুলো আরও বড়। পরিণত মাছের আঁশ শক্ত, উজ্জ্বল সোনালি রঙের ও দীপ্তিমান। পাখনা ও লেজ রক্তিম। নাকের সামনে ছোট্ট দুটি গোঁফের মতো আছে। সব মিলিয়ে দেখতে খুব সুন্দর।

মহাশোল সর্বোচ্চ ১৫ মিটার গভীর পানিতে চলাচল করতে পারে। পানির উষ্ণতা ১৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাদের জীবনধারণের পক্ষে সহায়ক। মাছটি ওজনে ১৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।

আমাদের মিঠাপানির মাছের মধ্যে মহাশোল স্বাদেও সেরা। মহাশোলের দুটি প্রজাতির একটির বৈজ্ঞানিক নাম Tortor, অন্যটি Torputitora। বাংলাদেশে দুই প্রজাতির মহাশোলই পাওয়া যেতো। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে কংস নদ ও সোমেশ্বরী নদী মহাশোলের আবাস।

তবে দুঃখের বিষয় হলো- এই নদ-নদীর উৎসমুখ এখন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে নদী দুটি প্রায় শুকিয়ে যায়। বসবাস ও বংশবৃদ্ধির জায়গা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিলুপ্তির পথে এই মাছ। সোমেশ্বরী ও কংস ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে দু’একবার সাঙ্গু নদেও মহাশোল পাওয়া গেছে। তবে হাওর, বিল-ঝিল বা অন্য কোনো নদ-নদীতে মহাশোল পাওয়ার রেকর্ড নেই।

তবে পুকুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কোথাও কোথাও এই মাছের চাষ হচ্ছে বলে জানা গেছে। আজকাল বাজারে একধরনের চাষ করা ভারতীয় মহাশোল পাওয়া যায়। কিন্তু আসল মহাশোলের সাথে এর কোনো তুলনাই হয় না।

মহাশোলের জন্ম ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে নেত্রকোনা জেলার সীমান্তবর্তী সুসং দুর্গাপুর গারো পাহাড়ের খাদে। প্রাকৃতিক নিয়মেই পাহাড়ি খাদে জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা ওই মাছের বৈশিষ্ট্য হলেও সেখানে আহরণ সম্ভব নয়। ভরা বর্ষায় প্রবল বর্ষণ ও স্রোতের টানে ১০০-১৫০ ফুট পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে আছড়ে পড়ে মহাশোল। পাহাড়ের খাদ থেকে পড়ে মুক্ত জলরাশিতে মনের আনন্দে ছুটতে গিয়ে সোমেস্বরী নদীতে জেলেদের পেতে রাখা জালে ধরা পড়ে তারা।

পুরো বর্ষা মওসুমে জেলেদের জালে সাধারণত ১০-১৫টি মহাশোল ধরা পড়ার কথা জানা যায়। তবে এখন এই সংখ্যা একবারেই নগন্য।

মহাশোলের চাহিদা এতই বেশি যে, মাছটি পেতে জেলেদের অগ্রিম টাকা দিয়ে দিনের পর দিন অনেককে সোমেশ্বরী নদীর তীরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অত্যধিক চাহিদার কারণে এখন স্থানীয় বাজারে মহাশোলের দেখাই মেলে না। প্রতি কেজি মাছ বিক্রি হয় ৩ থেকে ৪হাজার টাকা দরে।

মহাশোল মাছ বাজারে ওঠার পর দাম শুনে অনেকের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও এক শ্রেণির ভোজনবিলাসী চড়ামূল্যে ঠিকই ক্রয় করেন। অত্যাধিক দামের কারণে কয়েকজন একত্রিত হয়ে কিনে ভাগাভাগিও করে নেন অনেকে।