একে খন্দকারকে ‘সংবিধান দ্রোহী’ মুনতাসীর মামুন

প্রকাশ:| শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর , ২০১৪ সময় ১১:৫৮ অপরাহ্ণ

মুনতাসীর মামুন মুক্তিযুদ্ধের উপ সেনা প্রধান ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের চেয়ার‌ম্যান একে খন্দকারকে ‘সংবিধান দ্রোহী’ বলে মন্তব্য করেছেন মুনতাসীর মামুন।

তিনি বলেন,‘শেষ জীবনে একে খন্দকার যুদ্ধাপরাধীদের হাতে একটা অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। এটা ‍খুবই দুর্ভাগ্যজনক আমাদের জন্য।’

শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম জেলা ইউনিট কমান্ড প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এ মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন,‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তিনি আমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু সে ব্যক্তি শেষ জীবনে এসে কি করলেন? যুদ্ধাপরাধী এবং যারা যুদ্ধাপরাধ সমর্থন করে তাদের হাতে একটা অস্ত্র তুলে দিয়েছেন।’

তিনি বলেন,‘এজন্য আমি বিশ বছর আগে একটা কথা বলেছিলাম। তখন অনেকে আমার সমালোচনা করেছে। কিন্ত এখন সত্যে পরিনত হচ্ছে। আমি বলেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়াটা যত আনন্দের যত সহজতর ছিল। আজীবন মুক্তিযোদ্ধা থাকাটা ততটা সহজ নয়। আমরা অধিকাংশই আজীবন মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারি না।’

তিনি বলেন,‘একে খন্দকার শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা থাকতে পারলেন না। যে সংবিধানে তিনি সই করেছেন সেখানে ৭ই মার্চের সংযুক্ত রয়েছে। যে সংবিধান রক্ষা করার জন্য শপথ নিয়ে তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। তিনি এখন সংবিধান বিরুদ্ধ কথা বলছেন। তিনি সংবিধান দ্রোহী। তিনি ইতিহাস দ্রোহী। শেষ বয়সে এসে তার পরিচয় হবে তিনি সংবিধান দ্রোহী। পৃথিবীর কোনো দেশে সংবিধান অমান্য করলে সবচেয়ে বড় শাস্তি পেতে হয়।’

সদ্য প্রকাশিত এ কে খন্দকারের ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন,‘বঙ্গবন্ধু নাকি ৭ই মার্চের ভাষনে জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান বলেছেন। ওনিতো সেখানে ছিলেন না। কিন্তু আমিতো ছিলাম। এখানে যারা আছেন আপনারা অনেকে সেখানে ছিলেন। আমরাতো শুনিনি। খালি শুনেছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, তারপর শুনলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান, তারপর শুনলেন আমাদের একে খন্দকার। এর আগে মেজর ডালিম এবং যারা ছিল তারাও শুনেছেন। আমরা কিন্তু শুনিনি।’

“আমরা এতগুলো মানুষ ছিলাম আমরা শুনলাম না। তারা শুনলেন। বলেছেন আপনারাতো দূরে ছিলেন, আমরাতো কাছে ছিলাম। যখন বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা বলছে তখন সবাই জয় বাংলা বলে হাত উচু করায় ওটা হারিয়ে গেছে। শোনা যায়নি।”

মুনতাসীর মামুন বলেন,‘পরে ওই দিনের বক্তব্যের রেকর্ড বেরিয়েছিল। সেখানে শোনা যায়নি। ৮ তারিখের কোন পত্রিকার রেকর্ডেও নেই। সাংবাদিকরা কি এতই বোকার হদ্দ? একজন সাংবাদিকও লিখলেন না। তখনও তো জামায়াতের মুখপত্র সংগ্রাম ছিল, সরকারি পত্রিকা পয়গাম ও দৈনিক পাকিস্তান বের হতো। কোথাওতো এ কথা নেই।’

“তিনি যদি জয় পাকিস্তান শুনে থাকেন। তাহলে তার অন্তরে পাকিস্তান পাকিস্তান কাজ করতো। তখন বাংলাদেশ বিরোধীদের কাছে একটা দুঃখ ছিল পাকিস্তানটা ভেঙ্গে যাচ্ছে। এ দুঃখ জামায়াতের ছিল । স্বাধীনতা বিরোধীদের ছিল। ওনার মনেও হয়তো ছিল।”

মুনতাসীর মামুন বলেন,‘যেটা আমরা সবাই জানি এবং যেটা প্রতিষ্ঠিত সত্য সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সমীচীন নয়।’

তিনি বলেন,‘একে খন্দকার লিখেছেন বঙ্গবন্ধু পঁচিশে মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণা দেননি। এটি নাকি সম্ভব ছিল না। তাহলে ২৬ ও ২৭ তারিখ চট্টগ্রামে যে লিফলেট বিতরণ করলো, সেটা কি হান্নান সাহেব আওয়ামী লীগের হয়ে নিজে ঘোষণা করেছেন? তাহলে আপনারা কিভাবে পেলেন ঘোষণা পত্র। ওনি বলছেন ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সম্ভব না।’

মুক্তিযুদ্ধের এ গবেষক প্রশ্ন তুলে বলেন,‘দুদিন পর তাহলে কেন আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের পত্রিকা বললো বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। তারা শুনলো কোথা থেকে। নাকি নিজেদের গরজ থেকে করে দিয়েছে। সিআইয়ের প্রতিবেদনেও লেখা আছে। তারা বলেছে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। তারাতো স্বাধীনতা চায়নি। অথচ একে খন্দকার বলছেন এটা সম্ভব না। সারা দেশ জানলো। তিনি একা জানলেন না।’

মুনতাসীর মামুন বলেন,‘তিনি লিখেছেন অসহযোগ আন্দোলনে নাকি খুব বিশৃঙ্খলা হয়েছিল। লুটতরাজ হয়েছে। বাঙালীরা লুটতরাজ করেছে। আপনারা অসহযোগ আন্দোলন করেছেন। আপনারাই বলেন একটা প্রাণহানি হয়েছে? বরং ১তারিখ থেকে ২৫তারিখ পর্যন্ত পাকিস্তানিরা পাঁচশ মানুষকে হত্যা করেছে।’

তিনি বলেন,‘উনসত্তর সালে কি হয়েছে তিনি জানেন না। এটা বিশ্বাসযোগ্য? আগরতলা মামলা ও ৬ দফার কোন উল্লেখই নেই। তিনি এসবের নাকি কিচ্ছু জানেন না। এরকম একটি লোক স্বাধীনতা পদক থেকে মন্ত্রীত্ব সবকিছু পান তাহলে এটাতো আমাদেরই দুর্ভাগ্য।’

মুনতাসীর মামুন বলেন,‘সেনা শাসন কেন দেশের জন্য ভালো নয়। সেটা একে খন্দকারের বই পড়লে বুঝবেন। যাকে আমরা আদর্শ হিসেবে জানি। যাকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা পদক দিয়ে সম্মানিত করেছেন।’

এসময় তিনি একে খন্দকারের বইয়ের বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে সমালোচনা করেন।

‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ বইটির প্রশংসা করে মুনতাসীর মামুন বলেন,‘চট্টগ্রাম জেলা ইউনিট আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ সম্পন্ন করেছে। এটি চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের একটি কোষ বলা যায়।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন,‘একে খন্দকার যে উক্তি করেছেন তা ঠিক নয়। তিনি কেন এসব লিখেছেন আমি জানি না। তিনি যদি এ লেখা প্রত্যাহার না করেন তাহলে আগামী প্রজন্ম তাকে ধিক্কার জানাবে।’

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম জেলা কমান্ডার মো. সাহাব উদ্দিন বইটি সম্পাদনার জন্য সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

তিনি বলেন,‘এই বইয়ে চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।’

এসময় তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এলাকা যেখান থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সেটি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে সেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরে জাদুঘর নির্মাণের আহবান জানান।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ফেনী জেলা কমান্ডার আবদুল হান্নান ও সহকারি কমান্ডার(প্রকল্প) জামালুল্লাহ।

অনুষ্ঠান শেষে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রের শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন।