একাত্তরের লন্ডন এখন রশীদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারিতে

প্রকাশ:| শুক্রবার, ৭ এপ্রিল , ২০১৭ সময় ০৬:৩৬ অপরাহ্ণ

মুক্তিযুদ্ধের বহু অজানা ইতিহাসের সরব সাক্ষী লন্ডন। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতিপর্ব থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন দীর্ঘ নয় মাস বিলেতের প্রতিটি শহরে মুক্তিকামী বাঙালিরা জোরালো দাবি তুলেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের সমর্থনে। দূর পরবাসে থেকেও বহু মুক্তিকামী বাঙালি ও অবাঙালি নাগরিক বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাঁপিয়েছেন বিলেতের রাজপথ।

প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির্পবের বিক্ষুব্ধ, প্রতিবাদী দিনলিপি থেকে লন্ডন হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পুরো সময়কাল নিয়ে আলোকচিত্র ও ঐতিহাসিক স্মারক প্রদর্শনী ‘লন্ডন ১৯৭১’।

তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী শুক্রবার (০৭ এপ্রিল) সকালে চট্টগ্রাম নগরের বাদশা মিঞা সড়কের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিল্পী রশীদ চৌধুরী আর্ট গ্যালরিতে শুরু হয়েছে। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক আবাসিক প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ স্টাডি ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. একে আব্দুল মোমেন।

বাংলাদেশ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ব্রিটিশ কাউন্সিল, পিএইচপি ফ্যামিলি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, আমরা করব জয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে প্রজেক্ট লন্ডন ১৯৭১। রোববার (০৯ এপ্রিল) পর্যন্ত এই প্রদর্শনী প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এর আগে ঢাকায় জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি ও ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং সিলেটে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

প্রদর্শনীর উদ্বোধন উপলক্ষে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন।বক্তব্য দেন পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান

তিনি বলেন, মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশ একদিনে বিজয় লাভ করেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দেশের জনগণ মুক্তির সংগ্রামে একাÍতা প্রকাশ করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন লন্ডন প্রবাসী বাঙালিরা। আজকের প্রদর্শনীতে সে চিত্র উঠে এসেছে।

মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতে ইসলামী ও তাদের আশ্রয় দেওয়া একটি দল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করেছে। তারা একটি প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত করেছে। এই গোষ্ঠীর কারণে দেশে জঙ্গি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জঙ্গিরা ধর্মের নামে সাধারণ ও নিরীহ মানুষ খুন করছে। তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ধর্মের নামে মানুষ খুন ইসলাম সমর্থন করে না।

বাংলাদেশ স্টাডি ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইমেরিটাস ড. একে আব্দুল মোমেন বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু সর্বস্তরের জনতা। শুধু দেশে নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থনে লন্ডন প্রবাসীরাও অত্যন্ত জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁরা বিদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের ওপর হানাদার বাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, লন্ডন ১৯৭১ প্রদর্শনীর কারণে দেশের তরুণ সমাজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত হবে। বতর্মান প্রজন্ম যাতে ভুল পথে পরিচালিত না হয়, এ জন্য এই ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ইতিহাসকে সাময়িকভাবে বিকৃত করা যায়, কিন্তু চিরদিনের জন্য নয়। মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের যে অবদান ছিল তা আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে ফুটে উঠেছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক শওকত বাঙালির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পিএইচপি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম সাইফুর রহমান মজুমদার, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া, বাংলাদেশ স্টাডি ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অর্থ সম্পাদক মামুন আল মাহতাব, ব্রিটিশ কাউন্সিল, চট্টগ্রাম গ্রন্থাগার সমন্বয়ক মাসুদুল আলম। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রজেক্ট লন্ডন ১৯৭১ এর উদ্যোক্তা ও সমন্বয়কারী উজ্জ্বল দাশ।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া বেশির ভাগ ছবি ব্রিটিশ আলোকচিত্রী রজার গোয়েন ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইউসুফ চৌধুরীর তোলা। এ ছাড়া রয়েছে বেশ কিছু সংগৃহীত ছবি। আট বছর ধরে লন্ডনে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুরে ঘুরে এসব ছবি সংগ্রহ করেছেন এ প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা ও সমন্বয়কারী উজ্জ্বল দাশ।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্রের মূল কপি, পোস্টার, ডাকটিকেট ও প্রচারপত্র স্থান পেয়েছে এ প্রদর্শনীতে। বাঙালিদের পাশাপাশি একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের সমর্থনে বিশ্ব জনমত গঠনে ব্রিটিশ এমপি, রাজনীতিক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, প্রগতিশীল শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণির মানুষ রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে সেসব ভিনদেশি বন্ধুর ছবিও।

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ভিনদেশে বাংলার মুক্তিসংগ্রামের সমর্থনে প্রবাসী ও লন্ডনবাসীর সভা-সমাবেশ, মিছিল এবং বিক্ষোভের ছবি। ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম লিপিকার এ কেএম আবদুর রউফের হাতে আঁকা ঐতিহাসিক পোস্টারটি স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।

প্রদর্শনী প্রসঙ্গে উজ্জ্বল দাশ বলেন, ‘এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দেশ-বিদেশের তরুণ বাঙালি প্রজন্মকে একাত্তরে ভিন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ভূমিকাটি উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। অদূর ভবিষ্যতে লন্ডনেও এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।’


আরোও সংবাদ