ঈদের দিনের আনন্দ

প্রকাশ:| শুক্রবার, ১ সেপ্টেম্বর , ২০১৭ সময় ১১:৪৩ অপরাহ্ণ

মাহফুয আহমদ>>
ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশ করা ইসলামের নিদর্শনাদির অন্যতম। খুশির ঈদ আমরা কীভাবে উদযাপন করব, সে বিষয়ে রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা। এখানে আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমি বরং ঈদ পালনে পূর্বসূরিদের কিছুঅভিব্যক্তি, ঘটনা এবং শিক্ষার প্রতি বিজ্ঞ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। কোনোরকম সংযোজন ছাড়াই আমি হুবহু কিছু বিষয় উদ্ধৃত করে দিচ্ছি।

প্রকৃত ঈদ
হাসান বসরি (রহ.) বলেন, যেদিন নিজেকে আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি থেকে নিবৃত্ত রাখতে পারবে, তোমার জন্য সেদিনই ঈদের দিন। বস্তুত মোমিন বান্দা যেই দিনটি আপন মাওলার স্মরণ, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যে অতিবাহিত করল,সেই দিনটি তার জন্য মহা আনন্দের দিন। (লাতায়িফুল মাআরিফ; ইবনে রজব হাম্বলি, ১/২৭৮, দারু ইবনে হাজম,১ম সংস্করণ ১৪২৪ হি.)

দৃষ্টি সংযত রাখা
ওয়াকি (রহ.) বলেন, ঈদের দিন আমরা মুহাদ্দিস সুফিয়ান সাওরি (রহ.) এর সঙ্গে বের হলাম। তিনি আমাদের সম্বোধন করে বললেন, যে বিষয় দিয়ে আমরা ঈদের দিনটি শুরু করি তা হলো, নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখা। (আল ওয়ারা’; ইবনে আবিদ দুনিয়া, পৃ. ৬৩, কুয়েত, ১ম সংস্করণ ১৪০৮ হি.)

আবু হাকিম বলেন, হাসসান ইবনে আবি সিনান ঈদের নামাজ শেষে যখন ঘরে ফিরলেন, তখন তার স্ত্রী অগত্যা বলে উঠলেন, আজ কজন সুন্দরীর দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছ? প্রত্যুত্তরে হাসসান বললেন, দূর যা! ঘর থেকে বের হওয়া থেকে নিয়ে তোমার নিকট ফিরে আসা পর্যন্ত আমার দৃষ্টি পায়ের বৃদ্ধাঙুলির দিকেই ছিল, চোখ তুলে কোনোদিকে তাকাই নি। (প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৪)

পরদেশে ঈদ
হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রের পণ্ডিত আবুল মুতাররিফ আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান আল কানাজিয়ি আল কুরতুবি (রহ.) বলেন, একবার ঈদের সময় আমি মিসরে ছিলাম।

নামাজ শেষে সবাই যার যার নীড়ে চলে গেল আর আমি নীলনদ অভিমুখে রওয়ানা হলাম। খাওয়ার মতো আমার নিকট কিছু ছিল না, শুধুমাত্র একটি থলেতে কিছু তুরমুস (গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত গুল্মবিশেষ) অবশিষ্ট ছিল। তো নদীর পাড়ে বসে আমি এগুলো খেতে লাগলাম। খাচ্ছি, ছোলাগুলো নিচের দিকে নিক্ষেপ করছি আর মনে মনে ভাবছি, দেখো তো! আজ ঈদের এই দিনে পুরো মিসরে আমার থেকে দুরবস্থায় আর কি কেউ আছে? এসব ভাবতে ভাবতে যখন মাথা তুলে নিচের দিকে তাকালাম, দেখতে পেলাম একজন আমার নিক্ষেপ করা ছোলাগুলো উঠিয়ে মুখে দিচ্ছে! আমার বোঝতে আর বাকি রইলো না যে, এটি মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা। আমি হৃদয় থেকে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম। (আল মুগরিব;ইবনে সাঈদ আল মাগরিবি, ১/১৭১, দারুল মাআরিফ,কায়রো, ৩য় সংস্করণ ১৯৫৫ ঈ.)

নামের সঙ্গে ঈদ
মুসলিম উম্মাহর স্বীকৃত মহান একজন ফকিহের নামের সঙ্গে ঈদ শব্দটি যুক্ত আছে। তিনি হলেন ইমাম ইবনু দাকিকিল ঈদ (রহ.)। এটি মূলত বড় বড় কয়েকজন জ্ঞান তাপসের পারিবারিক নাম। সর্বপ্রথম যিনি এই উপনামে পরিচিত হয়েছিলেন, তিনি হলেন ইমাম ওয়াহব ইবনে মুতি’ আল কোশাইরি আল মানফালুতি (রহ.)। তিনি ছিলেন খুব সুন্দর এবং শুভ্র দাড়ির অধিকারী। একবার তিনি সাদা একটি রুমাল পরে যখন ঈদগাহে গেলেন, তাঁকে দেখে লোকেরা বলতে লাগল, আপনি তো ঈদের (মিষ্টান্ন তৈরির) ‘দাকিক’ বা আটার মতো (শুভ্র ও সুন্দর) হয়ে গেলেন! পরে এই দাকিকুল ঈদ উপনামটি তাঁর এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ হয়ে গেল। তবে এই নামে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেছেন তাঁর নাতি প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে ওয়াহব আল কোশাইরি (রহ.)। বস্তুত হাদিস,ফিকহ ও ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থাদিতে সাধারাণভাবে ‘ইবনে দাকিকিল ঈদ’ বলে তাঁকেই বোঝানো হয়। (জায়লুত তাকয়িদ; মুহাম্মাদ আল ফাসি, ১/৩৫৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১ম সংস্করণ ১৪১০ হি.)

ঈদ ও কিয়ামত
আল্লামা ইবনুল জাওযি (রহ.) কতইনা সুন্দর লিখেছেন,ঈদের দিনে লোকদের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এটাকে কিয়ামতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়েছে। কেননা লোকেরা ঈদের দিন ভোর সকালে ঘুম থেকে জেগে ঈদগাহের দিকে ছুটতে থাকে; তেমনিভাবে কিয়ামতের দিন কবর থেকে উঠে সবাই হাশরের ময়দানের দিকে ছুটতে থাকবে। ঈদের দিন কারো পোশাক ও গাড়ি থাকে খুব উন্নতমানের, কারো থাকে মাঝারি মানের আবার কারো থাকে একেবারে নিম্নমানের;তেমনিভাবে কিয়ামতের দিন মানুষের স্তর হবে ভিন্ন ভিন্ন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সেদিন দয়াময়ের কাছেপরহেজগারদেরকে অতিথিরূপে সমবেত করব। ‘ (সূরা মারইয়াম: ৮৫) অর্থাৎ আরোহী অবস্থায়। তারপর আল্লাহ বলেন, ‘এবং অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব। ‘ (সূরা মারইয়াম: ৮৬) অর্থাৎ তৃষ্ণার্তঅবস্থায়। এক বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কিয়ামত দিবসে লোকদের সমবেত করা হবে, কেউ আরোহী অবস্থায়, কেউ পায়ে হেঁটে আবার কেউ উপুড় অবস্থায়। ‘ (সুনানে তিরমিজি: ২৪২৪) ঈদের দিন ভিড়ের কারণে কোনো মানুষ পৃষ্ঠ হয়ে প্রাণ হারায়;তেমনিভাবে কিয়ামতের দিনে জালিমদেরকে মানুষ পা দিয়ে পৃষ্ঠ করবে। ঈদের দিন কোনো মানুষ থাকে ধনী এবং দানকারী; তেমনিভাবে কিয়ামতের দিন দুনিয়ার দানশীলগণ ওখানেও দানশীল প্রমাণিত হবে, পক্ষান্তরে কিছু মানুষ থাকবে ভিক্ষুক ও (নেকির) মুখাপেক্ষী। ঈদের দিন লোকেরা নামাজ শেষে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ঘরে আসে, ফুর্তি করে,অন্যদের জানায় যে, এরা সব তার বন্ধু; তেমনিভাবে কিয়ামত দিবসে মানুষ নিজের আমলের পুরস্কার পেয়ে পুলকিত হয়ে নিজ জান্নাতে ফিরবে, পক্ষান্তরে কিছু মানুষ খালি হাতে শূন্য ঘরে ফিরবে। সুতরাং বুদ্ধিমানদের জন্য উচিত হলো এসব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। (সায়দুল খাতির;ইবনুল জাওযি, পৃ. ৪৮০-৪৮১, দারুল কলম, দামেস্ক, ১ম সংস্করণ ১৪২৫ হি.)
লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন