ইসলামদ্রোহী নাস্তিক্যবাদ উভয়ই ইসলাম ও মানবতার দুশমন

প্রকাশ:| শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি , ২০১৬ সময় ০৯:৪১ অপরাহ্ণ

মুঃবাবুল হোসেন বাবলা,
আনজুমানে খোদ্দামুল মুসলেমীনের আয়োজনে চট্টগ্রাম জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক তাফসীরুল কোরআন মাহফিলে মুফাসসিরে কোরআন ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ বলেছেন, মুসলমানরা ইসলামের শান্তির পথ থেকে পিছু হটে আন্তর্জাতিক অপশক্তিগুলোর তাঁবেদারিতে লিপ্ত হওয়ায় তাদের ওপর শতমুখী দুঃখ-দুর্দশা ও দুর্ভোগ নেমে এসেছে। সর্বস্তরের মানুষের মুক্তির গাইডলাইনই হচ্ছে কোরআন-সুন্নাহ। বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে কোরআন সুন্নাহর শাশ্বত দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে। দলিত, বঞ্চিত, অধিকারহারা, শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য কোরআন সুন্নাহর নির্দেশনা হুবহু মেনে চলতে হবে। বক্তারা বলেন, কোরআন সুন্নাহর শাশ্বত দর্শনেই রয়েছে সমৃদ্ধ জীবন, নিরাপদ পৃথিবী গড়া এবং মানবাধিকার সুরক্ষার নিশ্চিত গ্যারান্টি। বক্তারা নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় পর্দা ও শালীনতার মধ্যে জীবন যাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ইসলামই অধঃপতিত অবস্থা ও মৃত্যুকুন্ড থেকে নারী সমাজকে তুলে এনে নারীত্বের সম্মান ও মর্যাাদা দিয়েছে। অথচ আজ নারী স্বাধীনতার নামে না জেনে না বুঝে ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামের বিষোদগার করা হচ্ছে। এটি অতীব দুঃখজনক। অবুঝ শিশু সন্তান ও নিরপরাধ মানুষ হত্যা রোধ ও বিপন্ন সংখ্যালঘুদের জানমালের নিশ্চয়তা বিধানে ইসলামের শাশ্বত নির্দেশনার আলোকে ও প্রচলিত আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান বক্তারা।

ইসলামের ভুলব্যাখ্যা ও চিন্তাধারা থেকে দেশে দেশে গর্জে ওঠা জঙ্গিবাদ এবং ইসলামদ্রোহী নাস্তিক্যবাদ উভয়ই ইসলাম ও মানবতার দুশমন আখ্যায়িত করে মুফাস্সিরে কোরআনগণ বলেন, জিহাদ মানে সন্ত্রাসবাদিতা বা ধরে ধরে প্রতিপক্ষকে খুন করা নয়। ইসলাম কখনো নিরপরাধ মানুষকে আক্রান্ত করার কথা বলে না। আক্রমণ বা আঘাত এলে তা প্রতিরোধ করাই হলো জিহাদ। অথচ আজ জিহাদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। বক্তারা কথিত সুন্নি নামধারী আইএস এর সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, পৃথিবীর কোথাও সুন্নি মতাদর্শীরা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত নয়। বরং ইসলামের ওপর কলঙ্ক চাপাতে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে দেশে দেশে জঙ্গিদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বক্তারা বলেন, কোরআন সুন্নাহর প্রকৃত মর্মবাণী দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংগঠনিক উপায়ে তুলে করে জঙ্গিবাদ রুখতে হবে। দুনিয়াবাসীর প্রতি আল্লাহ পাকের বিশাল অনুগ্রহ ও করুণা সত্ত্বেও যারা আল্লাহর অস্তিত্ব অনুধাবন করেন না তাদেরকে আগে নিজেদের চেনার এবং মহান স্রষ্টার প্রতি সমর্পিত হয়ে জীবনকে সমৃদ্ধ, সফল ও আলোকিত করার আহবান জানান বক্তারা।

২৭ ফেব্র“য়ারি শনিবার বাদে জোহর থেকে কোরআন মজিদ থেকে তেলাওয়াত ও নাতে রাসূল (দ.) পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হওয়া তাফসীরুল কোরআন মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন মাহফিল প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক পীরে ত্বরিকত আল্লামা সৈয়দ মছিহুদ্দৌলা (মজিআ)। স্বাগত বক্তব্য দেন আনজুমানে খোদ্দামুল মুসলেমীন বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মুহাম্মদ শাহাবুদ্দিন চৌধুরী। মাহফিলে কোরআন মজিদের বিভিন্ন আয়াত উদ্ধৃত করে মুফাস্সিরে কোরআন ও হাদিস শাস্ত্রজ্ঞদের মধ্যে তাফসীর পেশ করেন শায়খুল হাদিস আল্লামা কাজী মুঈনউদ্দিন আশরাফী, পীরে ত্বরিকত আল্লামা আবুল কাশেম নূরী, আল্লামা হাফেজ আশরাফুজ্জামান আলকাদেরী, আল্লামা শফিউল আলম নেজামী, আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ বখতিয়ার উদ্দিন আলকাদেরী, আল্লামা আবুল হাসান মুহাম্মদ ওমাইর রজভি। অন্যান্য অতিথি ও আলোচকদের মধ্যে ছিলেন পীরে ত্বরিকত আল্লামা আবদুস শাকুর নকশবন্দি, গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা এম এ মান্নান, পীরে ত্বরিকত মাওলানা সৈয়দ বদরুদ্দোজা বারী, পীরে ত্বরিকত শাহসুফি মাওলানা সাইফুদ্দীন আহমদ আলহাসানী, আল্লামা মুফতি সৈয়দ অছিয়র রহমান, ড. আল্লামা এরশাদ বোখারী, শাইখুল হাদিস আল্লামা হাফেজ সোলাইমান আনসারী, অধ্যক্ষ আল্লামা হাফেজ কাজী আবদুল আলিম রিজভী, অধ্যক্ষ আল্লামা হারুনুর রশিদ, অধ্যক্ষ আল্লামা ক্বারী নুরুল আলম খান, অধ্যক্ষ আল্লামা তৈয়্যব আলী, পীরে ত্বরিকত আল্লামা হারুনুর রশিদ রেজভী, সাংবাদিক স ম ইব্রাহীম, উপাধ্যক্ষ আল্লামা আবুল কাশেম ফজলুল হক, রাজনীতিবিদ কাজী মাওলানা সোলাইমান চৌধুরী, অধ্যক্ষ আল্লামা আহমদ হোসাইন আলকাদেরী, সাংবাদিক আবু তালেব বেলাল, পীরজাদা মাওলানা শামুনুর রশিদ আমিরী, অধ্যক্ষ আল্লামা সৈয়দ খোরশিদ আলম, আল্লামা হাফেজ সৈয়দ রুহুল আমিন, পীরজাদা মাওলানা গোলামুর রহমান আশরফ শাহ্, মাওলানা নুরুল ইসলাম জেহাদী,

মাহফিল সঞ্চালনায় ছিলেন গবেষক-সংগঠক মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার। মাগরিবের নামাজের আগেই জমিয়তুল ফালাহ্র বিশাল মাঠ ছাপিয়ে আশপাশের পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। নারায়ে তাকরিব, রেসালাত ও গাউসিয়তের স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক তাফসিরুল কোরআন মাহফিল। কোরআন মজিদের সূরা আহযাবের ৩৩নং আয়াতের তাফসির পেশকালে আল্লামা কাজী মুঈনুদ্দিন আশরাফী বলেন, ইসলামই নারীর প্রকৃত মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করেছে। পর্দার বিধান মেনে নিয়ে নারী ও পুরুষ উভয়কে সংযমী হবার ও সম্ভ্রম রক্ষার নির্দেশনা রয়েছে কুরআন মজিদে। নারী সমাজকে স্বেচ্ছাচারী জীবনে গা ভাসিয়ে না দিয়ে শালীন পোশাক পরে সর্বপ্রকার দায়িত্ব পালন করার তাগিদ দেন তিনি। সূরা আনআমের ৭৫-৭৯নং আয়াতের তাফসিরকালে পীরে তরিকত আল্লামা আবুল কাশেম নূরী বলেন, সকল নবী রাসূলকে আল্লাহ পাক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে নবুয়তের জিম্মাদারি অর্পণ করেন। এমনকি হযরত ইব্রাহিম (আঃ)কে নমরুদের অগ্নিকুন্ড থেকে রক্ষা করে আল্লাহপাক তাঁর অসীম ক্ষমতা ও কুদরতের প্রমাণ করেছেন। সকল নবী-রাসূলগণ নিষ্পাপ এবং প্রিয় নবী (দ.) এর মাতা পিতা ও পূর্বপুরুষগণ মুমিন ছিলেন বলেন তিনি কোরআন হাদিসের আলোকে উল্লেখ করেন। সূরা মায়িদার ৩২নং আয়াতের তাফসির পেশকালে আল্লামা হাফেজ আশরাফুজ্জামান আলকাদেরী বলেন, সর্বাবস্থায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখাই ইসলামের নির্দেশনা। জঙ্গিবাদসহ সকল ধরনের উগ্রতা-বর্বরতার বিরুদ্ধে ইসলামের নির্দেশনা অত্যন্ত কঠোর। ইসলামের বিধান মেনে চলে এবং আল্লাহ রাসূলের (দ.) প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের মাধ্যমে শান্তিময় জীবন গড়ার আহ্বান জানান তিনি। মাহফিলে পর্দা সহকারে তাফসীর শুনতে মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়। বাদে জোহর থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত পরিবহন যোগে জমিয়তুল ফালাহ্মুখী জনতার ঢল নামে।

সালাত সালাম শেষে দেশ ও জাতির শান্তি-কল্যাণ এবং বিশ্বের নির্যাতিত মানবতার মুক্তি কামনায় বিশেষ মুনাজাত করা হয়।