ইনাম আল হক বাংলাদেশের সালিম আলী

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| শনিবার, ২৮ জুলাই , ২০১৮ সময় ১১:২৬ অপরাহ্ণ

পাখি নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাখিবিদ ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক এ বছর পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন

ইনাম আল হক আমার শ্রেণিকক্ষের বাইরের শিক্ষক। জানতে-বুঝতে অসুবিধা হলে পরামর্শ করার একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ তিনি। অতিথিসেবা বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত হতে হলে তার বাসায় ঘুরে আসি
আমার দেখা যে ক’জন মানুষ অবসরে যাননি তার মধ্যে আমার শিক্ষক, ভারতের জাতীয় অধ্যাপক ও পাখি বিজ্ঞানী প্রয়াত ড. সালিম আলী ও বাংলাদেশের পাখিপ্রেমী ইনাম আল হক অন্যতম। দুজনেরই অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি করার সুযোগ হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে পাখির ওপর গবেষণা ও পড়াশোনা করতে যাওয়া ড. আলী দেশে ফিরে রেখে যাওয়া চাকরি আর ফিরে না পেয়ে নিজেকে জীবনের শেষ দিন অব্দি ভারতবর্ষের পাখিদের সঙ্গে কাটিয়েছেন। ইনাম আল হকও বিমান বাহিনীর বিমান রেখে বন্ধু চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেনের উৎসাহে পাখিদের ছবি তুলতে তুলতে আজ তিনি বাংলাদেশের পাখি সংরক্ষণ কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাখির খোঁজে দুজনই মহাত্মা গান্ধীর মতো নিজ নিজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরেছেন।


দুজনই দুটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের উৎসাহিত করেছেন। দল গঠন করেছেন, সংগঠনের মাধ্যমে সংরক্ষণ কাজকে স্থায়িত্ব দিতে চেয়েছেন। যেটুকু স্বীকৃতি পেয়েছেন তা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। দুজনই বৈষয়িক অর্জনের পুরোটাই পাখি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ব্যয় করেছেন। জগতে যারাই পাখি নিয়ে ভেবেছেন, সবাইকে ভালোবেসেছেন, তাদের যোগ্যতর হতে সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন। শিশুরা দুজনের কাছেই ভীষণ প্রিয়, ওদের স্বপ্ন দেখাতে চান। ড. আলী ভারতের মুম্বাই ন্যাচারাল হিস্ট্রি নির্মাণে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছেন আর বাংলাদেশে জনাব হক বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব বিনির্মাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। এখান থেকে সময় বের করে তিনি ‘ওয়াইল্ড টিম’ (সাবেক ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ) প্রতিষ্ঠায় সবই করেছেন। এখনও তিনি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন।
অ্যান্টার্কটিকা ও আর্কটিকে পদচিহ্ন রাখা আত্মপ্রত্যয়ী ইনাম আল হক বাংলাদেশের তরুণদের এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সৃষ্টি করেছেন মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাব। তরুণদের সঙ্গে নিয়ে গেছেন এভারেস্টের বেইজ ক্যাম্পে, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন নিজেও, দিয়েছেনও, করেছেন পর্বত অভিযানও। এরই ধারাবাহিকতায় এমএ মুহিত দু-বার ও প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে নিশাত মজুমদার একবার এভারেস্ট জয় করেছেন।
তার এসব কর্মকা- দেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় খুবই সহায়ক। তাছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ যুব সমাজকে বর্তমান অস্থির অবস্থা থেকে ভালো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। দেশে পৌষ মেলা, বৈশাখী মেলা, কারু মেলা ইত্যাদি হতে শুনেছি, দেখেছি। আর পাখিদের প্রতি ভালোবাসা জাগাতে, পাখি সম্পর্কে জ্ঞান দিতে ইনাম আল হক শুরু করেন পাখি মেলা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে মেলার যাত্রা শুরু আজ তা দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ মেলার রূপকারের নাম আজ কেউ জানে না, জানবেও না; কিন্তু এ মেলা নদীর স্রোতের মতো বহমান থাকবে। বড় মাপের মানুষেরা বোধহয় এভাবেই নিজের কর্মের মাঝে বাঁচতে পছন্দ করেন।
দেশের পাখিশুমারি নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও এভিয়ান-ফ্ল্যু, শকুন-মৃত্যুর জন্য দায়ী ‘ডাইক্লোফেনাক’ ব্যবহার বন্ধ করা থেকে শুরু করে সব কর্মকা-েই ইনাম আল হক নিজেকে জড়িয়ে রাখেন। ড. সালিম আলীর সঙ্গে জনাব হকের আরেকটি জায়গায় মিল রয়েছে। দুজনেরই রয়েছে ইংরেজি ভাষার ওপর ভালো দখল। ইনাম আল হকের সঙ্গে আমার এশিয়াটিক সোসাইটির এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফ্লোরা অ্যান্ড ফনা এবং ঢাকার ৪০০ বছরের ইতিহাসের ঢাকা ভল্যুম তৈরির সময় কাজ করার সুযোগ হয়েছে। অসাধারণ লেখেন তিনি।
সবসময় ভালো কথা বলতে শুনি ইনাম আল হককে। অবশ্য বলার চেয়ে শুনতেই বেশি পছন্দ করেন তিনি। দিতেই পছন্দ করেন, নিতে নয়। মনের গভীরে একটি সুপ্ত বাসনা রয়েছে তার। সরকার যদি তাকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান রক্ষার জন্য অনারারি ওয়াইল্ডলাইফ ওয়ার্ডেন করে দেন তবে তিনি তার ঢাকার ফ্ল্যাটটি, যেটি বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটি ছেড়ে সেখানে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করবেন। উল্লেখ্য, এ দেশে একসময় এ ধরনের ওয়ার্ডেন করার প্রচলন ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আইবিএ’ থেকে এমবিএ করে সে ব্যাচের সেরা ছাত্রই শুধু হননি তিনি; এর সফল প্রয়োগও করেছেন কিছুদিন একটি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে। পাখির টানে খুব কম সময় দিতে পারতেন অফিসে। সহকর্মীরা বলতেন তিনি অফিসের বাইরে থাকলে কাজের গতি বেড়ে যায়।
ইনাম আল হক আমার শ্রেণিকক্ষের বাইরের শিক্ষক। জানতে-বুঝতে অসুবিধা হলে পরামর্শ করার একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ তিনি। অতিথিসেবা বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত হতে হলে তার বাসায় ঘুরে আসি। বিশ্বস্ত বন্ধু ও পাচক আদিবাসী ভরত ইনাম আল হকের রুচি, ভাবনা ও ভালোবাসায় একাত্ম হয়ে তার কর্মময় সংসার আগলে রেখেছেন। সে বাসায় গেলে একই সঙ্গে একটি পাঠাগার পাওয়া যায়, মাঝেমধ্যে বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা ও চিত্রগ্রাহকের তোলা পাখি প্রদর্শনী দেখা যায়। আর প্রতি মাসের নিয়মিত আলোচনা সভা ও সøাইড দেখানো তো লেগেই আছে। পাখিদের নিয়ে বিশাল আর্কাইভটি তো একটি জাতীয় সম্পদ। গান শুনবেন, কিছুক্ষণ নির্মল আড্ডায় মন জুড়াবেন, বহুকাল যে খাবার খাননি তা খাবেন এ সবকিছুর তীর্থস্থান ইনাম আল হকের ডিওএইচএসের পরিপাটি সাদামাটা রুচিশীল গৃহ। আড্ডার বিষয় নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। ইনাম আল হকের সূচিপত্রে আপনার গো-ভাগাড় থেকে বিশ্ব সভ্যতা সবই রয়েছে। আপনি শুধু বোতাম টিপবেন।
মানুষের রোগবালাই থাকে না, অহংকার থাকে না, মেজাজ থাকে না, বয়স বাড়ে না, ক্লান্তি আসে না, হিংসা থাকে না, সে আবার কেমন মানুষ! রহস্য বোধহয় এটাই যে, ইনাম আল হক নির্মোহ জীবনযাপন করেন এবং জীবন থেকে ভালো উপাদানগুলো ছেঁকে নিয়েছেন, তাই জীবনের অন্ধকার দিকগুলো তাকে ছুঁয়ে যায়নি।
বার্ড ক্লাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কিছু দুঃশ্চিন্তা ছিল বটে; কিন্তু বহু সাথীর সঙ্গে মাজেদা হককে খুঁজে পেয়েছেন। তার ধারণা, মাজেদা হক সবার সহযোগিতায় এটিকে অনেকদূর নিয়ে যাবেন। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি ইনাম আল হকের মতো একজন শুভার্থীকে পেয়ে। তাকে বন্ধু ভাবার সাহস পাই না; কারণ তার বন্ধুদের তালিকায় অনেক উঁচু মানের মানুষ রয়েছেন। নিজেকে তার বন্ধু হিসেবে তৈরি করার চেষ্টা করেই চলেছি। আমার নিরন্তর এ চেষ্টা আমাকে ভালো থাকতে সাহায্য করে। আমার বাবা বলতেন ভালো মানুষের বন্ধু হওয়ার স্বপ্ন দেখাও নাকি পুণ্যের কাজ।
ইনাম আল হক শুধু বিনয়ী ও মেধাবীই নন, তিনি অত্যন্ত সাহসী একজন মানুষ। তাই তো এখনও সাহস করেই বলেন, তিনি নাকি এ পৃথিবী আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে যাবেন। তার বিশ্বাস পাখির ডাকেই পৃথিবীর মানুষের ঘুম ভাঙবে। পাখিরা কুলায় ফিরলেই সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে উঠবে। বিধাতা নিশ্চয়ই তার এ মিনতি কবুল করবেন।


আরোও সংবাদ