আসন নিয়ে দরকষাকষি

mirza imtiaz প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর , ২০১৮ সময় ০১:২৭ পূর্বাহ্ণ

৩০ অক্টোবরের পর যেকোনো দিন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা। কিন্তু এরই মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোট ও বিএনপির ২০ দলীয় জোটের মধ্যে। এর বাইরে রয়েছে জোট-মহাজোটের হিসাব। জাতীয় পার্টি ও যুক্তফ্রন্ট। কিংবা বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের নামে সর্বশেষ জোট পরিস্থিতি। এমন প্রেক্ষাপটে আসন ছাড় নিয়ে কী ভাবছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি?

শরিক-মিত্রদের চাওয়া ২৮০, আওয়ামী লীগ দিতে চায় ৬৫

নির্বাচনী আসন বণ্টন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে চলছে নানা হিসেব-নিকেশ। মূলত জোট ও মহাজোট রাজনীতিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে আসন বণ্টনের বিষয়টি। এরই মধ্যে যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্বে যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কথা শোনা যাচ্ছে এবং সে ঐক্যে বিএনপির শেষ অবস্থান কি হয়—নির্বাচনী রাজনীতির এমন পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের। বিশেষ করে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি না—তা নিশ্চিত হয়েই আসন বণ্টন চূড়ান্ত করতে চায় দলটি।

এরই মধ্যে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আগামী নির্বাচনে দলের জোট শরিকদের জন্য ৬৫-৭০টি আসন ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শরিকদের জন্য ৬৫টির বেশি আসন ছাড়ার সম্ভাবনা নেই—এমন আলোচনা রয়েছে দলের মধ্যে। অথচ ইতোমধ্যেই ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা ২৮০ আসন চেয়ে বসেছে আওয়ামী লীগের কাছে। এর মধ্যে জোট শরিক ১৩টি রাজনৈতিক দল চেয়েছে ১৮০টি আসন ও জাতীয় পার্টি একাই চেয়েছে ১০০ আসন।

আওয়ামী লীগ এবার জোটগতভাবেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিগত দুটি নির্বাচনের মতো এবারও শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতায় যাবে দলটি। তবে কোন দলকে কতটি আসন ছেড়ে দেওয়া হবে এবং কোন পরিপ্রেক্ষিতে এই আসন সমঝোতা বা ভাগাভাগি হবে—তা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। একেবারেই শেষ মুহূর্তে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছেন দলের নীতি নির্ধারক নেতারা।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রমতে, আসনের ব্যাপারে দল একটা হিসাব করে রেখেছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয় কি না এবং বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান কি হয়, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই আসনের হিসাবের মীমাংসা করতে চায় দল। কেননা সে ক্ষেত্রে জোট ও নির্বাচনী মিত্র দলের সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে। এ জন্য তফশিল ঘোষণার আগে আসন সমঝোতায় যেতে চায় না তারা।

এ ব্যাপারে দলের একাধিক নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, ১৪ দল জোটগতভাবে ভোট করবে—এটাই এখন পর্যন্ত নিশ্চিত। তবে নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অবস্থানটাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া আর কোন কোন দলের সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য হতে পারে—সে ব্যাপারে এখনো স্পষ্ট হওয়া যায়নি। এসব হিসাব-নিকাশের বাইরে বিএনপির নির্বাচনে আসা না আসার বিষয়টাও ভাবতে হচ্ছে। তাছাড়া বিএনপি নির্বাচনে এলে তাদেও জোটসঙ্গী কারা, সেটাও দেখতে হবে। সবমিলে আওয়ামী লীগ এখনই আসন বণ্টনের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে চায় না বলেও জানায় এই নীতি নির্ধারণী সূত্র।

দলীয় সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন ১৪ দলের জোটে ১৩টি রাজনৈতিক দল। জাতীয় পার্টি মহাজোটের শরিক। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে জাতীয় পার্টি মহাজোটে থেকেই নির্বাচন করবে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কাছে জাতীয় পার্টি ১০০ আসন চেয়েছে এবং ক্ষমতায় গেলে কমপক্ষে পাঁচজন মন্ত্রী। অন্যদিকে, ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের দাবি ১৮০ আসন। এসব শরিকদের মধ্যে বর্তমানে সংরক্ষিত আসন মিলে জাসদের ছয়জন, ওয়ার্কার্স পার্টির সাতজন, তরিকত ফেডারেশনের দুইজন ও জাতীয় পার্টি-জেপির দুইজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি ৩৫টি, জাসদ (ইনু) ৩০টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (আম্বিয়া) ১৮টি, জাতীয় পার্টি-জেপি ২২টি, গণতন্ত্রী পার্টি ১৫টি, তরিকত ফেডারেশন ৩০টি, ন্যাপ ১০টি, গণতন্ত্রী মজদুর পার্টি দুটি, গণআজাদী লীগ পাঁচটি, বাসদ পাঁচটি ও সাম্যবাদী দল পাঁচটি আসন দাবি করবে। এদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে ১৪ দলীয় জোটপ্রধানের কাছে তালিকাও দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শরিকদের আসন ছাড় ৬০ থেকে ৬৫টির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় দলটি। এ ক্ষেত্রে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টিকে ৪০ থেকে ৪৫টি এবং ১৪ দলের শরিকদের ১৫ থেকে ২০টি আসন ছাড় দেওয়া হতে পারে। তবে এ বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা এখনই স্পষ্ট কিছু বলতে চাইছেন না।

দলীয় সূত্রমতে, বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচনে এলে ১৪ দল ও জাপার সঙ্গে ৬০টি আসন নিয়ে দর-কষাকষিতে নামবে আওয়ামী লীগ। এটা সর্বোচ্চ ৬৫-তে পৌঁছাতে পারে। বিএনপি না এলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে হলে নতুন কিছু দলকে নির্বাচনে আনতে হবে। তাদেরও কিছু আসন দিতে হবে। এভাবে জোট ও মিত্রের সংখ্যা বাড়লে আরো ১০-২০টি আসনে ছাড় দিতে হবে। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত নিজেদের জন্য ২২০-২৩০ আসন রাখার চিন্তাভাবনা করছে। বিশেষ করে ১৯৯১, ২০০১ ও ২০০৮ সালে যেসব আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে, সেই আসনগুলো ছাড়তে নারাজ ক্ষমতাসীনরা।

সূত্রগুলো আরো জানায়, বিএনপি নির্বাচনে না এলে শুধু ১৪ দলের জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করবে। সে ক্ষেত্রে এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টি আলাদা নির্বাচন করবে। এ ক্ষেত্রে জোটের বাইরে সরকারি দলের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে।

এ ব্যাপারে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আসন বণ্টনের আগে দলের জোট-মহাজোটের কি অবস্থা দাঁড়ায় সেটি দেখতে হবে। সে জন্য বিএনপি ও তাদেও জোটের অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে হবে। সে জন্য বিষয়টি অক্টোবরের আগে চূড়ান্ত করা সম্ভব নয়। তবে জয়ী হতে পারবেন—এমন প্রার্থীই মনোনয়ন দেওয়া হবে। সংখ্যাটা বিষয় নয়।

১০০ ছাড়ার প্রস্তুতি বিএনপির, শরিকদের দাবি আরো বেশি

বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলে বিএনপির কাছে ১৫০টি আসন দাবি করেছে। আবার ভিন্ন দল থেকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির দাবিও আসছে আকারে ইঙ্গিতে। এমন অবস্থায় বিএনপির হাইকমান্ড চুপ থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের এ আবদার নিয়ে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে গত একদশক থেকে বিএনপির সঙ্গে থাকা ২০ দলীয় জোটের নেতারা দাবি করছেন প্রায় ১৬৫ আসন। এসব দাবি মানলে সবমিলে ৩০০ আসন ছেড়ে দিলেও হয় না। এ নিয়ে বিএনপির নেতারা সরাসরি কিছু না বললেও, ঘরোয়া আলোচনায় এ নিয়ে কথা হয়েছে। তবে দলীয় সূত্র জানায়, যেকোনো বিবেচনায় জোটের শরিক ও জাতীয় ঐক্যে প্রক্রিয়ার নেতাদের কম-বেশি শতাধিক আসনে ছাড় দিতে প্রস্তুত রয়েছে দলটি। এ নিয়ে দলের শীর্ষ নেতারা ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বিএনপি সরকার বিরোধী একটি বৃহত প্লাটফর্ম গঠনে কাজ করছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেকে অনেক ধরনের দাবি পেশ করবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে এসব দাবি-দাওয়ার বিষয়ে আমরা এখনই কোনো কথা বলতে চাই না। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি আদায়ের পর সবার চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলার নাই আপাতত।

তবে, বিএনপির সূত্রগুলো বলছে যেকোনো বিবেচনায় শতখানেকের কিছু বেশি আসনে ছাড় দিতে পারে বিএনপি। এ বিষয়ে এখনই কর্ণপাত করছে না দলটির নেতারা। তবে সব দলের দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছে বিএনপি। তাদের মতে, যেখানে যে প্রার্থীর জিতে আসার সম্ভবনা বেশি থাকবে দল থেকে তাকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে সে প্রার্থী কোন দল বা জোটের—সেটা বড় করে দেখা হবে না। এদিকে যুক্তফ্রন্টের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে বিএনপি এখনই কোনো কথা বলবে না।

এ বিষয়ে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে বলেন, ক্ষমতাসীনদের বহুমুখী চক্রান্তকে মোকাবিলা করে যার তার পক্ষে নির্বাচনে জিতে আসা সম্ভব নয়। তাছাড়া রয়েছে প্রার্থীর আর্থিক সঙ্গতির প্রশ্নটিও। সরকারের কাড়ি কাড়ি টাকার বিপরিতে শুধু নীতি কথা দিয়ে নির্বাচনে জিতে আসার দৃষ্টান্ত অতীতেও ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না। তবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করতে চাইলে সেটা ভিন্ন কথা। এ নিয়ে বিএনপিকে কিছু বলতে হবে না, রাজনীতি সচেতন জনগণই কথা বলবেন।

এদিকে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে না থাকলেও আসন বণ্টনে বিএনপির কাছে চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই ২০ দলীয় জোটের শরিকদের। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত তারা বিএনপির নীতিনির্ধারকদের চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। ২০ দলীয় জোট সূত্র জানায়, বিএনপির কাছে ২০০ আসন চেয়েও খুশি নন জোটের শরিক দলগুলো। তাদের দাবি, আসন নিয়ে বিএনপির কাছ থেকে কোনো আশ্বাসই মিলছে না। গত রোববার বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে জোটের বৈঠকে আসন বণ্টন নিয়ে কোনো কথাই বলেনি বিএনপি। এ নিয়ে হতাশ জোটের শরিকরা। তবে বৈঠকে যুক্তফ্রন্টের এক নেতার ১৫০ আসন চাওয়া নিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানা গেছে।

জোটের শরিক দলের একাধিক নেতা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, গত একদশক থেকে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই তারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আঁকড়ে ধরে রয়েছেন। কিন্তু আগামী নির্বাচন নিয়ে কোনো কথাই বলছে না বিএনপি। এটা তাদের এখনই স্পষ্ট করা উচিত।

সূত্রে জানা যায়, জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামী চায় অন্তত ৫৫টি আসন। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও খেলাফত মজলিস চায় অন্তত ২৫টি করে আসন, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) ১৫টি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ১০টি, বিজেপি দুটি, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম এবং লেবার পার্টি চায় ছয়টি করে আসন, বাংলাদেশ ন্যাপ পাঁচটি, এনডিপি দুটি, জাগপা ও এনপিপি চায় চাটি করে আসন, ডেমোক্রেটিক লীগ ও ন্যাপ চায় (ভাসানী) দুটি করে আসন এবং সাম্যবাদী দল চায় একটি আসন। এ ছাড়া যুক্তফ্রন্ট বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনে গেলে অন্তত ৫০টি আসন চাইতে পারে বলে জানা গেছে। জোটের শরিক দল কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ ইব্রাহিম বীরপ্রতীক বলেন, ‘বিএনপির কাছে শরিক দল হিসেবে কল্যাণ পার্টি ১০টি আসন চায়। জোটের অন্যতম শরিক দল এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘তার দলে বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী-এমপি রয়েছেন। সে ক্ষেত্রে এলডিপির ৩০টি আসন চাওয়া অযৌক্তিক কিছু নয়।


আরোও সংবাদ