আষাঢ় মাসের কৃষি

প্রকাশ:| রবিবার, ৯ জুন , ২০১৩ সময় ০৫:০৯ অপরাহ্ণ

বর্ষা ঋতুর সূচনা আষাঢ় মাসে। গ্রামবাংলার প্রকৃতি এ সময় নতুন সাজে সেজে ওঠে। নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ভরে উঠতে থাকে নতুন পানিতে। বর্ষার বিশেষ ফুল ‘কদম’ ফোটে গাছে গাছে। ঝিলের পানিতে শাপলা-শালুক হেসে ওঠে। এ সময় নিচু জমির পাট কাটা আর জাগ দেয়ার কাজ চলে। সে সঙ্গে উফশী রোপা আমনের বীজতলা তৈরি, পাটের পোকা-মাকড় দমন এবং শিম বীজ রোপণের কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠে গ্রামাবাংলার কৃষকরা। তাছাড়া এ সময় শুরু হয় দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে চলে বৃক্ষ রোপণ কার্যক্রম। ফলদ ও বনজ বৃক্ষের চারা সংগ্রহ এবং রোপণে উৎসাহিত হয় নারী-পুরুষসহ সব বয়সের মানুষ।
উলি্লখিত বিষয়াদিসহ প্রাসঙ্গিক অন্যান্য তথ্যাদি সহযোগে তুলে ধরা হলো আষাঢ় মাসের কৃষি।

আমন ধান
পানিতে যেন না ডোবে এমন উঁচু রৌদ্রময় স্থানে বীজতলা করতে হবে।
* চতুর্দিকে আইল বেঁধে জমিতে পানি আটকিয়ে রাখতে হবে।
* দু-চার দিন ৫-৬টি আড়াআড়ি চাষ/মই দিয়ে জমিকে থকথকে কাদাময় করতে হবে। পরিমাণমতো জৈব সার মিশিয়ে ১ মিটার চওড়া (৩ ফুট) এবং জমির আকার অনুযায়ী লম্বা রেখে প্লট তৈরি করতে হবে।
* দুই প্লট এবং পুরো বীজতলার চারপাশে ২৫ সেমি (২০ ইঞ্চি) চওড়া নালা রাখতে হবে যা দিয়ে সেচ নিকাশ বা অন্যান্য কার্যক্রম অনায়াসে করা যায়।
* সুস্থ-সবল, বালাইমুক্ত, শতকরা ৮০ ভাগ গজানো আমন বীজ প্রতি বর্গমিটারের ৮০-১০০ গ্রাম ছিটিয়ে বুনতে হবে। প্রতি একক বীজতলার চারা দিয়ে প্রায় ৩ গুণ মূল জমিতে রোপণ করা যায়।
* ভালো চারা পাওয়ার জন্য প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি গোবর, ১০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০ গ্রাম জিপসাম ব্যবহার করতে হবে।
* রোপা আমনের জন্য অনুমোদিত জাতগুলো হলো বিআর-৩, ৪, ৫, ১০, ১১, ২২, ২৩, ২৫ এবং ব্রি ধান ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৭, ৩৮, ৪০, ৪১।
* ৩০ দিন বসয়ী চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হবে।

আউশ ধান
য় মাঠে আউশ ধান শতকরা ৮০ ভাগ পেকে গেলে তাড়াতাড়ি কেটে মাড়াই ও ঝাড়াই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে বন্যার ঢল, বৃষ্টি এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
য় আউশ ধানের চিড়া-মুড়ি খুব সুস্বাদু। ইচ্ছা করলেই কৌশল খাটিয়ে কাজটি করে নিতে পারেন।

পাট
ষ পাটে ফুল এলেই কাটার সময় হয়। ধারাল কাঁচি দিয়ে পাট কেটে চিকন, মোটা আলাদা করে ১০ কেজি ওজনের ছোট অাঁটি আকারে বেঁধে নিতে হবে।
ষ অাঁটি বাঁধা অবস্থায় ৩-৪ দিন জড়ো করে রেখে দিলে পাতা ঝরে যায়।
ষ মৃদু স্রোতযুক্ত পানিতে সোজা/আড়াআড়িভাবে পাট জাগ দিতে হয় এবং ভালোভাবে পচার পর পাট ছাড়াতে হয়।
ষ বীজ উৎপাদনের জন্য ফুল আসার ২ সপ্তাহ আগে অর্থাৎ আষাঢ় মাসে ১৫-২২ সেমি পাটের আগা-ডগা ছুরি দিয়ে কেটে নিতে হবে।
ষ বাড়ির আঙিনা বা উঁচু স্থানে কাদাময় বীজতলায় ডগা লাগাতে হবে।
ষ এ সময়ে পাটের জমিতে বিছা পোকা, ঘোড়াপোকা পাটের কচি পাতা, ডগা, কুঁড়ি খেয়ে ফেলে। চেলে পোকা পাটের ডগা ছিদ্র করে। তাছাড়া ক্ষুদে মাকড়সা, পাতায় হলদে রোগসহ অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব মেরে, ডিমের গাদা সংগ্রহ করে, পোকার জন্য উপযুক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভুট্টা
খরিফ ভুট্টার মোচা সংগ্রহ শুরু করা যায়। এ সময় পরিপক্ব হওয়ার পর মোচা কেটে ঘরের বারান্দায় বা ভেতরে ঝুলিয়ে রাখা যায়। রোগ হলে পরে শুকিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হয়।
ভুট্টার মোচা পাকতে দেরি হলে মোচার আগা চাপ দিয়ে নিম্নমুখী করে দিলে বৃষ্টিতে মোচা নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে না।

শাক-সবজি
এ সময়ে উৎপাদিত সবজির মধ্যে আছে ডাঁটা, গিমাকলমি, পুঁইশাক, চিচিঙ্গা, ধন্দুল, ঝিঙা, শসা, শিম, মরিচ, পুদিনাপাতা, ঢেঁঁড়স, বেগুন, গ্রীষ্মকালীন টমেটো এসব। সবজির গোড়ার আগাছা পরিষ্কার, মাটি দেয়া, সারের উপরি প্রয়োগ, পানি ব্যবস্থাপনা, লতাজাতীয় সবজির বাড়বাড়তি বেশি হলে শতকরা ১৫-২০ ভাগ লতাপাতা কেটে ফেলা দরকার।
সবজির অধিক ফলনের জন্য হস্ত পরাগায়ন জরুরি। যৌক্তিকভাবে এ কাজটি করলে অধিক লাভবান হওয়া যায়।
তাছাড়া পচা ও শুকনো কচুরিপানা দিয়ে গুলিতি করে তাতে বীজ বপন করা যায়। চারা বড় হলে পরে মূল জমিতে রোপণ করা যায় এতে সময় বাঁচে, লাভ বেশি হয়।

গাছ-গাছালি
গাছের চারা, কলম লাগানোর উপযুক্ত সময় এখন। বসতবাড়ির আঙিনায়, রাস্তাঘাট, পতিত কিংবা অনাবাদী জমিতে গাছের চারা/কলম লাগানো যায়।
ফলদ, বন, ঔষধি জাতের চারা লাগানোর কারণে বহুমুখী লাভ আসে।
১ ফুট চওড়া, ১ ফুট গভীর গর্ত করে প্রতি গর্তে পরিমাণমতো গোবর, ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার মিশিয়ে তারপর ৭-১০ দিন পর চারা-কলম লাগাতে হবে।
চারা/কলম লাগানোর পর বেড়া/ঘের দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। মাঝখানে খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে।
ফুল আবাদের ক্ষেত্রে চারার চেয়ে কলম রোপণ করলে তাড়াতাড়ি ফল আসে।
পরিকল্পিতভাবে ঔষধি গাছের বাগান করেও অধিকতর লাভ পাওয়া যায়।
রোপণের ক্ষেত্রে ভালো জাতের উচ্চফলনশীল রোগমুক্তি এবং নিশ্চিত ভালো উৎস থেকে সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠান/নার্সারি থেকে চারা/কলম সংগ্রহ করতে হবে। তাছাড়া রোপণের পর পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার, সারের উপরি প্রয়োগ, সেচ ও নিকাশ, গোড়ায় মাটি দেয়া সময়মতো যথাযর্থভাবে করতে হবে। দুর্বল রোগাক্রান্ত শাখা-প্রশাখা কেটে দিতে হবে।

গবাদিপশু ও পাখি
আগে সংরক্ষণ করা খড়, শুকনো ঘাস, ভুসি, কুড়া, বিছালি গো-খাদ্য হিসেবে এখন বেশি ব্যবহার করবেন।
কচুরিপানা সুলভ হলেও বেশি খাওয়ানো যাবে না। কম পরিমাণে খাওয়ালেও সঙ্গে শুকনো খাবারের মিশ্রণ থাকতে হবে।
মাঠ থেকে সংগৃহীত সবুজ ঘাস ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খাওয়ানো ঠিক হবে না।
গবাদিপশুর গলাফোলা, তড়কা, বাদলা, ক্ষুরারোগ, মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। প্রতিষেধক টিকা দেয় এবং অন্যান্য প্রয়োজনে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করে কাজ করতে হবে।
কৃমির আক্রমণ বেশি হতে পারে। সুতরাং কৃমির ওষুধ খাওয়াতে দেরি করা যাবে না।
গবাদিপশুকে ঠা-া, খোলামেলা ও শুষ্ক জায়গায় রাখতে হবে। কাদা বা স্যাঁতসেঁতে স্থানে বেশিক্ষণ রাখা যাবে না।mac cas1
হাঁস-মুরগির কৃমি, কলেরা, রক্ত আমাশয়, সর্দি এসব রোগ দেখা দিলে পশু চিকিৎসকের পরমার্শ অনুযায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। হাঁস-মুরগির সুষম খাবার নিশ্চিত করতে হবে। পরে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে ঘর ও চারপাশের পরিবেশ ভালো রাখার ব্যবস্থা করবেন।
এ সময় হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফোটানোর প্রচচেষ্টা না চালানোই ভালো। তবে বিশেষ যত্ন এবং সতর্কতার সঙ্গে ডিম ফোটানো যেতে পারে।

মৎস্য
বন্যা মাছ চাষের অনেক ক্ষতি করে। পুকুরের পাড় বাঁধা, পাড়, উঁচু করা, জাল-বাঁশের চালা দিয়ে বেড়া দেয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বন্যা বা বেশি পানি হলে দারুণ কাজে আসবে।
মাছের পোনা ছাড়া, পুকুরে খাবার দেয়া, এসব কাজ নিয়মিত করতে হবে। মাছচাষের ক্ষেত্রে তিন স্তর বিশিষ্ট মিশ্র চাষের ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিলে লাভ বেশি পাওয়া যায়।
যাদের পুকুর নেই বা অংশীদারিত্বে মাছচাষে সমস্যা তারা অনায়াসে পুকুরে, খালে-বিলে, হাওরে অর্থাৎ উপযুক্ত জলাসীমায় খাঁচায় মাছচাষ করতে পারেন। দ্রুত বর্ধনশীল মাছচাষ এ ক্ষেত্রে বেশি লাভ পাওয়া যায়।
কৃষিবিদ আবুল কালাম আজাদ