আম সংরক্ষণে নয়া পদ্ধতি ফরমালিন ছাড়াই রাখা যাবে ২০ দিন

প্রকাশ:| রবিবার, ২২ জুন , ২০১৪ সময় ১০:৩৯ অপরাহ্ণ

বারেক কায়সার>>আম সংরক্ষণে নয়া পদ্ধতি ফরমালিন ছাড়াই রাখা যাবে ২০ দিনআমll wp-image-33764″ />
নাগরিক সংগঠন ‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন’ পরীক্ষা করে দেখেছে, ঢাকার বাজারের ৬৬ শতাংশ আমে উচ্চ মাত্রায় ফরমালিন রয়েছে। চলতি মাসে সংগঠনটির একটি কারিগরি দল বিভিন্ন বাজারে বিক্রয়যোগ্য আম পরীক্ষা করে এই তথ্য জানিয়েছেন। এমন উদ্বেগের সময় আশার আলো দেখাচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের দুই বিজ্ঞানী। ড. ক্ষীরোদ রায় ও ড. মো. নূরুল আমীন বানিয়েছেন একটি যন্ত্র। নাম দিয়েছেন ‘গরম পানিতে আম শোধন যন্ত্র’। যেটির ব্যবহার ফরমালিন ছাড়া ২০ দিন পর্যন্ত আমের পচন রোধ করবে।

ড. ক্ষীরোদ রায় এই প্রসঙ্গে বলেন, প্রতি কেজি আম শোধনের খরচ পড়বে মাত্র ১৭ পয়সা। প্রতি ঘণ্টায় শোধন করা যাবে ১ টন আম। এ যন্ত্র ব্যবহার করলে আমের পচন রোধ হবে। তিনি বলেন, বেশিরভাগ আম পচে যায় বলে ব্যবসায়ীরা আমে ফরমালিন দেন। ‘গরম পানিতে আম শোধন যন্ত্র’ ব্যবহার করলে ফরমালিনের মতো ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার করতে হবে না।

যন্ত্র বানাতে যা লাগবে
পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৫২ থেকে ৫৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার পানিতে ৫ থেকে ৭ মিনিট ধরে আম শোধন করলে বোঁটা পচা রোগ ও এ্যানথ্রাকনোস দমন হয়। তাই আম নষ্ট হওয়া রোধ করা যায়। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত লোহার অ্যাংগেল, লোহার শিট, বেল্ট, পুলি, বিয়ারিং, লোহার পাইপ, বৈদ্যুতিক মটর, বৈদ্যুতিক নাড়ুনি, থার্মোমিটার, তাপ নিরোধক কর্কশিট প্রভৃতি দিয়ে যন্ত্রটি বানানো যায়।

লোহার শিট দিয়ে ১০ ফুট লম্বা, ৩.৩৩ ফুট চওড়া এবং ১.৮৭ ফুট উচ্চতার একটি পানির ট্যাঙ্ক তৈরি করা হয়। তার বাইরে এক ইঞ্জি পুরু কর্কশিট আটকানো হয় পানির তাপ নিরোধের জন্য। পানির ট্যাঙ্কের ভিতরে ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার ৬টি বৈদ্যুতিক হিটার লাগানো হয়। এগুলি একটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী প্যানেলের সাথে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে যাতে পানির তাপমাত্রা নির্দিষ্ট পর্যায়ে রাখা যায়। ট্যাঙ্কের তলায় লোহার পাইপ নির্মিত রোলার প্রস্থ বরাবর লাগানো থাকে। মোটরের ক্ষমতা ০.৭৫ কিলোওয়াট। এটি দিয়ে রোলার পাইপ ও নাড়ুনি ঘোরানো হয়। যন্ত্রটি চালানোর জন্য ২০ কিলোওয়াট শক্তি প্রয়োজন। প্রতি মিনিটে মোটরের ঘূর্ণায়মান গতি ১৪০০ থেকে রোলারে প্রতি মিনিটে ৩.৫-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে যন্ত্রের এক প্রান্তে আম ভর্তি প্লাস্টিকের ঝুড়ি রোলারের উপর রাখলে ৫ মিনিটে অপর প্রান্তে চলে যায়। ট্যাঙ্কের তলায় স্থাপিত বৈদ্যুতিক নাড়ুনি পানির তাপমাত্রা সব স্থানে সমান রাখতে সাহায্য করে।আম

যন্ত্রের কার্যকারিতা
আম শোধনের জন্য পানির ট্যাঙ্কে প্রথমে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পরিষ্কার পানি ভরে ৫৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় হিটার সেট করা হয়। দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পানির তাপমাত্রা ৫৫ ডিগ্রিতে ওঠে। তখন রোলার চালানোর জন্য মোটর চালু করা হয়। আম ভর্তি প্লাস্টিকের ঝুড়ি যন্ত্রের এক প্রান্তে পানির মধ্য দিয়ে রোলারের উপর বসিয়ে দেয়া হয়। ঝুড়িটি সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রের অন্য প্রান্তের দিকে চলা শুরু করে। পুনরায় আম ভর্তি ঝুড়ি রোলারের উপর বসানো হয়। এভাবে অনবরত আম ভর্তি ঝুড়ি বসানো হয়। বসানোর ঠিক পাঁচ মিনিট পর ঝুড়ি অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। আম ভর্তি ঝুড়ি তখন অন্য প্রান্ত থেকে তুলে আম শুকানোর জন্য রাখা প্লাস্টিক শিটের উপর ছড়িয়ে দেয়া হয়। বৈদ্যুতিক পাখা দিয়ে সদ্য শোধনকৃত আম শুকিয়ে প্যাকিং করা হয়। আম শুকানোর জন্য দুই থেকে তিন মিনিট লাগে।

ব্যবহারে সফলতা
পরীক্ষামূলকভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দে স্থাপন করা হয় যন্ত্রটি। প্রথম দিন ৩ টন ল্যাংড়া আম শোধন করা হয়। প্রতি ঘন্টায় ১ টন আম শোধন করা গেছে। আমের গুণগত মান ঠিক রাখার জন্য বাজার থেকে ক্রয়কৃত আম প্রথমে বাছাই করা হয়। শোধনের আগে সব আম পরিষ্কার পানি দিয়ে ধোয়া হয়। এতে আমের গায়ে লেগে থাকা ধুলাবালি ও আমের কষ দূর হয়। গরম পানিতে আম শোধন ও শুকানোর পর প্রতিটি আম পলিইথাইলিন ফোম নেট বা ন্যাপকিন কাগজ দিয়ে মোড়ানো হয়। মোড়ককৃত আম বাঁশের ঝুড়ি, ৫ কেজি কার্টন এবং প্লাস্টিকের ঝুড়িতে ভরে ট্রাকে করে জয়দেবপুর ও ঢাকায়আম১ পরিবহন করা হয়। গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য ৩০০ কেজি আম রাখা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে আম হলুদ বর্ণ ধারণ করে। প্রতিটা আম মোড়ানো ছিল বলে কোনো আমের গায়ে দাগ ছিল না। সাধারণ তাপমাত্রায় ২০ দিন পর্যন্ত রাখার পরও কোনো আম পচেনি এবং আমের বর্ণ হলুদ হয়েছিল।

বিরূপ প্রতিক্রিয়া দূর
প্রতিজন ব্যবসায়ী প্রতি মৌসুমে কয়েক কোটি টাকার আম ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য শহরে বাজারজাত করেন। তাদের জন্য যন্ত্রটির দাম তেমন বেশি নয়। এই যন্ত্র ব্যবহার করলে আমের অপচয় রোধ হবে। অপচয় রোধ হলে বর্তমানের চেয়ে বেশি দামে কৃষকদের আম বিক্রয় করার এবং কম মূল্যে ক্রেতাদের আম ক্রয় করার সম্ভাবনা থাকে। অসাধু ব্যবসায়ীরা নিষিদ্ধঘোষিত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করেন। সেজন্য অনেকে আম কেনা ছেড়ে দিয়েছেন। গরম পানিতে শোধন করা আম কিনতে পারলে ক্রেতাদের এই বিরূপ মনোভাব দূর হবে।

উদ্ভাবকদের ভাষ্য
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারি বাঙালিরা বেশি দাম দিয়ে হলেও দেশে উত্পাদিত গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি প্রভৃতি জাতের আম কিনতে আগ্রহী। তবে বাজার থেকে আম কেনার দু’চার দিনের মধ্যে আম পচে যায়। তাই রপ্তানিকারকগণ রপ্তানি করতে আগ্রহী হন না। আর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আমের পচনরোধ করতে ব্যবহার করেন ফরমালিন। তবে নতুন উদ্ভাবিত আম শোধন যন্ত্র দিয়ে শোধন করলে আমে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। শোধনের পর পলিইথাইলিন ফোম নেট দিয়ে মুড়িয়ে এবং রপ্তানির জন্য ব্যবহূত কার্টন ব্যবহার করলে পচন সমস্যা দূর করা যাবে। উদ্ভাবকরা জানান, এটি কৃষকদের জন্য উপযোগী নয়। ব্যবসায়ীদের কথা মাথায় রেখে যন্ত্রটি বানানো হয়েছে। আমাদের এই যন্ত্র বানাতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হবে। তবে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করলে খরচ আরো কমবে। বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠান এই যন্ত্র বানাতে বিনিয়োগ করবে বলে প্রত্যাশা করছি। >>ইত্তেফাক