‘আমি মুসলমান, আমি বাঙ্গালী, আমি আওয়ামী লীগার’

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর , ২০১৫ সময় ১১:৪৭ অপরাহ্ণ

সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করলেন মন্ত্রিত্ব ও আওয়ামী লীগের সদস্যপদ হারানো আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। নিজেকে সাচ্চা মুসলমান দাবি করে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। আজ সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ চান লতিফ সিদ্দিকী। সেখানে দেয়া বক্তব্যে লতিফ সিদ্দিকী তার মন্তব্যে যারা কষ্ট পেয়েছেন তাদের কাছে নত শিরে ক্ষমা চেয়ে সংসদ থেকে বিদায় নেন তিনি।
সংসদে শেষ বক্তব্যে যা বলেন
শুরুতেই লতিফ সিদ্দিকী স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি এই সংসদে সাধারণ মৌখিক বক্তৃতা করেছি, আজ বিশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানাতে দাঁড়িয়েছে। এজন্য একটি লিখিত বক্তৃতা নিয়ে এসেছি। স্পিকারের অনুমতি নিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে আমি অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়েছি।  আজকে আমার সমাপ্তি দিন। এই দিনেকারো বিরুদ্ধে কোন বিদ্ধেষ  অভিমান অভিযোগ আনছিনা।  দেশবাসী আমার আচরণে যদি কোন দু:খ পেয়ে থাকেন  আমি নত মস্তকে তাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।  আমি মানুষের ভালবাসাকে আমার শ্রেষ্ঠ মুলধন মনে করি।   সেই ওয়াদা করে সর্বশেষে আমি বলছি, উপরন্তু  অনুমিত হয়েছি  আমার নেতার অভিপ্রায়   আমি আর সংসদ সদস্য  না থাকি।   কর্মী হিসেবে নেতার একান্ত অনুগত ছিলাম। বহিস্কৃত হওয়ার পর তার ব্যত্যয় কিংবা   ব্যতিক্রম সমীচীন মনে করিনা।এরপর তিনি টাঙ্গাইল (৪) আসনের সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষনা দেন। এর আগে লিখিত বক্তব্যে বলেন, প্রথমে আমি বলে নেই, আমি মুসলমান আমি বাঙ্গালী, আমি আওয়ামী লীগার। এই পরিচয় মুছে দেয়ার মতো শক্তি পৃথিবীর কারো নেই। কারণ এই আমার চেতনা, আমার জীবনবেদ,   প্রাণের রশদ, চলার সুনির্দিষ্ট পথ। যে যাই বলুন, প্রচার করুন, সিদ্ধান্ত নিন এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটবেনা। আমি মানুষ বলেই আমার ভুল ভ্রান্তি আছে, ক্রুটি আছে। কিন্তু মনুষত্বের স্খলন নেই, মানবতার প্রতি বিশ্বাস হারাই না, যত বড় আঘাতই আসুক ধৈয্যহারা হইনা। আমি বিশ্বাস করি  আধার মানেই আলোর হাতছানি, রাষ্ট্র নিপীড়ন করলেও আমি ধৈয্য ও সহনশীলতার সঙ্গে মেনে নিয়েই তা মোকাবেলা করলাম। আমি অভিযোগের টুকরি নিয়ে সংসদে দাড়াইনি।  ভালবাসার মহিমা বিতরণ করতে  সৌহার্দ্য আর প্রীতি ভালবাসার  মালা সাজিয়ে নিয়ে এসেছি।  আমি সব সময়ই অস্পষ্টতা ও ধুসরতা বিরোধী। অস্পষ্টতা, ধুসরতা, কপটতা  স্বার্থপরতা  সুযোগ সুবিধার পথে হাটাকে অপছন্দ করি।  জীবন উৎসর্গ করেছিলাম।   মানুষ সমাজ  রাষ্ট্র মানবতার সেবায়।  নিজের জন্য ভারী ভারী পদ পদবী   করায়ত্ব করতে নয।  আর পদপদবীর জন্য নিজের চরিত্র বৈশিষ্ট  কালিমা লিপ্ত করা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ। অসাম্প্রদায়িক, ইহজাগতিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দ্বারা আমার মনন গঠিত ও বিকশিত এবং প্রতিনিয়ত এর চর্চা ও অনুশীলন করি। অমানুষ নই, ব্রতমান মানুষ।  মনুষত্ব ও মানবতার চর্চা  অনুশীলন করতে গিয়ে   নিজের ভিতরে অনেকগুলো কুঠুরি নির্মান করেছি।   মানুষ ও মনুষত্বের অনুশীলনে  বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কুঠুরিতে প্রবেশ করি।  সেই কুঠুুরির একটা আমার ধর্ম কুঠুরি। সেখানে আমি সাচ্চা মুসলমান।  ধর্র্মীয় জীবন একান্তই আমার জীবন। এই জীবন ধারণে। জনবাহবা বা নিন্দা কোনটাতেই আমি কুণ্ঠিত, বিব্রত ও ভীত সন্ত্রস্ত হইনা। নিজের কাছে নিজেই জবাবদিহি করেই সন্তুষ্ট। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমার ধর্ম কুঠুরির ভাবজগৎ নিয়ে সমষ্টিতে আলোড়ন আন্দোলন দেখা দিয়েছে।  সমষ্টি আমাকে ত্যাজ্য করেছে। যেভাবেই ভাবা যাক  রাজনীতির সামষ্টিক কোনক্রমেই ব্যষ্টির বা স্বতন্ত্র অবস্থান স্বীকার করেনা। কারণ রাজনীতি মানব কল্যাণের একটি প্রকৃষ্ট উপায়, কোন বিচ্ছিন্ন উপায় নয়। অন্যদিকে ব্যক্তি জীবন একান্তই ব্যক্তির । এখানে সমষ্টির প্রবেশ নিষিদ্ধ। ব্যক্তি এখানে সবকিছু। আমাকে ষড়যন্ত্রকারি, প্রতিশোধপরায়ন ধর্মদ্রোহি  গণদুশমন, শয়তানের রিপ্রেজেন্টেটিভ বিভিন্ন ঘৃনার পাত্র সাজাতে সবশেষে ধর্মকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাড় করিয়ে দেয়। আমি ষ্পষ্ট করে দৃঢ়চিত্তে বলতে চাই, আমি ধর্মবিরোধী নই, আমি ধর্ম অনুরাগি,  একনিষ্ঠ সাচ্চা মুসলমান।  আমি বলতে সাহস পাই, ধর্মীয় অনুশাসন মানে যে সব করন্ত কাজ ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী গোষ্ঠী   স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর তাদের বিরুদ্ধে শান্তির ধর্ম   ন্যায়ের ধর্ম   সত্যের ধর্ম   অন্ধ্যকার থেকে আলোর দিশার ধর্ম ইসলামের সঠিক তাৎপর্যকে  উর্ধে তুলে ধরতে  অম্লান থাকবে আমার পথচলা। আমার এই মনভাবের প্রকাশ নিয়ে যতই ষড়যন্ত্র হোক   যত মিথ্যাচার হোক   যত আঘাত প্রতিঘাত আসুক,   রাজনৈতিক  সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আস্থা রেখে যেমন  মোকাবেলা করেছি  বর্তমানেও এর ব্যত্যয় ঘটবে না।   আমি মনে করি হজ প্রতিপালন ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে অন্যতম ফরজ।   এই ফরজ পালনেও আরো কতগুলো অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় অনুশাসন   প্রতিপালন করে মাত্র একবারই করার কথা। যা নিজেও করেছি। ওয়াজিব সুন্নাত পরিহার করে  অবশ্য পালনীয় ফরজ তরক করে   যারা এই ফরজটি পালনে প্রতিবছর ব্যস্ত  তাদের মানসিকত আর আমার বিবেচনা   ভিন্ন।  হজ যে একটি বিরাট আর্থনীতিক কর্মকান্ড   তা কিন্তু মানতে না চাইলে মিথ্যা হয়ে যায়না। রোজার মাসটি আমার প্রাত্যহিক জীবনের অবশ্য পালনীয় মাস।  আমি এই ধর্মীয় আচারটি পালন করি। মহানবী আল্লাহর প্রেরিত প্রতিনিধি বিশ্বের শ্রেষ্ট দার্শনিক। শূন্য থেকে একক প্রচেষ্টায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনে দক্ষ ও সফল রাষ্ট্রনায়ক।  আমার চলার পথের আলোকবর্তিকা। আদর ভালবাসা শ্রদ্ধা ও সম্মানে   নিজের বুকে আগলে  আব্দুল্লাহপুত্র মোহাম্মদ বলে আদর প্রকাশে   কুণ্ঠিত ভীত বা শংকিত নই।  এই দুর্লভ মানব জীবন  সামনে মহানবীর আদর্শিক জীবন চলার নির্দেশনা থাকার পরও কি   সুন্দরের আরাধনা মনে জাগবে না ? যতবার বলতে বলা হবে ততবার বলবো, তবলিগ প্রচারকারিরা যদি ধর্মপ্রচারের সঙ্গে সমাজ রাষ্ট্র চেতনা বৃত্তির দিকে মনোযোগি হতেন তাহলে  তবলিগের যে প্রভাব আমাদের সমাজ জীবনে প্রতিফলিত  তা আরো ফলবতী হতো, কার্যকর ভূমিকা রাখতো। নবী (স.) কখনো জীবনকে অস্বীকার করে ধর্ম পালন করতে বলেননি। জীবনের জন্য ধর্ম অপরিহার্য। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে বিদায় হজের ভাষনে নিষেধ করে গেছেন। যারা অসাম্প্রদায়িক ও ইহজাগতিকতার কথা প্রচার করেও ধর্মানুগ নীতি নিয়ে শোরগোল তোলেন তাদের বিষয় নিরব থাকাই সমীচীন মনে করি। তিনি বলেন, এমন বহিস্কারের খড়গ এবারই প্রথম নয়।  স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও চারবার বহিস্কৃত হয়েছি।  বাঙ্গালীর আত্ম পচিয়ের সরব ঘোষনার কারণেই। দল থেকে দুইবার বহিস্কার হয়েছি দলীয় কর্মকান্ড দুর্বল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছি বলে।  এবারও কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ইহজাগতিক মনোভাব প্রকাশ করার কারণেই   আমি দল থেকে বহিস্কার, মন্ত্রীসভা থেকে অপসারণ, প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ হরণ করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন ও শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহন কতখানি যৌক্তিক   সে বিষয়ে বলতে চাই  নিকট অতীতে মো: হানীফ যখন   আওয়ামীলীগের ঘোষনাপত্র থেকে  ধর্ম নিরপেক্ষ সাম্প্রদায়িক   নীতি আদর্শ বাদ দিতে ওকালতি করেন  তখন তার এই তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার  ছিলাম। তখন ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ উঠেনি। কারণ  দল তখন ক্ষমতায় ছিলনা, দলের অবস্থা এমন রমরমা ছিলনা।  আমার যত আপত্তি সংবিধানের ৬৬অনুচ্ছেদের ৪দফা উল্লেখ করে।   বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে স্পিকারের চিঠি প্রসঙ্গে। এই চিঠিতে সংসদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন সংবিধানের অপব্যাখ্যা হয়েছে।  বিনা শুনানীত্ েএভাবে একজন সংসদ সদস্যের আসন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়া যথাযথ কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিদায় বেলায় শুধু এই কথা বলতে চাই আমি মানুষের জন্য রাজনীতি করেছি মানুষকে ভালবেসেছি। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে আমি অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়েছি। আজকে আমার সমাপ্তি দিন। এই দিনেকারো বিরুদ্ধে কোন বিদ্ধেষ অভিমান অভিযোগ আনছিনা। শেষে তিনি বলেন, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা সফল হোক।