‘আমাদের সোনার মেয়ে! অভিনন্দন তাঁকে

প্রকাশ:| রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি , ২০১৬ সময় ১০:৪০ অপরাহ্ণ

mabi

এস এ গেমসে স্বর্ণপদক জয়ের পর জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মাবিয়া আক্তার। চোখ থেকে বের হতে থাকে আনন্দের অশ্রু। অভিনন্দন তাঁকে

রোববার দুপুরের আশেপাশে একটা সময়। ভারতের গুয়াহাটির ডক্টর জাকির হোসেন অ্যাকুয়াটিক কমপ্লেক্সের সুইমপুলে তখন সাউথ এশিয়ান গেমসের (এসএ)১০০মিটার ব্রেস্ট স্টোকে ঝড় তুলেছেন প্রতিযোগিরা। মাত্র ১ মিনিট ২০:২০ সেকেন্ডে সবার আগে সাঁতার শেষ করে স্বর্ণ জিতলেন বাংলাদেশেরই মেয়ে মাহফুজা খাতুন। স্বর্ণকন্যা নামেই যাকে চেনে পুরো দেশ।

‘আমাদের সোনার মেয়ে!এবারের এসএ গেমসে সোনা জিতে আলোচনায় আসলেও দেশের সাঁতারে পুরোনো নাম মাহফুজা খাতুন। এক যুগ ধরেই পানির সঙ্গেই আছেন বন্ধুদের প্রিয় এই শিলা।

তখন ২০০৬ সাল। সেবার এস এ গেমসের আসর বসেছিল শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে।

ওই গেমসে সাঁতারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রতিযোগী ছিলেন মাহফুজা খাতুন।  পুলে বড় বড় প্রতিযোগীর সঙ্গে অংশগ্রহণ করে এই খুদে প্রতিযোগী বড়জোর অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন—এমনটিই আশা ছিল বাংলাদেশ টিমের।

কিন্তু কিসের কী? মাহফুজা পুলে নেমেই করলেন বাজিমাত। ৫০ ও ১০০ মিটার সাঁতারে কার্যত ঝড়ই বইয়ে দিলেন।অন্যান্য দেশের বাঘা বাঘা প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে উভয় মিটারে জিতে নিলেন ব্রোঞ্জ। খুদের এ  দক্ষিণ এশিয়া জয় নিয়ে তখন দেশ-বিদেশে বেশ মাতামাতি হয়েছিল। অনেক পুরস্কারও ঝুটেছিল মাহফুজার কপালে।

তখন কাগজে কলমে বাংলাদেশের এই সাঁতারের রানীর আন্তর্জাতিক উত্থান হলেও দেশের সাঁতারে পরিচিত মুখ ২০০৩ সাল থেকেই। ৫০ মিটারে একবার লক্ষ্যচ্যুত হওয়া ছাড়া ২০০৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৫০ ও ১০০ মিটার সাঁতারে মাহফুজা টানা স্বর্ণ জিতেছিলেন। একটা সময় ছিলেন মেয়েদের সাঁতারে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয়।

খেলাধুলার পাশাপাশি পড়ালেখাও সমান তালে চালিয়ে গেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। সম্প্রতি শেষ করেছেন স্নাতকোত্তর শ্রেণি।

mabiaচট্টগ্রামে পড়ালেখা করায় আগে তাকে নানা কাঠখড় পোড়াতে হতো। সারাবছরই ঢাকা-চট্টগ্রাম যাত্রা।তবে সে যন্ত্রণা এখন আর নেই। এক বছর ধরে ঢাকাতেই স্থায়ী।

রোববার রাতে স্বর্ণ জেতায় ফেসবুকে মাহফুজাকে অভিনন্দন জানাতেই ফিরতি বার্তায় ধন্যবাদ জানান। পরে সোনা জেতায় ভালো লাগছে বলে নিজের উচ্ছ্বাসের কথা বলেন। সবার দোয়া চান।

তবে সোমবারও তার আরেকটি ইভেন্ট থাকায় কথা এ যাত্রায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো।

একই বিভাগে পড়ার সূত্রে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে অতীতে অনেকবার কথা হয়েছে মাহফুজার সঙ্গে। সেসময় তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন মাহফুজা।

কীভাবে এত দূর আসা এমন প্রশ্নে মাহফুজা তখন জানিয়েছিলেন ‘২০০২ সালের শেষের দিকে।  সাঁতার ও দৌড়ের কল্যাণে বৃহত্তর খুলনাতে তখন তার বেশ নামডাক। হঠাৎ একদিন পাড়ার এক ক্রীড়ানুরাগী বড় ভাইয়ের চোখে পড়েন তিনি। তার পরামর্শে ২০০৩ সালের এক সকালে অস্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন বাংলাদেশ ক্রীড়া সংস্থা পরিষদে (বিকেএসপি)।’

সেই শুরু। পরেরটা তো ইতিহাস!  পুরস্কারের ঝুলিতে রয়েছে ২০০৭, ০৮ ও ১০ সালে ইন্দোবাংলা গেমসে স্বর্ণজয়। ২০১০ সালে নেপালের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ প্রতিযোগিতায়ও স্বর্ণ জিতেন মাহফুজা। এছাড়া দেশ-বিদেশে আরও অনেক অর্জন তো রয়েছেই।

সাঁতারের বাইরে মাহফুজার কিন্তু ছোট্ট মজার একটি ইতিহাসও রয়েছে। আগে গল্পে গল্পে উঠে এসেছিল সেই কথা।

সেই গল্পটা এবার বলা যাক।

প্রথম জীবনে খুলনা বিভাগে দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন মাহফুজা। বিকেএসপিতে প্রথম জীবনে সাঁতারের চেয়ে দৌড়টাকেই বেশি ভালোবাসতেন তিনি। পরে কোচের পরামর্শে সাঁতারেই স্থায়ী। ২০০৪ সালে মজার এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন মাহফুজা। বিকেএসপির হয়ে সেবার জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেন। কথা ছিল শুধু সাঁতারেই অংশ নেবেন। কিন্তু ৪০০ মিটার দৌড়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন বিকেএসপির প্রতিযোগী। কী আর করা। সোজা পুল থেকে তুলে এনে ট্র্যাকে নামিয়ে দেওয়া হলো মাহফুজাকে। বেশ হয়ে গেল। বিকেএসপির মান রাখলেন মাহফুজা। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সবার আগেই দৌড় শেষ করলেন মাহফুজা। পরের বছরও নিজের জাত চিনিয়ে ৪০০ মিটারে মেয়েদের মধ্যে আবারও দেশসেরা।

এদিকে এস এ গেমসে সোনা জয়ের পর তার শিক্ষক ও বন্ধুরা শুভেচ্ছা জানিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন মাহফুজার ফেসবুক ওয়াল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান ও তার শিক্ষক আলী আর রাজি তার নিজের ওয়ালে লিখেছেন ‘আমাদের সোনার মেয়ে! অনেক অনেক আনন্দের উপলক্ষ্ হয়ে আবারও হাজির আমাদের মাহফুজা শিলা। অভিনন্দন শিলা! অনেক শুকরিয়া!’

এখন সাঁতারে তার পড়ন্ত বয়স।কিন্তু এ বয়সেও যেনো পুলে নামলে ২০০৩ সালের সেই মেজাজ। স্বপ্ন দেখেন ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’খ্যাত অলিম্পিকে অংশ নিবেন একদিন।


আরোও সংবাদ