আমাদের লক্ষ্য অবাধ, নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন- শেখ হাসিনা

প্রকাশ:| শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর , ২০১৩ সময় ১১:২৯ অপরাহ্ণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা সকল দলকে সঙ্গে নিয়েই জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চাই। বিরোধী দলের কাছে আমার প্রস্তাব, নির্বাচনকালীন সময়ে আমরা সকল দলের সমন্বয়ে সরকার গঠন করতে পারি। আমাদের লক্ষ্য অবাধ, নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।’

বিরোধী দলের কাছে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধী দলের সাংসদদের মধ্য থেকেও আপনারা নাম দিতে পারেন, যাঁদের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে মন্ত্রিসভায় সদস্য করে সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে পারি। নির্বাচনে যাতে কারও কোনো সন্দেহ না থাকে, সকল সন্দেহ দূর করে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারি, যে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের মনমতো সরকার গঠন করতে পারবে। আমি বিরোধী দলের নেতাকে অনুরোধ করছি, তিনি এই ডাকে সাড়া দেবেন। আমার এ অনুরোধ তিনি রক্ষা করবেন এবং আমাদের যে সদিচ্ছা, সেই সদিচ্ছার মূল্য তিনি দেবেন।’

আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৭-এর ১/১১-এর মতো কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন জগদ্দল পাথরের মতো জনগণের বুকের ওপর চেপে বসে, তখন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক-ছাত্র-পেশাজীবী, ব্যবসায়ীসহ সবার ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। এ ধরনের অসাংবিধানিক শাসনের পুনরাবৃত্তি আর কখনোই হবে না—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

বিএনপির অপকর্মেই এসেছিল ১/১১
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশজুড়ে হত্যা-সন্ত্রাস-ধর্ষণ-লুটপাট-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দেশকে অন্ধকারের পথে ঠেলে দিয়েছিল। সেই দুঃসহ দহন-জ্বালার আতঙ্ক মানুষকে এখনো তাড়া করে ফেরে। হাওয়া ভবন নামে সরকারের ভিতরে আরেকটি সরকার এ দেশের মানুষ ভুলে যায়নি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির এ অপকর্মের কারণেই দেশে নেমে এসেছিল ১/১১-এর আরেক যন্ত্রণাময় অধ্যায়। এ দেশের মানুষ সেই আতঙ্কের শাসন থেকেও সাহসের সাথে বের হয়ে এসেছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে উজ্জ্বল সম্ভাবনার পথ বেয়ে। দেশের মানুষ খেয়ে-পরে শান্তিতে আছে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হয়েছে।’

দা-কুড়াল নিয়ে মানুষ মারার নির্দেশ প্রত্যাহারের আহ্বান
ছুরি, দা, খুন্তা, কুড়াল নিয়ে মানুষ মারার নির্দেশ প্রত্যাহারে জন্য বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শান্তি ও ঐক্যের পথই দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। জনতার ওপর আস্থা রাখুন, সন্ত্রাসের পথ পরিহার করুন। আপনারা কি চান, তা সংসদে এসে বলুন। আলোচনা করুন। আলোচনার দরজা সব সময় আমাদের পক্ষ থেকে উন্মুক্ত আছে।’

সংবিধান অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের সংবিধানের ৭২-এর ১ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে; আমি কোট করছি, ‘সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ষাট দিনের অতিরিক্ত বিরতি থাকিবে না’ আনকোট। এখানে আরও উল্লেখ আছে যে, কোট—‘তবে শর্ত থাকে যে ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩ দফার ক উপধারায় উল্লেখিত নব্বই দিন সময় ব্যতীত অন্য সময়ে’—আনকোট।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩ দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয় উল্লেখ আছে। ৩ এর (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করে। ২৫ জানুয়ারি বর্তমান সংসদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর থেকে নব্বই দিনের হিসাব শুরু হবে।
সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের ১ দফা অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন।
নব্বই দিনের মধ্যে যাতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেজন্য আমি সব দলের সাথে, বিশেষ করে মহাজোটের সাথে পরামর্শ করে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে যথাসময়ে লিখিত পরামর্শ দেব। এ ক্ষেত্রে আমি বিরোধী দলের কাছেও পরামর্শ আশা করি।

পথচারী-বাস ড্রাইভারকে আগুনে পুড়িয়ে মারা বন্ধ করুন
বিরোধী দলের কাছে প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বোমা মেরে, আগুন জ্বালিয়ে জনগণের জানমালের ক্ষতি করবেন না। কোরআন শরিফ পুড়িয়ে, মসজিদে আগুন দিয়ে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করা বন্ধ করুন। মাদ্রাসায় বোমা তৈরির কাজে ব্যবহার করতে এতিম বাচ্চাদের লাশ বানানো বন্ধ করুন। নিরীহ পথচারী আর গরিব বাস ড্রাইভারকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা বন্ধ করুন। মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে যে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের কারণে নিন্দিত ও সমালোচিত হতো, লজ্জায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যেত, সেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছি। কঠোর হাতে জঙ্গিবাদ দমন করেছি। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করেছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছি। দেশবাসী ও প্রবাসী বাঙালিরা এখন মাথা উঁঁচু করে মর্যাদার সাথে চলতে পারেন।’

আবারও মুলতবি প্রস্তাব দিন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেত্রীকে আমি সংলাপে ডেকেছিলাম। দুঃখের বিষয়, তার জবাবে তিনি আলটিমেটাম দিয়ে বললেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশছাড়া করবেন। ৪, ৫ ও ৬ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরের ধ্বংসযজ্ঞ জাতিকে আতঙ্কিত করেছিল। আমরা সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়ে মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছি, নিরাপত্তা দিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে মুলতবি প্রস্তাব দিলেন। যখন আলোচনায় আমরা রাজি হলাম সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিলেন। একবার বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আরেকবার নির্দলীয়, আবার বলছেন হাসিনামুক্ত। নানা অবাস্তব কথা বলে যাচ্ছেন। মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। প্রয়োজনে আবারো মুলতবি প্রস্তাব দিন জাতীয় সংসদে এবং সুস্পষ্টভাবে বলুন আপনারা কী চান?

আগামী নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের মনে আছে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমান সাহেব নির্বাচন কমিশন গঠন করার আগে সকল রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের সাথে মতবিনিময় করেছিলেন। বিরোধী দলের নেতা বিএনপি নেত্রী সেই সংলাপে যোগ দিয়েছিলেন। সবার পরামর্শক্রমেই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। আমরা সরকার গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত ৫,৭৭৭টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত করেছে। কোনো নির্বাচনেই সরকার হস্তক্ষেপ করে নাই। অনেক নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে ইনশআল্লাহ।’

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৬.৫ বিলিয়ন ডলার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে চলছে। মানুষের মাথাপিছু আয় ১০৪৪ ডলারে উন্নীত করেছি। প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের ওপরে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। মূল্যস্ফীতি ১১ ভাগ থেকে কমিয়ে ৭/৮ ভাগে নামিয়ে এনেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করে বর্তমানে ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রোজার মাসে খাদ্যপণ্যের দাম কমিয়েছি। এবারের ঈদে কোরবানির পশুর দাম আপনাদের ক্রয়ক্ষমতার আওতায় ছিল।’

সরকার গঠন করতে পারলে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়ে দেশে ছিল বিদ্যুতের জন্য হাহাকার। আমরা আপনাদের কষ্ট দূর করেছি। দেশে এখন বিদ্যুত্ উত্পাদন সক্ষমতা ৯ হাজার ৭১৩ মেগাওয়াট। মোট জনগোষ্ঠীর ৬০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ-সুবিধা পাচ্ছে। আপনাদের সমর্থন নিয়ে আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেব ইনশআল্লাহ।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করে আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এনেছি, যা সামনের দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। অনেক কাজ অব্যাহত আছে। রেল, সড়ক ও নৌপথের সংস্কার করা হয়েছে। নতুন রেলইঞ্জিন, বগি ও লোকোমেটিভ ক্রয় করা হয়েছে। বিআরটিসির জন্য এক হাজার নতুন বাস ক্রয় করা হয়েছে। এবারের ঈদে যাত্রীদের ভ্রমণ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আমাদের সরকার নিয়েছে যার সাক্ষী আপনারাই।’

এর আগে বক্তব্যের শুরতেই সবাইকে পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আশা করি, আনন্দমুখর পরিবেশে আপনারা ঈদুল আজহা পালন করেছেন। কয়েক দিন আগে হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হয়েছে। তাদেরও শুভেচ্ছা জানান তিনি। আজ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উত্সব প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে তাদেরকেও আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।
দেশবাসীর আনন্দ উত্সবকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করতে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সকল সংস্থাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা। আগামীতেও তাঁরা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একইভাবে কাজ করবেন বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।


আরোও সংবাদ