আমরা তোমাদের ভুলব না…

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর , ২০১৪ সময় ০৯:১৭ অপরাহ্ণ

:: মির্জা ইমতিয়াজ শাওন ::

সব কটা জানালা খুলে দাও না,/আমি গাইবো গাইবো বিজয়ের-ই গান…/ওরা আসবে চুপি চুপি,/যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ. . ./সব কটা জানালা খুলে দাও না . . .
nc 16
দুর্ভেদ্য ঐক্য আর দুর্জয় সংকল্পের নাম ১৯৭১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্র আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে একটি জনযুদ্ধের আদলে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে।

পঁচিশে মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ হত্যা করে। গ্রেফতার করা হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ প্রধান বাঙ্গালীর তৎকালীন প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। গ্রেফতারের পূর্বে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

পরিকল্গপিত গণহত্যার মুখে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধযুদ্ধ; জীবন বাঁচাতে প্রায় ১ কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, সামরিক বাহিনীর বাঙ্গালী সদস্য এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ দেশকে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর কব্জা থেকে মুক্ত করতে কয়েক মাসের মধ্যে গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে মুক্তিবাহিনী সারাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে ইতোমধ্যে পর্যদুস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান ৯৩,০০০ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এরই মাধ্যমে নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান হয়; প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙ্গালী জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

১৯৭১-এ বিজয়ের এদিনটির জন্য সে কী আপ্রাণ প্রচেষ্টা ছিল এ ভূখণ্ডের নিষ্পেষিত জনগণের। তিরিশ লাখ মানুষের আত্দাহুতি, দুই লাখ নারীর সম্ভ্রম ও আপামর জনগণের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট-ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের বিজয়, আমাদের বাংলাদেশ। স্বাধীনতার তেতালি্লশ বছরে আমরা হয়তোবা আমাদের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি লাভ করতে পারিনি। তারপরও হতোদ্যম না হয়ে বাঙালি তার অন্তর্গত সাহস ও শক্তিতে এগিয়ে গেছে। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকলেও আমরা অনেক এগিয়ে গিয়েছি। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা এগিয়ে যাবোই। আজকের বাংলাদেশ আর চলি্লশ বছর আগের সেই তলাবিহীন ঝুড়ি নেই। আমাদের ছোট ছোট অর্জনগুলো ছোট করে দেখার নয় মোটেই। আজকের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। তারা মুক্তিযুদ্ধের ফসল ভোগ করছে। তারা এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধের একেকজন যোদ্ধা। স্বপ্নের শেষ নেই। বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে। ‘৭১-এ বৃহৎ যুদ্ধে আমরা জয়লাভ করেছি। এখন ছোট ছোট যুদ্ধ করছি। উন্নয়নের জন্য যুদ্ধ। আত্দনির্ভরশীলতার জন্য যুদ্ধ। সমৃদ্ধ দেশের সারিতে দাঁড়ানোর জন্য যুদ্ধ। ছোট ছোট যুদ্ধগুলোতে আমাদের জয়লাভ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে দেশটা আমার। দেশটা আমাদের সকলের।

পেছনের হিংসা-দ্বেষ-বিদ্বেষ অনৈক্য ভুলে আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য বিনির্মাণ করতে হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। উগ্রপন্থা ও ধর্মীয় উন্মাদনাকে পাশ কাটিয়ে একটি উদার গণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাষ্ট্র আর উন্নত জাতি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে বাংলাদেশকে। আমাদের পথচলার মূলমন্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে তাদের স্মৃতিতে জাগরুক ১৯৭১-এর ভয়াল দিনগুলো। চারদিকে প্রতিরোধ যুদ্ধ, হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের গণহত্যা, অগি্নসংযোগ, লুটপাট, নারীর প্রতি অবমাননা, অকথ্য নির্যাতন এবং পৈশাচিকতা। এক কোটি মানুষকে জন্মভূমি ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মাটিতে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় গ্রহণ। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি তাদেরও অনুভবে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শানিত চেতনা। তাই তো আজ তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে বাঙময় হয়ে উঠেছে তেতালি্লশতম বিজয় দিবস। এবারের বিজয় দিবসে জাতির আকাঙ্ক্ষা, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য শুধু ব্যক্তির বিচার নয়, এ অপরাধে জড়িত সংগঠনেরও বিচার হতে হবে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের চলমান বিচার কার্যক্রম ও রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত শেষ করতে হবে।

পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ : ১৯৪৭-এর দেশভাগ ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি করলেও বাঙালির প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে আঞ্চলিক বৈষম্য অধীর করে তোলে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) নাগরিকদের। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য-ঐতিহ্যের শেকড় থেকে উন্মেষ ঘটে বাঙালি জাতীয়তাবাদের। এই চেতনা থেকে প্রদেশের স্বায়ত্তশাসনের জন্য ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবি উপস্থাপন করেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের পুরোধাপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান। এজন্য পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাকে গ্রেফতার করে সামরিক আদালতে প্রহসনের বিচার শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে ঘটে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। মামলা প্রত্যাহার করে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় শাসকগোষ্ঠী। ১৯৭০-এর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। শুরু হয় গণরায়ের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র। আসে একাত্তরের আগুনঝরা মার্চ। শাসকগোষ্ঠী বাঙালির হাতে শাসনভার ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানালে গর্জে ওঠে বাংলাদেশ। বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্রের দিশা দিয়ে সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেন বঙ্গবন্ধু মুজিব।

২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। এক রাতে ঢাকায় হত্যা করা হয় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষকে। হানাদার বাহিনী গ্রেফতার করে বাংলাদেশের নেতাকে। গ্রেফতার হওয়ার আগে পূর্বপ্রস্তুতি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে ঘোষণা করেন : ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’। স্বাধীনতার ঘোষণায় দুর্বার প্রতিরোধে জেগে ওঠে শেখ মুজিবের বাংলাদেশ। জন্ম হয় নতুন জাতির। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এরপর দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের এ-দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের নির্বিচার গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটতরাজের ন্যক্কারজনক ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুরই নির্দেশিত পথ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথ নেয় এই প্রবাসী সরকার। ডিসেম্বরের গোড়ায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় যৌথ কমান্ড। যৌথ বাহিনীর হাতে মার খেয়ে একে একে অধিকৃত এলাকা ছেড়ে ঢাকায় এসে আশ্রয় নেয় পাকিস্তানি সেনারা।

যৌথ বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিক আত্দসমর্পণের দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর তারা এ-দেশীয় ঘাতক-দালালদের নিয়ে সারা দেশে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠে। ১৬ ডিসেম্বর পৌষের কুয়াশামাখা বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দখলদার পাকিস্তানি সেনাধ্যক্ষ নিয়াজি-ফরমান আলীরা মাথা নিচু করে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর অধিনায়কদের হাতে অস্ত্র তুলে দেন। বিজিতদের আত্দসমর্পণের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় বাঙালির বিজয়। পৃথিবীর মানচিত্রে অঙ্কিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাম। বিজয় দিবসে কৃতজ্ঞ জাতি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করবে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের। আমরা তোমাদের ভুলব না।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নিউজচিটাগাং২৪ডটকম।