আন্দরকিল্লার ‘মহামায়া ভবন’ পাল্টে রাখা হয় ‘ডালিম হোটেল’

প্রকাশ:| শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর , ২০১৬ সময় ১১:২৭ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লার ‘মহামায়া ভবন’ দখল করে নাম পাল্টে রাখা হয় ‘ডালিম হোটেল’। চট্টগ্রামের আল বদর প্রধান মীর কাসেম আলীর নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সহযোগী ও স্থানীয় হিন্দুদের ধরে সেখানে নিয়ে চালানো হত অমানুষিক নির্যাতন। তখনকার সময়ে ‘ডালিম হোটেল’ এদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হয়ে উঠেছিল ‘ডেথ ফ্যাক্টরি’।

সূত্র মতে, ‘মহামায়া ডালিম ভবন’ এর মালিক ছিলেন এক হিন্দু পরিবার। তবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হিন্দু পরিবারটি ভবন ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর চট্টগ্রামের আলবদররা ভবনটি দখল করে নাম দেয় ‘ডালিম হোটেল’। তারপর সেখানে নির্যাতন ক্যাম্প পরিচালনা শুরু করে মীর কাসেম আলী। তার বিরুদ্ধে গঠন করা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১২টি নির্যাতনের এবং দুটি নির্যাতনের পর হত্যার। ১৪টি ঘটনাই ঘটেছে ডালিম হোটেলে।

মীর কাসেমের মামলার একাধিক সাক্ষীর জবানবন্দিতে জানা যায়, ডালিম হোটেলে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতনের পদ্ধতি ছিল পৈশাচিক। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষকে ধরে এনে ইলেকট্রিক শক, ঝুলিয়ে পেটানো, শরীরের বিভিন্ন স্থানে থেঁতলে দেওয়া, হাত-পা ভেঙে দেওয়া, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করা হত। কোনো বন্দী কেউ পানি চাইলে টয়লেট থেকে পানি এনে দেওয়া হতো। আবার অনেককে পানির বদলে প্রস্রাব খেতে দেওয়া হতো। তিনতলা ভবনের বিভিন্ন কক্ষে বন্দীদের উপর চলত অমানুষিক নির্যাতন।

একাত্তরে ‘ডালিম হোটেল’ নামের নির্যাতনকেন্দ্রে প্রায় মাস খানেক বন্দি ছিলেন তখনকার চট্টগ্রাম জয়বাংলা বাহিনীর উপপ্রধান মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। নভেম্বরের মাসের শেষ দিকে কদমতলীর বাড়ি থেকে তাকে ধরে এনেছিল আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। ওই নির্যাতনের বর্ণনায় তিনি জানান, ‘মীর কাসেমের উপস্থিতিতেই আলবদর বাহিনীর সদস্যরা লোহার চেয়ারে বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দিয়ে আমাদের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও তাদের অস্ত্রের বিষয়ে জানতে চাইত। নির্যাতনের সময়ে বা পরে বন্দিরা পানি খেতে চাইলে প্রস্রাব খেতে দেওয়া হতো।’

নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী জানান, মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদর সদস্যরা তাকে বেদম পেটায়। তারা লাঠি, লোহার রড ও ইলেকট্রিক তার দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিল। নির্যাতনের শিকার লুৎফর রহমান ফারুক জানান, মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে ডালিম হোটেলে নির্যাতনের কারণে পুরুষত্বহীন হয়ে পড়েন তিনি। আজীবনের জন্য তিনি সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।

ডালিম হোটেল২
ডালিম হোটেলে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসীমউদ্দিনকে নির্যাতন করে হত্যার নির্মমতা ফুটে উঠে মামলায় মীর কাসেমের বিরুদ্ধে প্রমাণ হওয়া ১১ নম্বর অভিযোগে। যে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের রায়ে মীর কাসেম মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং পরবর্তীতে আপিল ও রিভিউ রায়ে সে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে।

এই মামলার সাক্ষীদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের ছেলে জসীম ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ওই সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তাকে সে সময় সবাই কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই চিনত। ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাসেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা জসীমকে চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে আসে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা জসীমকে আটকে রেখে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়! এর সাথে আরও পাঁচজনের লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলীর রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়ে ফাসি বহাল রাখে আপিল বিভাগ। ৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা৩৫মিনিটে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মানবতাবিরোধী অপরাধের সাজা কার্যকর করা হয়েছে।