আনোয়ারা আ’লীগে মেরুকরন; প্রভাব ফেলবে নির্বাচন

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২০ এপ্রিল , ২০১৭ সময় ০৭:২০ অপরাহ্ণ

ইমরান এমি.আনোয়ারা:

আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামীলীগে চলছে নানা মেরুকরন, এডহক কমিটির সভাপতির সাথে মুখ চাওয়া চাওয়ী বন্ধ সাধারন সম্পাদকের। দিন দিন ক্ষমতাসিন আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে তৈরি হচ্ছে গ্র“প-উপ গ্র“প।
জানা যায়, প্রায় দু’বছর আগে আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামীলীগের তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক কাজী মোজাম্মেল হক সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মন্নানকে সাধারণ সম্পদাদক করে আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামীলীগের এ্যাডহক কমিটি ঘোষণা করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দীন আহমদ ও সাধারন সম্পাদক মফিজুর রহমান। কমিটি হওয়ার কিছুদিন পর একসাথে কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরীর সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ে কাজী মোজাম্মেল হক। সেই থেকে দুগ্র“পে বিভক্ত আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামীলীগ। কাজী মোজাম্মেল হকের সাথে উপজেলা আওয়ামীলীগের সদস্য কলিম উদ্দীন, তৎকালিন আনোয়ারা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ইয়াছিন হিরু, বৈরাগ ইউপি চেয়ারম্যান নোয়াব আলী, আনোয়ারা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি এম নজরুল ইসলামসহ একটি অংশ যোগ দেয়।
পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে গ্র“পিং প্রকাশ্যে রুপ নেয়, কাজী মোজাম্মেল হক তার অনুসারি বৈরাগ ইউপি চেয়ারম্যান নোয়াব আলীকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানালে তার বিরোধিতা করে উপজেলা চেয়ারম্যান গ্র“প। উপজেলা চেয়ারম্যান বৈরাগ ইউপি চেয়ারম্যান হিসাবে তদবির করে বিমান শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মো. সোলায়মানের জন্য। কাজী মোজাম্মেল হক তার অনুসারি নোয়াব আলীকে মনোনযন দেওয়ার জন্য যোগ দেয় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দীনের সাথে, তাকে সমর্থন জানান আনোয়ারার প্রয়াত আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্র আতাউর রহমান খাঁন কায়সারের কন্যা সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য ওয়াসিকা আয়েশা খাঁনম। এতে ক্ষুব্দ হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুসারিরা ইউপি নির্বাচন নিয়ে বৈঠক চলাকালে দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের কার্যলয়ের সামনে দুগ্র“পে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
পরবর্তী সময়ে কেন্দ্র থেকে কাজী মোজাম্মেল হকে অনুসারি নোয়াব আলীকে আওয়ামলীগের মনোনয়ন দিলে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করে শ্রমিক নেতা সোলায়মান । তার পক্ষে একজোট হয়ে কাজ করে উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুসারি উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি রাসেল। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুগ্র“পের সংঘর্ষে বৈরাগ ইউপিতে ফারুক নামে এক যুবলীগ কর্মীও নিহত হয়। উপজেলার ১১ ইউনিয়নে একমাত্র বৈরাগ ছাড়া সবকটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান অনুসারিরা মওনোনয়ন পান। তার মাঝে ২নং বারশতে উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুসারি এম.এ কাইয়ুম, রায়পুরে জানে আলম, বটতলী উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মন্নান, বরুমচড়ায় শাহাদাত হোসেন, বারখাইনে হাসনাইন জলিল শাকিল, সদরে অসীম কুমার দেব, চাতরীতে কাজী মোজাম্মেল হকের অনুসারি ইয়াছিন হিরু,উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুসারি পরৈকোড়ায় মামুনুর রশিদ আশরাফ, হাইলধরে ভূমিপ্রতিমন্ত্রীর একান্ত সহকারী রিদোয়ানুল করিম চৌধুরীর সায়েমের প্রচেষ্টায় মনোনয়ন পান নাজিম উদ্দীন।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কোনঠাসা হয়ে আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কাজী মোজাম্মেল হক। একই সময় এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উপজেলার প্রায় সবকটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যানদের সাথে বিরোধে জড়ায় স্থানীয় নেতারা, তার মাঝে উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি রাসেলের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে বৈরাগ ইউপি চেয়ারম্যান সোলামান, এ ইউনিয়নে তিনভাগে বিভক্ত নেতারা। রায়পুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি আমিন শরীফের সাথে ইউপি চেয়ারম্যান জানে আলম, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদকের সাথে আগেই থেকে বিরোধ দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগ নেতা এডভোকেট সালাউদ্দীন আহমদ চৌধুরী লিপু, তার ভাই উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দীন আহমদ চৌধুরী টিপু, উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহবায়ক নেজাম উদ্দীন মাসুদ, এ ইউনিয়নে তিনভাগে বিভক্ত নেতারা । উপজেলা চেযারমম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী ইউনিয়ন বরুমচড়ায়ও রয়েছে তিনটি গ্র“প-উপগ্র“প, আর এ তিন ধারায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী, বরুমচড়া ইউপি চেয়ারম্যান শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি আলী আকবর। বারখাইন ইউনিয়নে নির্বাচনে হাসনাইন জলিল শাকিল নির্বাচিত হলেও বিদ্রোহী প্রার্থী এস.এম আলমগীর চৌধুরী পরাজিত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকায প্রভাব বিস্তার করে নিজ গ্র“পকে সক্রিয় করে তোলে, বারখাইন ইউনিয়নে জেলা পরিষদ সদস্য এস.এম আলমলীগ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি গ্র“প, ইউপি চেয়ারম্যান হাসনাইন জলিল শাকিলের নেতৃত্বে একটি গ্র“প, আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনির অনুসারি প্রয়াত সাংসদ আখতারুজ্জামান বাবুর পিএস বোরহান উদ্দীন চৌধুরী মুরাদও আলাদাভাবে কার্যক্রম চালিয় যাচ্ছে। আনোয়ারা সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অসীম কুমার দেবের সাথে নির্বাচনের পূর্বে থেকে বিরোধ রয়েছে স্থানীয় নেতাদের, তার মধ্যে যুবলীগ নেতা দিদারুল ইসলাম টিপু অন্যতম। সে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়। এলাকায় তার জনসমর্থন থাকলে মনোনয়ন পাননি। টিপু দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহসভাপতি আবুল কালাম চৌধুরীর ভাইয়ের ছেলে। চাতরী ইউপি চেয়ারম্যান ইয়াছিন হিরু কাজী মোজাম্মের হকে অনুসারি হওয়ায় হারাতে হয়েছে উপজেলা যুবলীগের সভাপতির পদ, পরবর্তী সময়ে হিরু ভূমিপ্রতিমন্ত্রী সাইপুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এম.পির পি.এস রিদোনুল করিম চৌধুরী সায়েমের সাথে যোগ দিয়ে কাজ করতেছে, হিরুর সাথে বিরোধ রয়েছে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বর্ষিয়ান আওয়ামীলীগ নেতা শামসুদ্দীন চৌধুরী ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি নাজিম উদ্দীনের। হিরুর সাথে আছে চাতরীর বাসিন্দা আনোয়ারা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি এম নজরুল ইসলাম, নাজিম উদ্দীনের সাথে সাবেক উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক আইয়ুব খান, শামসুদ্দীন চৌধুরীর সাথে রয়েছে যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতারা। হাইলধর ইউপি চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দীন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর পরই বিরোধে জড়িয়ে পড়ে রিদোয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েমের সাথে। যার কারনে হারাতে হয়েছে উপজেলা শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদও। হাইলধর ইউনিয়ন মন্ত্রীর বাড়ী হওয়ায় অন্য যে কোন ইউনিয়ন থেকে এ ইউনিয়ন গ্র“পিং মুক্ত থাকবে বলে মনে হলেও সব চেয়ে বেশি বিরোধ রওয়েছে এ ইউনিয়নে। রিদোয়নুল করিম চৌধুরী সায়েমের সাথে বিরোধের পর সায়েম গ্র“পে যোগ দিয়েছে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক কলিম উদ্দীন। এছাড়া সায়েম গ্র“পে রয়েছে উপজেলা আওয়ামীলীগের সদস্য এম.এ মালেক, দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সহসম্পাদক মো. হাসান উদ্দীন চৌধুরী, উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী আনিছ। চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দীনের সাথে রয়েছে আনোয়ারা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আসহাব উদ্দীন, সাবেক ছাত্রনেতা আহকাম ইবনে জামিল মিশন, ছাত্রলীগ নেতা নাঈম উদ্দীন।
তৃনমূলের গ্র“প-উপ গ্র“পের কারণে বিভক্ত আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগেও। ১১ ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের কমিটি গঠন করা হলেও শুধুমাত্র গ্র“পিং কারনে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হচ্ছে না উপজেলা আওয়ামীলীগের। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আনোয়ারা উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবকলীগের কোন কমিটি ছিল না, রিদোয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েমের একান্ত প্রচেষ্ঠায় আনোযারা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের অনুমোদন দেয় দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ। সভাপতি হিসাবে আছে আলী আকবর, সাধারন সম্পাদক জাফর ইকবাল তালুকদার। একমাত্র স্বেচ্ছাসেবক লীগ ছাড়া সবকটি অঙ্গ সহযোগী সংগঠনে গ্র“পিং প্রকট। আনোয়ারায় স্বেচ্ছাসেবকলীগ রিদোয়ানুল করিম চৌধুরী সায়েমের সন্তানতূল্য সংগঠন হিসাবে পরিচিত। এভএব চলতে থাকলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার মূল্য দিতে হবে, কারণ গ্র“পিং কখনো দলের জন্য ভালো কিছূ বয়ে আনেনা বলেও মন্তব্য করেন তৃণমূল কর্মীরা।
কিন্তু বিষ্ময়কর হলেও সত্য তৃণমুল থেকে উপজেলা পর্যায়েও এত গ্র“প-উপ গ্র“প থাকলেও সবাই আনোয়ারা – কর্ণফুলী আসনের সংসদ সদস্য, সরকারের ভূমিপ্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের অনুসারি। এর বাইরে তারা দ্বিতীয় কাউকে নেতা বা অভিভাবক হিসাবে গ্রহন করতে নারাজ।
আনোয়ারায় উপজেলায় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ওয়াসিকা আয়েশা খানমের বাড়ী হলেও এলাকায় শক্ত কোন অবস্থান নেই তার। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও তার চাচা আনেযারুল ইসলাম খাঁন সওগাত, বরুমচড়ার আওয়ামীলীগ নেতা আবুর বশরসহ কিছু নেতা কর্মী নিয়ে আনোযারায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংম গ্রহন করে থাকেন ওয়াসিকা আয়েশা খানম।
এছাড়াও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি, অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা মহিউদ্দীনের গ্রামের বাড়ী আনোয়ারা হলেও তার কোন প্রভাব নেই আনোয়ারায়। তিনি জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতিতেই প্রাধন্য দিয়ে চলছে।
সবাই সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এম.পির অনুসারি হয়েও কেন এত গ্র“প-উপ গ্র“প জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী বলেন, আনোয়ারার আওয়ামী রাজনীতিতে কোন গ্র“পিং নেই, আমরা সবাই আমাদের অভিভাবক আলহাজ্ব সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এম.পি মহোদয়ের নেতেৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। তাহলে কেন ওয়ার্ড থেকে উপজেলা পর্যন্ত গ্র“পিং এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্র“পিং নয়, বরং মত পার্থক্য রয়েছে। মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে গেলে আমরা সবাই এক।


আরোও সংবাদ