আত্মশুদ্ধি থেকে আত্মোপলদ্ধি নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর!

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই , ২০১৪ সময় ১১:৫৭ অপরাহ্ণ

নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এ্যানেলঈদ-উল-ফিতর।

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস পবিত্র রমজান মাস বিদায় নিতে যাচ্ছে। আসছে অনাবিল আনন্দের পবিত্র ঈদুল ফিতর আসছে। ঈদ মোবারক।
“ খুশির চাঁদ উঠেছে ও ভাই ঈদ এসেছে
আনন্দে আজ মন তাই নেচে উঠেছে”
ঈদের চাঁদ উঠার সাথে সাথেই দেশের শিশু-কিশোররা আনন্দে মেতে উঠে। শেষ মূহুর্তে বেড়ে যায় মার্কেটের ভীড়। সবার মুখে মুখে হাসি আর অনাবিল আনন্দের উচ্ছ্বাস। ঈদুল ফিতরের আনন্দই মুসলমানদের জীবনে সব চেয়ে বড় আনন্দের, তাই ঈদের দিন আনন্দের দিন। যে আনন্দ কোলের শিশু থেকে ৯০ বছরের বৃদ্ধদেরও স্পর্শ করে সেই আনন্দই ঈদ আনন্দ। তাই হাসপাতালে মৃত্যু শয্যায় শায়িত ব্যক্তি থেকে কারাগারের সব কয়েদিদেরও এই আনন্দের অংশীদার করা হয়। সরকারের উদ্যোগে দেশে-বিদেশে কারাগার ও হাসপাতালে রোগী কয়েদিদের জন্য আয়োজন করা হয় বিশেষ খাবারের। আনন্দের ঈদে মিষ্টি জাতীয় খাদ্য বড় উপাদান হলেও ঈদ আয়োজনে বর্তমান সময়ে খাদ্য তালিকায় ঝালই বেশি প্রাধাণ্য ..। তাই সরকারের উদ্যোগে ঝাল মাংস আর বিরাণীর আয়োজনও থাকে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন কারাগারে ঈদের নামাজসহ বিভিন্ন উৎসব আয়োজনের উদ্যোগও নেয়া হয়। ঈদ উপলক্ষে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে বিশেষ বিবেচনায় অনেক কয়েদিকে মুক্তি দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রতি বছর দুই ঈদ উপলক্ষে বিশেষ ক্ষমায় অনেক অপরাধীকে মুক্তি দেওয়া হয়। কারাগার আর হাসপাতাল কেউ স্বেচ্ছায় যায় না। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের জন্য কাউকে কাউকে এই দুই অঙ্গনে বাসিন্দা হতে হয়। যে পরিবারের একজন সদস্য এই দুই স্থানের এক জায়গার বাসিন্দা হয় ঐ পরিবারের দুঃখ কষ্টের শেষ থাকে না। এই ঈদে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের রোগ মুক্তি ও নিষ্পাপ নিরাপরাধ কয়েদিদের মুক্তি কামনা করছি। জীবনে যারা প্রথম কয়েদি হয়েছে তাদের মধ্যে কেউ যদি এবারের ঈদে পরিবারের সবার সাথে ঈদ উদযাপনের সুযোগ লাভ করে ঐ পরিবার ও কয়েদির আনন্দের শেষ থাকবে না নিঃসন্দেহে। পৃথিবীর কোন ব্যক্তির অপরাধীর হওয়ার ইচ্ছা থাকে না, ইচ্ছে থাকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট হওয়ার। কিন্তু ক্ষনস্থায়ী জীবনে দীর্ঘস্থায়ী জীবন সংগ্রামে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের স্বীকার হতে হয় কাউকে কাউকে। অপরাধ আর অপরাধীর সংখ্যা কমানোর জন্যই আত্মশুদ্ধির এই রমজান। এই রমজান মাসকে পরমদাতা ও দয়ালূ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তিন ভাগে ভাগ করেছেন রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত। তাই মানুষের প্রতি সৃষ্টিকর্তার অসীম উপহার হচ্ছে এই রমজান। যে রমজানের মধ্যদিয়ে আমরা সত্যিকারের মানুষ হতে পারি। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাসেও আমাদের মূল্যবোধের ক্ষয়রোধ হচ্ছে না। রমজান উপলক্ষে পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশে নিত্য পণ্যের মূল্য কমলেও বাংলাদেশে কেবল বাড়ে। আত্মশুদ্ধির এই রমজানে আমাদের আত্মোপলদ্ধি হচ্ছে না বলেই বাংলাদেশে এমনটা হচ্ছে। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, রমজান ছাড়া তোমরা যত সব এবাদত কর তা সবই তোমাদের জন্য আর রমজান মাসে রোজ পালন থেকে যেসব এবাদত কর সবই আমার জন্য। এক কথায় “রোজা আমার জন্য আমি নিজেই উহার প্রতিদান দেব”। ( আল কোরআন ) যে আল্লাহ ঘোষনা দিয়েছেন প্রতিদান দেওয়ার সেই প্রতিদানের অপেক্ষাও যেন আমরা কেউ করছি না। তাই রমজান মাসেও অনেক অনাকাঙ্কিত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে যার উল্ল্যেখ করতেও বিবেক নাড়া দেয়। আমাদের সৌভাগ্য এই জন্য যে, আমরা সর্বশেষ এবং বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর উম্মত। কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় মুসলমানদের নামের আগে এখন আর মোহাম্মদ তেমন একটা সোভা পায় না। ঈদ ছাড়া কেউ কারো সাথে কোলাকুলি করি না। যেন ঈদের জন্যই এই কোলাকুলি তাই ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় কার্ডে বিজ্ঞাপনে কোলাকুলির ছবি সোভা পাচ্ছে। বাস্তব জীবনে এক মুসলমান অপর মুসলমান যেহেতু ভাই ভাই সেহেতু প্রতিদিনই যদি এই কোলিকুলির দৃশ্য চোখে পড়ত মানুষে -মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ আরো বেশি জাগ্রত হতো। নিজ জীবনের ভালো মন্দের বিচার আচার প্রয়োজন বোধ করছি না বলেই আমরা পার্থিব জীবনে আলো থেকে অন্ধকারে ধাবিত হচ্ছি।
আত্মশুদ্ধি বনাম আত্মোপলদ্ধি
আত্মশুদ্ধির জন্যই পবিত্র রমজান। তাই কোরআন, হাদিসে ও তাফসিরে রমজান মাসকে রহমতের মাস হিসেবে বর্ননা করা হয়েছে। আর এই মাস শেষে ঈদুল ফিতর যে আনন্দ নিয়ে আসে সেটাই হচ্ছে আত্ম উপলদ্ধি। তাই আত্মশুদ্ধির রমজানে আত্মোপলদ্ধি না হলে প্রকৃত সিয়াম পালন হবে কি না জানি না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের “রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ” গান নয় যেন দলিল। ধনী দরিদ্র্যের বৈষম্য কমানোর জন্যই ঈদ। পোষাক শ্রমিক ও বিভিন্ন মিল কারখানায় ঈদ বোনাস ও বেতনের জন্য আন্দোলনে নামতে হয় অনেককে। এই বছরও ব্যতিক্রম হয়নি, যেই শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে আমরা যারা আজকের শিল্পপতি সেই শ্রমিকদেও জন্য আমাদেও মানবিক মূল্যবোধের আত্মোপলদ্ধি হোক এই ঈদে। রমজান যদি আত্মশুদ্ধির হয় তাহলে ঈদ হচ্ছে আত্মোপলদ্ধি। কেবল আমোদ ফ’র্তি ও ভোগ বিলাসের জন্য ঈদ নয়। ঈদ হচ্ছে আনন্দ ভাগ করার জন্য। যে আনন্দ আমি প্রতিদিন করে থাকি যা অন্যরা করতে পারে না, যে টেবিলে আমি বসে খায়, যাদের বসার সুযোগ নেই তাদের দেখা মাত্রই বুকে জড়িয়ে ধরে ঈদ মোবারক সম্ভোধন করে যদি আমরা ঈদ পালন করতে পারি তাহলেই ঈদের পূর্ণতা পাবে আমি তাদের কথা বলছি, যারা দরিদ্র, মিসকিন ও মুসাফির এবং সমাজের সুবিধা বঞ্চিত পথশিশু। যারা বাবা-মা হারিয়ে এতিম খানায় ঠাই নিয়েছে তাদের ঘরে ডেকে আনুন আর বুকে জড়িয়ে ধরুন এবং ভাবুন আপনার প্রিয় সন্তানটি যদি এতিম হতো কেমন হবে? ভাবুন তো যদি আপনি এতিম হতেন? নিজের সন্তানের জন্য এক মার্কেটে থেকে একটা কিনলেন আবার অন্য মার্কেটে গিয়ে আরো একটি ভালো লাগল সেটাও কিনে নিলেন, তার উপর আবার আপনার সন্তানের জন্য মামা চাচাদের উপহারেরও শেষ নেই! কিন্তু বাড়ির পাশের ঐ এতিম ছেলেটি কি ঈদ জামা ক্রয় করতে পেরেছে কিনা একবার কি ভেবে দেখেছেন? তেলে মাথায় তেল দেওয়ার রীতি ঈদ উপহারের তালিকায়ও এই প্রীতি দেখা যায়! যারা পায় তারা কেবল পেতেই থাকে আর যারা পায় না তাদের শুন্য। পরম সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আপনার ভাগ্য চাকা সচল ছিল বলে জীবন সমৃদ্ধ ও স্বার্থক হয়েছে তাই কায়মনোবাক্যে পরমদাতা ও দয়ালূ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করুন আর স্বরণ করুন সে আল্লাহকে যিনি আপনাকে সম্পদশালী করেছেন। আর আপনার এই সম্পদের উপর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন গরীব, মিসকিন ও এতিমের হক রেখেছেন তাই সব সম্পদই আপনার নয়। যাকাত দিলে কখনো সম্পদের ক্ষয় হয় না বরং সম্পদ বাড়ে এবং পবিত্র হয়। বাংলাদেশে দৃশ্যমান যাকাত দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। যাকাতের শাড়ী, লুঙ্গি নিতে এসে ভীড়ের মধ্যে প্রাণ দেওয়ার ঘটনাও অনেক পূরনো। তবুও দৃশ্যমান এই যাকাতের কাপড় বিতরণে উৎসাহী মানুষের সংখ্যাই বেশি অথচ যাকাত হচ্ছে দারিদ্র বিমোচনের হাতিয়ার। কর্মসংস্থান বান্ধব যাকাত বিতরণ হলে দারিদ্রতা যতটা দূর হবে দেশ ততটা সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু কর্মসংস্থানের পরিবর্তে নাম মাত্র মূল্যে যাকাতের যে শাড়ী লুঙ্গি গুলো আমরা বিতরণ করে থাকি সে কাপড় গুলো আমাদের বাড়ির দারোয়ান ও কাজের লোকেরাও পড়ে না। সেই কাপড় কি করে যাকাতের কাপড় হয়? জাগ্রত হোক আমাদের আত্মোপলদ্ধি। এবারের ঈদুল ফিতর বয়ে আনুক সবার জীবনের অনাবিল সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি। প্রিয় দেশবাসীকে ঈদ মোবারক।