আগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে সৃষ্ট ধোঁয়াশা

প্রকাশ:| শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর , ২০১৪ সময় ১০:৩০ অপরাহ্ণ

নিয়ন্ত্রণে এসেছে কাওরান বাজারে বিএসইসি ভবনের আগ্নিকাণ্ড। কিন্তু এখনো কাটেনি আগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে সৃষ্ট ধোঁয়াশা। কেউ বলছে, সরকার আমার দেশ পত্রিকাকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতেই আগুন লাগিয়েছে। আর আজই আমার দেশ পত্রিকা অফিস অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কথা ছিল বলে জানা গেছে।

ফায়ার সার্ভিস বলছে, ইলেক্ট্রিক শর্টসার্কিট থেকে সৃষ্ট আগুন দাহ্য পদার্থে লেগে ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। তবে ২ ঘণ্টা ধরে চলা আগ্নিকাণ্ডে ১১তলা ওই ভবনে হতাহতের বা আটকা পড়ে থাকার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ফায়ার সর্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, শুক্রবার বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে অগ্নিকাণ্ডের খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। পরে দমকল বাহিনীর ১৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। বেলা ১টা ৫৬ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার কথা সাংবাদিকদের জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান।

আমার দেশের প্রতিবেদক মাহমুদা ডলি বলেন, ‘আমাদের অফিস আজ সকালে নিকেতনে শিফট করার কথা ছিল। এ কারণে নিউজরুমের কেউ সকালে অফিসে ছিলেন না। আমার কাছে ঘটনাটি রহস্যজনক মনে হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ থাকলেও অনলাইন চলছিল। কিন্তু এখন সরকার চিরতরে আমার দেশ বন্ধ করতে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেয়েছে।’

অবশ্য ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর মাহবুবুর রহমান দাবি করেন, ইলেকট্রিকাল ডিভাইস থেকেই এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। আর স্টোররুমে দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আলী আহমদ খান বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। তবে কী কারণে আগুনের সূত্রপাত তা এখনো বলা যাচ্ছে না। এটি জানতে প্রাথমিক তদন্ত টিম কাজ করছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কর্মীরা ভবনের সব স্থানেই খুঁজে দেখেছে। তাই ভবনের ভেতরে কারো আটকা থাকার সম্ভাবনা নেই।’

আগুন লাগার খবর পেয়েই এনটিভির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালু ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বারবারই এ ভবনে আগুন লাগে, আর আমি বারবারই ক্ষতিগ্রস্ত হই। তদন্ত হয় কিন্তু রিপোর্ট পাই না। তদন্ত কী হয় তা জানা যায় না। বারবার এ ভবনে আগুন লাগে কেন তা জানা দরকার। আমি সকলের দোয়া চাই।’

এর ঠিক আধাঘণ্টা পরই শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের জানান, ভবনের সিঁড়িও ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ত্রুটি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পরই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মাহসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে রহস্য আছে। এটা কোনো স্বাভাবিক অগ্নিকাণ্ড নয়।’

আমু এবং ফখরুলের পরপরই বিএসইসি ভবন পরিদর্শনে যান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের সরঞ্জামের স্বল্পতার কারণে আগে নয় তলার ওপরে গিয়ে আগুন নেভানো সম্ভব হতো না। এখন সরঞ্জাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে আজকের ঘটনা ১১ তলায় হলেও কম সময়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।’ কারো গাফিলতির কারণে আগুন লেগেছে কি না সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে বিএসইসি চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরী শিল্পমন্ত্রী আমুর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘সিঁড়ি দুর্বল থাকতে পারে। তবে তা ত্রুটিপূর্ণ ছিল না। ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। রিপোর্ট পেলে সব কিছু জানা যাবে।’

ভবনটির দশম তলায় ‘তানজিম আলম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি ল ফার্ম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ব্যারিস্টার তানজিমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘শর্টসার্কিট হলে স্পার্ক করার যে রকম শব্দ হয়, তেমন আওয়াজ পেলাম হঠাৎ। এরপর আমার দেশের দারোয়ান নেমে এসে চিৎকার করে সবাইকে নেমে যেতে বলে। ধোঁয়া দেখে তাড়াতাড়ি আমরা সবাই নেমে পড়ি। আগুন লাগার পর ভবনের ১১ তলা থেকে প্রচুর কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এরপর পুরো এলাকায় আকাশে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সর্ভিস কর্মীরা এসে সামনে ও পেছনে দুটি মই লাগিয়ে পানি ও ফোম ছিটাতে শুরু করেন।’

বিএসইসি ভবনটিতে যেসব প্রতিষ্ঠান ছিল: নিচতলায় এবি ব্যাংক, দ্বিতীয় তলায় ইস্টার্ন টিউবস ও ন্যাশনাল টিউবস, তৃতীয় তলায় ইস্টার্ন ক্যাবলস, চতুর্থ তলায় বাংলাদেশ ইস্পাত ও স্টিল করপোরেশন, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় আরটিভি, সপ্তম, অষ্টম ও নবম তলায় এনটিভি এবং দশম তলায় তিনটি সরকারি-বেসরকারি অফিস- আমার দেশের গোডাউন ও স্টোর রুম এবং ব্যারিস্টার তানজিমুল আলমের চেম্বার।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এই ভবনে আগুন লেগে এনটিভি, আরটিভি ও আমার দেশসহ ১০টি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় পুড়ে যায়, মৃত্যু হয় তিন জনের।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই আমলে দেশের যেসব বিত্তবানদের জ্ঞাত আয়বহির্ভুত সম্পত্তি নিয়ে তদন্তে নামে সরকার তার মধ্যে এনটিভির মালিক বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক হোসেন ফালু ছিলেন অন্যতম। সরকারি তদন্ত এড়াতে পরিকল্পিতভাবে ওই সময় বিএসইসিতে এনটিভি কার্যালয় আগুন দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অপর দিকে, উচ্চা আদালতের সমালোচনা করে প্রতিবেদন ছাপা ও গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে এর কর্মীদের ‘নাস্তিক’ বলে উসকানিমূলক প্রচারণা চালানোর অভিযোগে গত বছরের এপ্রিলে বিএনপিপন্থি পত্রিকা আমার দেশের প্রেস সিলগালা করে সরকার। পত্রিকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা না হলেও অঘোষিতভাবে এটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে পত্রিকাটি অনলাইন সংস্করণ চালু রয়েছে।