আকাশ রাঙালো ফানুস

প্রকাশ:| সোমবার, ২৬ অক্টোবর , ২০১৫ সময় ০৯:২৯ অপরাহ্ণ

ওয়াগ্যায়াই পোয়ে অনুষ্ঠানের শেষ দিনে ফানুসের আলোয় আলোকিত রাতের আকাশগোধূলির সূর্য অস্ত গেছে। আলো-আঁধারি ঘিরে ধরছে নগরীকে। পূর্ণিমার চাঁদ তখনও দ্যুতি ছড়ায়নি। আকাশে হঠাৎ তারাদের খেলা। একেক রঙ ও ঢঙের তারা যেন নিচ থেকে আকাশের দিকে উড়ছে, আর মনের আনন্দে খেলা করছে। অপরিচিতদের কাছে ঘটনাটি রীতিমতো কৌতূহলের। আকাশে খেলে বেড়ানো এসব তারা আর কিছু নয়, এগুলো ‘ফানুস’। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অন্যতম ধর্মীয় উত্সব। পূর্ণিমা তিথিতে আসে প্রবারণা উৎসব। অনেকে এই উৎসবকে আশ্বিনী পূর্ণিমাও বলেন। কাল থেকে সন্ধ্যায় সবকটি বৌদ্ধ বিহারে একযোগে শুরু হবে শুভ প্রবারণা উৎসব । আজ চট্টগ্রাম বিভাগের বেশ কিছু বৌদ্ধ মন্দিরে ফানুস উড়ালেও, কাল থেকে চট্টগ্রামের সবকটি বৌদ্ধবিহারসহ পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী একসঙ্গে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করবে প্রবারণা উৎসব।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা জানান, গৌতম বুদ্ধের জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও পূর্ণিমাকে ঘিরেই তাদের উৎসব ও পূজা-পার্বণগুলো আবর্তিত। তার মধ্যে বৈশাখি পূর্ণিমা, আষাঢ়ি পূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা, মাঘি পূর্ণিমা উল্লেখযোগ্য। প্রবারণা পূর্ণিমায় শীল গ্রহণ, পিণ্ডদান, বুদ্ধ পূজা, প্রদীপ পূজা ছাড়াও একটা বিশেষ আনন্দের উৎসব হচ্ছে আকাশে ফানুস ওড়ানো। ফানুস আকাশে ওড়ানোর ধর্মীয় যুক্তিটি হচ্ছে, সিদ্ধার্থ গৌতম যখন সংসার ত্যাগ করে বেরিয়েছিলেন, তখন নিজের মাথার চুল নিজে কেটে এই বলে সত্যক্রিয়া করেছিলেন, ‘আমি যে উদ্দেশ্যে সংসারধর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করছি, সে উদ্দেশ্য যদি পূর্ণ হয় তবে আমার এ চুলগুচ্ছ নিচে না এসে ঊর্ধ্বে উড়ে যাবে।’ এই বলেই তিনি আকাশের দিকে স্বীয় চুলগুচ্ছ ছুড়ে দেন। চুলগুলো আকাশে উড়ে জানান দেন তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। এরই আলোকে আশ্বিনী পূর্ণিমায় বা প্রবারণা পূর্ণিমায় বৌদ্ধরা বিহারে সমবেত হয়ে আকাশে গৌতমের চুলধাতুকে পূজা করে আকাশপ্রদীপ জ্বালানো বা ফানুস ওড়ানোর মাধ্যমে।

ফানুসের আকৃতি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। সাদা অথবা রঙিন চীনা কাগজ দিয়ে এটি বানানো হয়। সাধারণত দু’ধরনের ফানুসের মধ্যে একটিকে ‘ডোল’ ও অন্যটিকে ‘মোটকা’ বলা হয়। ডোলের ক্ষেত্রে মুখের চারপাশে বাঁশের চটার (চাকতি) বের দেয়া হয় এবং আগুনের জন্য বেড়ের আড়াআড়ি তামার তার লাগিয়ে মাঝখানে মোমমিশ্রিত বাতি (কাপড়ের সালতা) লাগানো হয়। ফানুসের সাইজ বড় হলে ডোলের ক্ষেত্রে চাকতি লাগবে দুটি— একটি মাঝখানে আর অন্যটি যথারীতি মুখে। তবে আগুন শুধু মুখের চাকতিতে লাগানো হয়। মোটকাতে ডাবল চাকতির প্রয়োজন হয় না। ডোল ও মোটকা ছাড়াও বিমান, হাতি, ঘোড়া, হরিণ, বালিশ সদৃশ অভিনব ফানুস ওড়ানো হয়।

প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে এক মাসব্যাপী প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে দানোত্তম কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এতেও অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ানো অন্তর্ভুক্ত থাকে।
খাগড়াছড়িতে প্রবারণা পূর্ণিমা পালিত : খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, বৌদ্ধ ভান্তেদের দীর্ঘ তিন মাসের বর্ষাবাস (উপোস) শেষে পার্বত্য অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা গতকাল প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপন করছেন। শহরের কল্যাণপুর বৌদ্ধ বিহার, ধর্মপুর আর্য বন বিহারসহ চাকমা ও বড়ুয়া সম্প্রদায়ের মানুষরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দিবসটি অতিবাহিত করছেন। বৌদ্ধদের মধ্যে মারমারা আগামীকাল এই পূজা পালন করবেন।
এ উপলক্ষে বিহারে বিহারে বুদ্ধ পূজা, সংঘদান, অষ্ট পরিষ্কার দান করা হয়। দায়ক-দায়িকারা মোমবাতি জ্বালিয়ে বুদ্ধকে স্মরণ করেন।
কল্যাণপুরে বিহারের অধ্যক্ষের সভাপতিত্বে ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা প্রধান অতিথি ছিলেন। সন্ধ্যায় বিশেষ প্রার্থনা ও ফানুস উত্তোলন করা হবে।