অরণ্য সুন্দরী রাঙ্গামাটি

mirza imtiaz প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি , ২০১৯ সময় ১১:২২ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ঋতুর পালা বদলে আসে শীত। শীতকালকে বলা হয় পাহাড় ভ্রমণের আদর্শ সময় তাই শীতকালে রাঙ্গামাটির হাজার পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে। কুয়াশা মাখা হিমেল পরিবেশ প্রকৃতিকে আরো নবীন করে তোলে। তাই এই শীতে শতশত গাড়ির যান্ত্রিক কোলাহলে ধ্যান ভাঙে গুরুগম্ভীর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের শহর রাঙামাটির। সারাটা শীত মৌসুম জুড়ে যেন উৎসব লেগে থাকে এই ছোট্ট পাহাড়ী মফস্বল শহরটিতে। ১০টি ভাষাভাষীর ১১টি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক কৃষ্টির সংস্পর্শে আসতে হলে আপনাকে শীত মৌসুমেই আসতে হবে রাঙামাটি। রাঙ্গামাটি বেড়াতে এলে হাতে অন্ততঃ দুই দিন সময় নিয়ে আসবেন। তা না হলে ভ্রমন অপূর্ণ রাখার যন্ত্রণা নিয়েই কিন্তু ফিরতে হবে। চলুন দেখে নেই রাঙ্গামাটির দর্শনীয় স্থানসমূহ কি কি ও তাদের বিস্তারিত বর্ণনা।

##ঝুলন্ত ব্রীজ
চট্রগ্রাম থেকে ৭৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাঙ্গামাটি হলো দেশের অন্যতম জনপ্রিয় স্থান। কাপ্তাই লেকের উপর অবস্থিত ঝুলন্ত সেতু র জন্য রাঙ্গামাটির রয়েছে বিশেষ খ্যাতি। বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণ এই ঝুলন্ত সেতুটি দেখতে প্রতিবছর প্রচুর পর্যটক রাঙ্গামাটিতে আসেন।

##উপজাতি জাদুঘর
রাঙ্গামাটি শহরের প্রবেশ দ্বারে সহজেই দৃষ্টি কাড়ে যে স্থাপত্যটি সেটিই উপজাতীয় যাদুঘর। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠালগ্নে এতদঞ্চলের বিভিন্ন জাতিসত্তার নৃতাত্ত্বিক নিদর্শন সামগ্রি নিয়ে সীমিত পরিসরে এ যাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে নতুন ভবন নির্মিত হলে তা আরো সমৃদ্ধ হয়। এ যাদুঘরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জাতিসত্তাসমূহের ঐতিহ্যবাহী অলংকার, পোষাক-পরিচ্ছদ, বাদ্যযন্ত্র, ব্যবহার্য তৈজষপত্র, অস্ত্র-শস্ত্র, প্রাচীন মুদ্রা, প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ, পুঁতিপত্র, তৈলচিত্র ও উপজাতীয় জীবনধারার বিভিন্ন আলোকচিত্র রয়েছে। এসব সংগ্রহ দেখে জাতিসত্তাসমূহের জীবনাচার, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা যায়। জাদুঘরটি সবার জন্য উন্মুক্ত।

কিভাবে যাবেন
রাঙ্গামাটিতে আপনি বিভিন্নভাবে পৌছাতে পারেন। রাঙ্গামাটিতে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ হানিফ, ইউনিক, সাউদিয়া, এস আলম, শ্যামলী ইত্যাদি। প্রায় ৬০০/- টাকা ভাড়ায় ৭ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টায় আপনি ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটিতে পৌঁছে যাবেন। শ্যামলী পরিবহনের একটিমাত্র এসি বাস ছাড়া রাঙ্গামাটিতে কোন এসি বাস চলাচল করেনা।
এছাড়া আপনি ঢাকা থেকে চট্রগ্রামে বাসে যেতে পারেন এবং সেখান থেকে বাসে করে রাঙ্গামাটিতে পৌছাতে পারেন। তবে, ঢাকা থেকে বাসে করে সরাসরি রাঙ্গামাটিতে যাওয়াই সহজতর হবে। উল্লেখ্য চট্টগ্রাম থেকে রাঙ্গামাটি আসার জন্য পাহাড়িকা বাসটি সবচেয়ে জনপ্রিয়।

##চেস্টা করববেন ১০ টার ভিতরের বাস ধরার। সকাল ৮.৩০ ও ১০.৩০ এই দুই সময়ে কাপ্তাই হতে বিলাইছড়ির লোকাল বোট ছেড়ে যায়। ১০ টার বাসে আসলেলে সহজেই ধরতে পারবেন। এখানের ট্রেইল গুলো খুব সময়সাপেক্ষ ও যথেষ্ট পরিশ্রমের তাই সকাল সকাল রওনা হয়ে যাওয়াটাই ভালো।বোটে ঊঠার আগে ফিরতি টিকেট করে নেয়া ভালো। এখান থেকে ঢাকার শেষ বাস ৮.৩০ এ ছেড়ে যায়। হালকা নাস্তা করে নৌকায় উঠে পড়ুন। একেবারে যথা সময়ে নৌকা ছেড়ে যাবে।
বোটে ভাড়া নিবে ৫৫ টাকা। আর বোট রিজার্ভ নিলে ভাড়া পড়বে ১০০০-১৫০০ টাকা(দামাদামির উউপর নির্ভরশীল)।১.৫-২ ঘন্টার মতো লাগে বিলাইছড়ি যেতে।
যেতে যেতে কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য আপনি না চাইলেও আপনাকে বিমোহিত করবে এবং হালকা হিমেল হাওয়া খুব সুন্দর ঘুমের আবেশ দিবে। পথে আর্মির প্রথম চেকপোস্ট পড়বে। সেখানে বৈধ পরিচয়পত্র দেখাতে হবে।
*এখানে বলে রাখা ভালো-সবার জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলে সবথেকে সুবিধা। অন্যথায় কলেজ/ভার্সিটি আই,ডি,কার্ড বা জন্মসনদ/পাসপোর্ট এর ফটোকপি সাথে রাখুন। প্রত্যেকের জন্যই লাগবে।
বিলাইছড়ি যেয়ে সোজা হাসপাতাল ঘাটের দিকে চলে যান। এখানে হোটেল বলতে নিরিবিলি হোটেল এন্ড রিসোর্ট নামে একটি হোটেল রয়েছে।সেখানে রূম ঠিক করে নিন। ৪ জনের রুম ৫০০ টাকা,দুই জনের রুম ৩০০ টাকা(ফিক্সড)। এরপরে দুইদিনের জন্য বোট ঠিক করে নিন। তিনটা ঝর্নার জন্য বোট ভাড়া পড়বে ২৫০০ টাকা।
*আমরা যে বোট নিয়েছিলাম তা ওখানের তুলনামূলক বড় বোট ছিলো। মাঝিও খুব ভালো আর বন্ধুসুলভ। ২০ জনের মতো যাওয়া যাবে। সুবিধার্থে
রওনা হবার আগে ভাতঘর নামে ওখানেই একটা হোটেল আছে সেখানে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিন।
দুপুরে আমরা ডিম ভাজি,আলু ভর্তা,ডাল,ভাত এর অর্ডার দিয়েছিলাম। খরচ ৬৫ টাকা।
নৌকায় উঠে পড়ুন। সাথে হালকা শুকনা খাবার নিতে পারেন। ৩০ মিনিটের যাত্রার পর মুপোচ্ছড়া ট্রেইলের মাথায় চলে যাবেন। এখান থেকে গাইড নিতে হবে। এখানে গাইডের খরচ ৫০০ টাকা এটা মোটামুটি ফিক্সড। হাঁটা শুরু করে দিন। ১.৫-২ ঘন্টার মতো লাগতে পারে মুপ্পোছড়ায় পৌঁছাতে (গ্রুপের ট্রেকিং অভিজ্ঞতা ও স্পিডের উপরে নির্ভরশীল)। পথে ন’কাটা ছড়া ঘুরে যাবেন। মুপোচ্ছড়ার পৌছানোর পর দেখবেন কিভাবে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। বিস্তৃত বিশাল এক ঝর্ণা। এখানে যতক্ষন ইচ্ছা জমপেশ গোসল দিয়ে নিন।
ফিরতে ফিরতে দুপুর পার হয়ে যাবে। গিয়ে খেয়ে নিন এবং বিকেলে মাঝিকে নিয়ে এলাকা ঘুরে দেখতে পারবেন। আশেপাশে অনেক সুন্দর সুন্দর স্থান আছে। নৌকা ঠিক করার সময় মাঝির সাথে কথা ঠিক করে নিতে হবে সেক্ষেত্রে। এর জন্য কিছু বখশিশ বা অতিরিক্ত টাকা সে দাবী করতে পারে।
রাতের খাবারে আমরা মুরগি,আলু ভর্তা,ডাল, ভাত খেয়েছিলাম। খরচ জনপ্রতি ১১০ টাকা।
ধুপপানির ট্রেইল অনেক দীর্ঘ তাই খুব সকালে রওনা দিতে হয়। চেস্টা করবেন ভোর ৬-৬.৩০ এর মধ্যে বেরিয়ে পরতে। সকালের নাস্তার জন্য রাতেই আমরা ভুনাখিচুড়ি ও ডিমভাজির অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। জনপ্রতি ৬০ টাকা করে তারা প্যাকেট করে সকালেই দিয়েয়ে দেয়। ব্রেকফাস্ট ও সাথে শুকনা খাবার ও পানি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। হোটেলে বললে তারাই কলসিতে টিউবওয়েল এর পানি দেয় অথবা কিনে নিতে পারেন।
পথে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আর্মি ক্যাম্প পড়বে। সেখানে পরিচয়দান পর্ব আবার পুনরাবৃত্তি করতে হবে।
২ ঘন্টার মতো জার্নি শেষে ধুপপানি ট্রেইলের মাথায় পৌঁছাবেন। সেখান হতে ছোট ডিঙি নৌকায় করে ২০ মিনিটের একটা পথ পারি দিতে হয়। এখানে নোকাপ্রতি ৩০০ টাকা দিতে হবে। ৪-৫ জন করে বসা যাবে। গ্রুপ হিসেবে এখানে ধুপপানি ট্রেইল সংস্কার এর জন্য ২০০ টাকা চাঁদা দিতে হবে এবং ৫০০ টাকা দিয়ে গাইড নিতে হবে।
এর পর শুরু দীর্ঘ পথচলার। বৃস্টি হলে পথটা যেনো আরো দীর্ঘ হয়ে যায়। দোয়া করবেন যেনো বৃস্টি না হয়। তাহলে পথ এত কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল হয়ে যায় যে আপনার মনে দুই একবার সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করার বোধোদয় হতে পারে! দুটি পাহাড়ে উঠা লাগবে। চলার পথে সাবধানতা অবলম্বন করুন নাহয় অসংখ্যবার ধপাস ধপাস শব্দ শোনার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। চাইলে অডোমস মেখে নিতে পারেন। এখানে যেতে যেতে বিশালাকার কিছু মশক-মশকী আপনার দৃস্টি আকর্ষণ করতে পারে। ১.৪৫-২ ঘন্টার মতো অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে ধুপপানি পাড়ায় পৌঁছাবেন। সভ্যতা থেকে অনেক দূরের এই পাড়ায় ৫-৬ টা ফ্যামিলি কীভাবে জীবনধারণ করে সেটা ভেবে ভেবে চাইলে পথের ক্লান্তিটা দূর করার কিছু চেস্টা করতে পারবেন। এখানে একটা দোকান আছে সেখানে চাইলে হালকা কিছু খেয়ে নিবেন। এর পর ২৫-৩০ মিনিটের খাঁড়া একটা ঢাল আছে। কিছুদূর নামার পরেই আপনি ধুপপানির রাজকীয় গর্জন শুনতে পারবেন। এই গর্জনরত ঝর্না আপনার বাকিটা পথচলাটায় আপনার সহচর হিসেবে থাকবে।
প্রথম দেখায় প্রেম বলতে যদি আদৌ কিছু থেকে থাকে তাহলে তার প্রকৃত স্বাদ পাবেন আপনি ধুপপানির প্রথম রুপ দর্শনে। রুপে-গুনে-সৌন্দর্য্যে এই ঝর্না নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ক্ষনিকের জন্য হারিয়ে যান এই অপার সৌন্দর্য্যে। লুফে নিন যতটা পারেন। স্মৃতিতে গেঁথে নিন অমূল্য গাঁথা।
*এখানে বলে রাখা ভালো ধুপপানি হচ্ছে এক বৌদ্ধ বিক্ষুর তীর্থ স্থান। তিনি সপ্তাহে ছয়দিন ধ্যান করেন( রবিবার বাদে)। তাই এখানে এসে চিল্লাপাল্লা ও উচ্চবাচ্য করবেন না।
_
বিকেল ৪.৩০ টায় বিলাইছড়ি থেকে কাপ্তাই এর শেষ লোকাল বোট ছেড়ে যায়। এটা ধরতে হলে ধুপপানি থেকে আগেভাগেই চলে আসুন। নতুবা আস্তেধীরে এসে রিজার্ভ বোট নিয়ে কাপ্তাই চলে যেতে পারবেন। যাওয়ার আগে হালকা খাবার-দাবার সেড়ে নিন। আমরা বোট মিস করেছিলাম দেখে রিজার্ভ এসেছিলাম কাপ্তাই। আর কাপ্তাই থেকেও বাস মিস করায় চিটাগাং পর্যন্ত সিএনজি তে এসে পরে বাস ধরা লাগছে। এ কারণে এখানে আমাদের খরচ একটু বেশি গেছে।

##রাইখ্যং লেক
বাংলাদেশে খুব কম লেক রয়েছে যেগুলোকে নামকরা পর্যটন স্পট হিসেবে বলা যায়। সারাদেশে পর্যটকদের তীর্থস্থান বলা যায় এমন লেকের সংখ্যা খুবই কম। প্রায় ১১৬৫ ফুট উঁচুতে অবস্থিত রাইখং লেককে বলা চলে তেমনই একটি তীর্থস্থান। স্থানীয়রা অনেকে লেকটির নাম রাইচং বলে উচ্চারিত করে। তবে লেকটির নামের উচ্চারণ যাই হোক না কেন এতে করে লেকের সৌন্দর্য কোন অংশেই কমবে না।
রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত হলেও ভৌগলিক অবস্থানের কারনে এই লেকে আপনাকে বান্দরবানের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। রাঙ্গামাটি জেলার শেষপ্রান্তে অবস্থিত এই লেকে রাঙ্গামাটি দিয়ে পৌছাতে হলে আপনাকে জলপথ পাড়ি দিতে হবে তাই বান্দরবান দিয়ে যাওয়াই হবে সবচেয়ে সহজ। তবে আপনি যেভাবেই যান না কেন সাথে করে অবশ্যই একজন গাইড রাখবেন।
লেকের পূর্বতীরে এবং পশ্চিমতীরে দুটি গ্রাম দেখতে পাবেন যেগুলো পুকুরপাড়া নামে পরিচিত। হয়তোবা চারপাশে লেকের উপস্থিতির কারনেই গ্রামের এমন নামকরণ। দুটি গ্রামের অধিবাসীরাই ত্রিপুরা গোত্রের এবং তাঁরা খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী। লেকের পশ্চিম তীরের গ্রামবাসীদের পাহাড় বেয়ে উঠা

##মুপ্পোছড়া ঝর্ণা
মুপ্পোছড়া ঝর্ণা রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার বাঙ্গালকাটা নামক জায়গায় অবস্থিত।[১]মুপ্পোছড়া ঝর্ণাটিতে একটি মাত্র ঝরা থাকলেও প্রস্থের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় ঝর্ণা।

অবস্থান
রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলাটি কাপ্তাই লেকের প্রান্তে অবস্থিত। সড়ক পথে এই উপজেলার সাথে কোন সংযোগ পথ নেই। কাপ্তাই উপজেলা হতে শুধুমাত্র নৌ-পথে এই উপজেলায় পৌছানো সম্ভব। দূর্গম পার্বত্য এলাকা হিসাবে এই উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য ছোট বড় পাহাড়, আর রয়েছে ছোট বড় প্রচুর ঝর্ণা। বিলাইছড়ি চাকমা শব্দ থেকে উৎপত্তি। চাকমা উপজাতীয় অর্থে বিলাই এর অর্থ বিড়াল আর ছড়ি এর অর্থ পাহাড় হতে প্রাবাহিত ঝর্ণা বা ছড়া। মুপ্পোছড়া ঝর্ণাটি বিলাইছড়ির অন্যতম বৃহত্তম ঝর্ণা। এটির অবস্থান বাঙ্গালকাটা স্থানটিতে বিলাইছড়ি হতে নৌ পথে যাওয়া সম্ভব। আর বাঙ্গালকাটা হতে মুপ্পোছড়া ঝর্ণা শুধুমাত্র পায়ে হেটে যাওয়া সম্ভব।

বিশেষ নির্দেশিকা
বিলাইছড়ি উপজেলাটি পার্বত্য অঞ্চলের অংশ হওয়ায় স্থানটিতে বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের মানুষ প্রবেশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়পত্র, কিংবা পাসপোর্টের ফটোকপি, কিংবা যে কোন পরিচয়পত্র সাথে থাকতে হয়, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রদর্শন সাপেক্ষে ওই সকল এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়।

##সাজেকের পাদদেশে কমলক ঝর্ণা
পাহার আর ঝর্ণা দেখার মজাই আলাদা। লোভটা সামলানো যায় না। তাইতো এসো ঘুরে দেখি বাংলাদেশ-এর শওকত হোসেনের আহ্বানে যখন সাড়া দিলাম তখন তিনিও একপটে আমাকে যুক্ত করে নিলেন। এবারের ভ্রমণ খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেক; দীঘিনালা-লংগদু হয়ে রাঙ্গামাটি অনেকটা অন্যান্য ভ্রমণের চেয়ে আনন্দদায়ক তো বটেই এবং বিশাল অভিজ্ঞতার ভান্ডার।

ঢাকা থেকে ১২ জনের টিম রাতের বাসে রওনা দিয়ে আমরা ভোরেই পৌঁছে গেলাম খাগড়াছড়ি। শাপলা চত্ত্বরে নাস্তা সেরে চাঁন্দের গাড়ি চড়ে আলুটিলার রহস্যময় সুড়ঙ্গ, বৌদ্ধবিহার, রিছাং ঝর্ণা, অপু ঝর্ণা ও জেলা পরিষদের পার্ক দর্শন শেষে দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি-কাসলং-মাসালং পথ ধরে সাজেকে। সমতল ভূমি শেষ হয়ে যখন পাহাড়ের চড়াই-উৎরাই শুরু তখনই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। যতই পথচলা ততই সবুজের সমারোহ। ভয়ংকর টানিং আর আঁকাবাঁকা সর্পিল পথ; প্রায় ৬০ ডিগ্রি খাঁড়া ঢাল বেয়ে নিচে নামা, কিংবা ওপরে ওঠার সময় যতটা রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে ততটা মনে হয়েছে অ্যাডভেঞ্চার। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১৮শ ফুট উঁচুতে সাজেক ভ্যালি। এখানে মূলত রুইলুই ও কংলাকদের বসতি। রাঙ্গামাটির জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক একটি ইউনিয়ন। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পাংখোয়াদের বসতি এখানে। বিকালে সাজেকের সূর্যাস্ত আর সকালে সূর্যদয় সেই সাথে মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলা শেষে কিছু সময় রয়েছে আমাদের হাতে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম সাজেকের পাদদেশে অবস্থিত কমলক ঝর্ণা দেখার। যার আরেক নাম পিদাম তৌসা। ঝর্ণায় যাওয়ার পথের প্রাথমিক ধারনা নিতে গিয়ে ছটকে পড়লেন আমাদের ৬ সদস্য। গহীন পাহাড়ী জঙ্গল, সোজা নিচে নেমে যাওয়া আবার উঠা, তার মধ্যে জোঁকের আক্রমণ তাই দ্বিমত। রুইলুইপাড়ার কংলাক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছন দিয়ে পাহাড় থেকে সে পথটি নিচে নেমে গেছে এটা দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু তবে সাজেকের ২ নাম্বার হেলিপ্যাডের পাশ থেকেও কমলক ঝর্ণায় যাওয়া যায়। রুইলুইপাড়ার বিতরাম দা’র সহযোগিতায় তারই বাবা শুদ্ধ বসন ও তার ৬ বছরের ছেলে মনেদ বাবুকে নিয়ে আমিসহ টিম লিডার শওকত হোসেন, সিদ্দিকুর রহমান, নেপাল পন্ডিত, কার্তিক বিশ্বাস ও ইরফান আহম্মেদ রওনা হলাম।

পাহাড়ের এলোমেলো ঝোপঝাড় সামনে থেকে সরিয়ে আমাদের যাওয়ার রাস্তা সুগম করতে ব্যস্ত গাইড শুদ্ধ বসন তারপাশেই ৬ বছরের শিশু মনেদ বাবু। দাদার সঙ্গে বায়না ধরেছে সঙ্গে যাবে তাই সেও এপথের যাত্রী। প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর কানে পর্দায় ভেসে আসলো পানি পড়ার ঝিরঝির শব্দ। মনে হলো এই বুঝি কমলক ঝর্ণা। না, গাইড থামিয়ে দিয়ে বললো এটা ঝিরি। পেছন থেকে ইরফান ভাইয়ের আহ্বান, গাইড দাদা আমরা নামতে পারছি না আমাদের লাঠির ব্যবস্থা করে দিন। সত্যিই খাড়া পথে লাঠি ছাড়া নামা দুস্কর। গাইডও কিছুটা বিরতি নিয়ে আমাদের সবার হাতে বাঁশের লাঠি ধরিয়ে দিল। হাঁটার মাঝে অনুভব করলাম শুধু পাহাড় থেকে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছি তো যাচ্ছি কিন্তু ওঠার সময় ওঠবো কি করে? মনের মধ্যে একটা অজানা আতংক রয়ে গেল। আধা ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে আবিস্কার করলাম উড়ান থেকে বেয়ে আসা পাহাড়ী জলের। বিশাল প্রস্থ ঝিরি বেয়ে নিচের দিকে পানি নেমে যাচ্ছে ছোট বড় পাথরের বাঁধা ডিঙ্গিয়ে। ভেবেছিলাম যেদিক থেকে পানি গড়িয়ে আসছে সেদিকে ঝর্ণা হবে। কারণ এতো পানির স্রোত অবশ্যয় ঝর্ণা থেকে আসছে। না, এখানেও বিপত্তি, গাইড বললো, গড়িয়ে পড়া জলের পথ ধরেই আমাদের এগুতে হবে। একতো পিচ্ছিল পথ তার উপর বিশাল পাথরের গাঁয়ে নিজের গাঁ লাগিয়ে একটা পাথর থেকে নেমে আসা আবার আরেকটা পাথরে উঠা কি যে কষ্ট হচ্ছিল বলে শেষ করা যাবে না। একে অপরের সহযোগিতা নিয়েই এপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। ঝিরি পথের মাঝখানে গাইড আমাদের থেমে দেয় বলে সামনে এগুনো যাবে না; কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটু সামনে থেকে পানি খাড়া নিচে পড়ে যাচ্ছে যা কমলক ঝর্ণা। তবে আমাদের আরেকটা পাহাড় বেড়ে উপরে উঠে আবার নিচে নামলেই ঝর্ণার দেখা পাবো। যে কথা সেই কাজ। আবার পাহাড়ে ওঠা। হঠাৎ আমার চোখ পড়লো নিজের পায়ের দিকে; জোঁকের আক্রমণ দেখে শরীরে শিহরণ জাগলো, মনে উদয় হলো ভয়। পেছনে থাকা সিদ্দিক ভাই তার কৌশল প্রয়োগ করে একটু শান্তি দিলো। কিন্তু একটা অজানা ভয় দেহের মধ্যে বাসা বেঁধে নিলো। জোঁকের অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়নি সিদ্দিক ও ইরফান ভাই, গাইড শুদ্ধ বসন ও ৬ বছরের মনেদ বাবু। ভাগ্য ভালো সকাল থেকে বৃষ্টি হয়নি যদি বৃষ্টি হতো তাহলো জোঁকের প্রচুর আক্রমণ আমাদের সহ্য করতে হতো। প্রায় ৫৫ মিনিট পর দেখা পেলাম কমলক ঝর্ণার। শীতল বাতাসে বেসে আসা হিমেল জলের স্পর্শে দেহ-মন প্রশান্তি পেল। আধা ঘন্টা ঝর্ণায় দাপাদাপির পর পা বাড়ালাম ফিরতে পথের। নেমে যাওয়া পথে উঠে আসা যে কত কষ্টের তা অবলোকন করতে হলে পাড়ি দিতে হবে কমলক ঝর্ণার পথ। প্রায় তিন ঘন্টা সময় অতিবাহিত করে একটি ক্লান্ত দেহ নিয়ে নিজেকে পুনরায় আবিষ্কার করলাম রুইলুই পাড়ায়।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি বিভিন্ন বাস সার্ভিস আছে। ভাড়া ৫৫০-৬০০। ঢাকা থেকে শান্তি পরিবহনে দীঘিনালাও যাওয়া যায়। খাগড়াছড়ি শাপলা চত্ত্বর অথবা দীঘিনালা থেকে চাঁন্দের গাড়ি অথবা মোটরসাইকেলে সাজেক যাওয়া যায়। চাঁন্দের গাড়ির ভাড়া ৩ হাজার ৫০০-৪ হাজার টাকা (যাওয়া-আসা), মোটরসাইকেলে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।
কোথায় থাকবেন

যতই দিন যাচ্ছে সাজেকে থাকার ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে। এখানে আদিবাসীদের ঘরেও রাত্রিযাপন করা যায়। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এছাড়াও খাগড়াছড়ি ও দিঘিনালায় থাকতে পারেন। খরচ পড়বে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা।
কোথায় খাবেন: সাজেকে খাওয়ার জন্য আগে অর্ডার দিতে হবে। ইচ্ছা করলে আদিবাসীদের সহযোগিতায় নিজেদের ব্যবস্থায় রান্না করতে পারবেন।

##টুকটুক ইকো রিসোর্ট
প্রকৃতির নিবিড় আলিঙ্গনে বাঁধা রূপের রানী রাঙামাটির পরতে পরতে রয়েছে সৌন্দর্যের বৈচিত্র্যতা। রাঙামাটির গহীন অরণ্য,পাহাড়ি প্রকৃতির অমোঘ রূপের আকর্ষণ তাই পর্যটকদের কাছে অফুরন্ত। রাঙামাটির আরো গহীনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য রূপের পসরা। যেখানে আসে সবুজ অরণ্যে ঢাকা পাহাড়, কাপ্তাই হ্রদের বয়ে চলা স্রোতধারা, প্রকৃতির আদি সৌন্দর্য। তেমনি অনন্য সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে ঘুরে আসুন টুকটুক ইকো ভিলেজ। কাপ্তাই লেকের মাঝে অবস্থিত এই জায়গাটি এখনও অনেক পর্যটকদের অগোচরে রয়ে গেছে।

টুকটুক ইকো ভিলেজটি চমৎকার পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। আর সবুজ পাহাড়টি দেখে মনে হয় যেন কাপ্তাই লেকের মাঝে হঠাৎ জেগে উঠেছে। ঠিক যেন সবুজে ঘেরা ছোট্ট দ্বীপ। ইকো ভিলেজের চারদিকে কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জল থৈ থৈ করে। হিমেল বাতাসের মন মাতানো স্পর্শ। কাঠ আর বাঁশের কারুকার্যে তৈরি এই রিসোর্টটি যেন প্রকৃতির মায়া দিয়ে গড়া। আপনাকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে আসতে যা যা দরকার তার সবই রয়েছে এখানে।

রাঙামাটি শহর থেকে টুকটুক ইকো ভিলেজে যাওয়ার জন্য শহরের রিজার্ভ বাজারের শহীদ মিনার এলাকা থেকে রয়েছে নিজস্ব বোটের ব্যবস্থা। এই বোটে চেপে চলে যান টুকটুক ইকো ভিলেজে। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২০ টাকা।

টুকটুক ইকো ভিলেজ

কাপ্তাই লেকে দীর্ঘ নৌভ্রমণে যখন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত তখন চলে যান টুকটুক ইকো ভিলেজের রেস্তোরাঁয়। রেস্তোরাঁটি যেন প্রকৃতিরই একটি অংশ। দেশীয় ও পাহাড়ি আদিবাসীদের মজাদার সব খাবার আপনাকে রসনা বিলাসের পরিপূর্ণ তৃপ্তি দেবে। ব্যাম্বু চিকেন, কাচকি ফ্রাই, চাপিলা ফ্রাই, ডিম কেবাং, আদাফুলের ভর্তাসহ আরও অনেক সুস্বাদু খাবারের আয়োজন রয়েছে এখানে। যদি এখানে থাকতে নাও চান তবে শুধু রকমারি এসব খাবারের স্বাদ নিতে চলে আসতে পারেন টুকটুক ইকো ভিলেজের রেস্তোরাঁয়।

৫০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত বহু টিলা-উপটিলায় বিভক্ত ইকো ভিলেজটিতে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি সুদৃশ্য কাঠের কটেজ। অ্যাটাচ বাথ, ব্যালকনি সমেত এ কটেজগুলোতে থাকার জন্য রয়েছে সকল সুযোগ-সুবিধা। কটেজের জানালার ফাঁক দিয়ে দূরে কাপ্তাইয়ের পানিতে জ্যোৎস্নার রূপালী সৌন্দর্য সত্যই বিমোহিতকর। রাতের আকাশে তাকাতেই দেখতে পাবেন চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি খেলা। সাথে ঝিঁঝিঁ পোকার অবিরাম শব্দ। রাতের ইকো ভিলেজে প্রকৃতির এই আদিম সৌন্দর্য যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসে। তাই রাতের বেলা টুকটুক ইকো ভিলেজে আপনি পাবেন অনিন্দ্য সুন্দর এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। রাতে পাহাড়ি বন-বনানী থেকে ভেসে আসা বিভিন্ন পোকার একটানা ডাক আর সঙ্গে নাম না-জানা নিশাচর পশু-পাখির বিচিত্র শব্দ যেন এক বুনো জগৎকে সামনে নিয়ে আসে। এই বিচিত্র শব্দ শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাবেন তা টেরই পাবেন না।

প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে আড্ডায় মেতে উঠতে এখানে রয়েছে সাজানো গোলঘর। ১৫ টি গোলঘর রয়েছে ইকো ভিলেজটিতে। শিশুদের খেলার জন্য আছে বেশ বড় একটি মাঠ, কাঠের ব্রিজ, দোলনা সবই আছে এখানে। চারদিক পাহাড়ি গাছপালায় পরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ইকো ভিলেজের উঁচু-নিচু পথে লাগানো হয়েছে হরেক রকমের ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ। ফুলে ফুলে সজ্জিত একটি পার্কও রয়েছে এখানে। লাল গোলাপ, সাদা গোলাপ, আফ্রিকান গাদায় ভরপুর এই পার্কটিতে পা ফেললেই বাতাসে ভেসে আসা মিষ্টি কোমল সুবাস আপনার মন জুড়িয়ে দিয়ে যাবে।

কাপ্তাইয়ে ঘুরে বেড়াতে চাইলে ইকো ভিলেজ আপনাকে সকল ব্যবস্থা করে দেবে। কায়াকিংসহ কাপ্তাইয়ের জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থলগুলোতে যাওয়ার সব ব্যবস্থার ভার তাই নিশ্চিন্তে দিয়ে দিতে পারেন টুকটুক ইকো ভিলেজকে।
প্রকৃতির কোলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আদরে গড়া ইকো ভিলেজটি নামে গ্রাম হলেও এখানে ভ্রমণকারীদের জন্য সব রকমের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রাকৃতিক সুধা পান করতে, প্রকৃতির কোলে নির্জনে ঝামেলা মুক্ত পরিবেশে দারুণ কিছু মুহূর্ত কাটাতে আপনাকে যেতে হবে টুকটুক ইকো ভিলেজে।


#চাকমা রাজবাড়ী
রাঙামাটির রাজবনবিহারের পাশেই কাপ্তাই লেকের ছোট্ট একটি দ্বীপজুড়ে রয়েছে চাকমা রাজার রাজবাড়ি। বর্তমানে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, তার স্ত্রী য়েন য়েন ও মা আরতি রায় এ বাড়িতে থাকেন। চারিদিকে হ্রদ বেষ্টিত এই রাজবাড়ি পুরনো হলেও দেখেতে ও বেড়াতে ভীষণ ভালো লাগে।
বৈশিষ্ট্যঃ রাজদরবার, কাচারি, সজ্জিত কামানসহ দেখার মতো অনেক কিছু আছে। উপজাতীয় পোশাকও পাওয়া যায় এখানে। নৌকায় পার হয়ে খুব সহজেই যাওয়া যায় এই বাড়িতে। আঁকা-বাঁকা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গাছের ছায়ায় ইট বাঁধানো পথের মাথায় এ সুন্দর বাড়িটি। এখানে আরো রয়েছে চাকমা সার্কেলের প্রশাসনিক দফতর।
রাঙামাটি শহরে থাকার অভিজাত স্থানগুলোর মধ্যে পর্যটন মোটেল, হোটেল সুফিয়া ইন্টারন্যাশনাল, গ্রিন ক্যাসেল ও হোটেল সাংহাই। এ ছাড়া রিজার্ভ বাজার, পুরাতন বাসস্ট্যান্ডসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে আবাসিক হোটেল।


##রাজবন বিহার, রাঙ্গামাটি
মূল শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত রাজবন বিহার শুধুমাত্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্যই নয়; জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই এখানে প্রবেশাধিকার রয়েছে। নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত এ বিহারে দেখা যাবে স্বর্গীয় সিড়ি। ইচ্ছে করলে অনুমতি নিয়ে এখানে উঠাও যাবে। রয়েছে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধ্যানের বিশাল গর্ত। আরও আছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন ধর্মীয় মূর্তি। যে জিনিসটি বিশেষ দ্রষ্টব্যজনক সেটি হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মগুরু শ্রদ্ধেয় সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভন্তে)’র মৃতদেহ ভক্তদের দেখার জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাঃ-মূল শহরের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় থাকা-খাওয়া নিয়ে আলাদা করে ভাবার দরকার হয় না।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ-বৌদ্ধধর্মের কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান উপলক্ষে এ স্থানে দেশী-বিদেশী পর্যটকরা মিলিত হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রচুর লোক সমাগম হয়।
কিভাবে যাওয়া যায়:
যাতায়াত ব্যবস্থাঃ-টিটিসি রোড দিয়ে কিংবা রাঙ্গামাটি জিমনেসিয়াম এর পাশের রাস্তা দিয়ে অটোরিক্মা কিংবা প্রাইভেট গাড়ি কিংবা অন্য কোন মটরযানে রাজবন বিহারে যাওয়া যায়। নৌপথে বিভিন্ন বোটযোগেও এখানে যাওয়া যায়।

## হ্যাপি আইল্যান্ড
রাঙ্গামাটিতে ভ্রমণ পিপাসুদের এখন প্রধান আকর্ষণ ‘হ্যাপি আইল্যান্ড’। নির্মিত হয়েছে কাপ্তাই লেকের মধ্যখানে । এটি উন্মুক্ত করার পর থেকে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত পর্যটক।

কাপ্তাই লেক ঘেরা রাঙ্গামাটিতে সবুজ প্রকৃতি আর লেকের পাশাপাশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল একমাত্র ঝুলন্ত ব্রিজ। এখন সেখানে যোগ হয়েছে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নির্মিত এই ‘হ্যাপি আইল্যান্ড’। চারপাশে লেকের স্বচ্ছ জলরাশির মধ্যখানে ৪৫ শতক দ্বীপ এলাকায় এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩০৫ ইনফ্যানট্রি বিগ্রেডের উদ্যোগে প্রায় দুই বছরের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় রাঙ্গামাটি জেলার ভেদভেদি এলাকা সংলগ্ন কাপ্তাই লেকে নির্মিত এই আইল্যান্ডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় গত ২৫ এপ্রিল। উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার। উদ্বোধনের পর থেকেই এখানে পর্যটকদের ঢল নামে।

যা আছে হ্যাপি আইল্যান্ডে : এই কৃত্রিম আইল্যান্ডটিতে প্রবেশের জন্য প্রথমে রাঙামাটি ভেদভেদি এলাকায় সেনাবাহিনীর হলিডে রিসোর্টে প্রবেশ করতে হবে। এর জন্য প্রবেশ ফি ৫০ টাকা। দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক পরিবেশে সেনা করিডোরের মধ্যে সবুজ ঘাসে মোড়ানো এলাকাটা সবার মন কাড়বে এক পলকেই।
এখানে আছে কফিশপ, ফুলের বাগান, মৎস্য কন্যা ভাস্কর্য, রিসোর্ট এবং লেকের পাড়ে সারি সারি স্পিডবোট, প্যাডেল বোট ও ফ্যামিলি বোট। চাইলেই এসব বোট ভাড়া নিয়ে প্রিয়জনদের নিয়ে কাপ্তাই লেকে বিচরণ করা যাবে।

হ্যাপি আইল্যান্ডটি নির্মিত হয়েছে একটি বড় মাছের আদলে। রিসোর্ট থেকে এখানে যেতে জনপ্রতি ১৫০ টাকা ফি দিয়ে টিকেট সংগ্রহ করতে হবে। এরপর সেনাবাহিনীর নিজস্ব বোট লেকের মাঝখানে অবস্থিত মনোরম হ্যাপি আইল্যান্ডের ওয়াটার ওয়ার্ল্ডে পৌছে দেবে।

চারপাশে স্বচ্ছ শীতল জলরাশি আর মধ্যখানে সুবিশাল দৃষ্টিনন্দন ওয়াটার পার্ক। এখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওয়াটার রাইড, লেকভিউর সাথে সুইমিং পুলের সুবিধা, বোট রাইড এবং নজর কাড়া নির্মাণ শৈলীর নানা বিনোদন মাধ্যম। শিশু কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী নারী পুরুষ এখানে নির্বিঘ্নে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় কাটাতে পারবেন।

হ্যাপি আইল্যান্ড ঘুরে এসে ইয়াসিন আরাফাত চৌধুরী মুন্না নামের একজন পর্যটক জানান, আইল্যান্ডটি কাপ্তাই লেক আর প্রকৃতিপ্রেমি পর্যটকদের তৃষ্ণা মিটাবে নিঃসন্দেহে। এখানে একেক সময় একেক রংয়ে আর ঢংয়ে সাজে পুরো আইল্যান্ড। এখানের রোদ্দুর দিনের চোখ ধাধানো ঝলমলে রূপালী সৌন্দর্য, টিপটিপ বৃষ্টি দিনের বৃষ্টিস্নাত সাদাকালো সৌন্দর্য, পূর্ণিমা রাতের মায়াময় জ্যোৎস্না সৌন্দর্য, মেঘলা দিনের বিরহী সৌন্দর্য আর পড়ন্ত বিকালের শীতল আর ভাবুক সৌন্দর্যে ডুব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রাঙ্গামাটি সেনা রিজিয়ন সদর দপ্তর কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্পুর্ণ সেনাবাহিনীর অর্থায়নে রাঙ্গামাটির পর্যটনকে আরো সমৃদ্ধ করতে ‘হ্যাপি আইল্যান্ড’ বিনোদন স্পটটি গড়ে তোলা হয়েছে। বিনোদনের ক্ষেত্রে স্পটটি ভ্রমণ পিপাসুদের আরও বেশি আনন্দ জোগাবে। স্পটটি সম্পূর্ণ শৃংখলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই সবার জন্য উন্মুক্ত।

যেভাবে যাবেন: চট্টগ্রাম শহর থেকে রাঙ্গামাটির দুরত্ব ৭৫ কিলোমিটার। যাদের ব্যাক্তিগত গাড়ি আছে তারা চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে অক্সিজেন হাটহাজারী সড়ক হয়ে রাঙ্গামাটি যেতে পারেন। অথবা যাওয়া যাবে চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই সড়ক হয়ে কাপ্তাই ভেদভেদি সড়ক পথে। যারা পাবলিক গাড়িতে যেতে চান তারা চট্টগ্রামের অক্সিজেন বাস স্টেশন থেকে সরাসরি সার্ভিস পাহাড়িকা বাস অথবা লোকাল বাসে রাঙ্গামাটি যেতে পারেন। পাহাড়িকা বাসে গেলে চট্টগ্রাম থেকে সময় লাগবে দেড় ঘন্টা। আর লোকাল বাসে সময় লাগতে পারে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। হ্যাপি আইল্যান্ডে যেতে হলে রাঙ্গামাটি শহরের ঢোকার পূর্বে ভেদভেদি এলাকায় নামতে হবে বাস থেকে।

##পলওয়েল পর্যটন পার্ক
রাঙামাটি ডিসি বাংলোর পাশে পলওয়েল শিশু পার্কের যাত্রা শুরু হলো বুধবার (২২ আগস্ট)। রাঙামাটিবাসীসহ এখানে আগত পর্যটকদের জন্যে পার্কটি উম্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। রাঙামাটিতে চিত্তবিনোদনের অন্যতম স্থান হিসেবে জেলার আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলোর মতো ঈদ উল আযহা’র দিনে নতুন করে যোগ হলো এই রাঙামাটি পলওয়েল শিশু পার্ক।

##আরণ্যক রিসোর্ট, রাঙ্গামাটি
রাঙ্গামাটিতে ঘুরার যায়গার অভাব নাই, কিন্তু অনেকেই হয়ত আরণ্যক হলিডে রিসোর্টের কথা জানেনা। যেকোন দিন পুরা পরিবার নিয়ে ঘুরে আসার জন্য এই রিসোর্টি অসাধারন। আর যদি সেটা কোন পুর্নিমার রাত হয় তবে তো কথাই নেই। দিনের বেলায় যেমন সুন্দর তেমনি দুর্দান্ত তার রাতের পরিবেশও। এই রিসোর্ট আর্মিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় নিরাপত্তা নিয়েও কোন সমস্যায় পরতে হয় না। লেকভিউর সাথে আছে সুইমিং পুলের সুবিধা, বোট রাইড এবং দুর্দান্ত নির্মানশৈলি আপনার নজর কাড়বে অনায়াসেই। রাঙ্গামাটি শহরের সেনানিবাস এলকায় অপরূপ ছায়ায় ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা আরন্যক রিসোর্ট যেন শিল্পির তুলিতে একটি নিখুদ ছবি। ছবির মতে সুন্দর কাপ্তাই হ্রদে ঘেরা এ রিসোর্টটির ছিমছাম পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবেন। মন ভোলানে এ রিসোর্টের প্রধান আকর্ষণ এর পরিবশে ও কাপ্তাই লেকের নীল জলরাশিতে ডেল বোটে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানো। ছোটদের জন্য আরণ্যক রিসোর্টে রয়েছে বিভিন্ন রকমের খেলার রাইড প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা।

##চলুন ঘুরে আসি রাঙ্গামাটির পেদা টিং টিং

পেদা টিং টিং বাংলাদেশের রাঙ্গামাটি শহরে কাপ্তাই হ্রদের উপর নির্মিত ভাসমান পাহাড়ে অবস্থিত পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্র।
জানুন
পেদা টিং টিং চাকমা শব্দগুচ্ছ। এর ভাবগত অর্থ হচ্ছে – পেট টান টান। অর্থাৎ, মারাত্মকভাবে খাবার পর পেটের যে টান টান অবস্থা থাকে, সেটাকেই বলা হয় পেদা টিং টিং।
দেখুন
কাপ্তাই হ্রদের চারদিকে কেবল পাহাড় আর হ্রদ। বুনো প্রকৃতি ছাড়া এখানে আর অন্য কিছু আশা করা যায় না। তবে চলতি পথে কোন একটি টিলার উপর পেদা টিং টিং লেখা চোখে পড়লেই অবাক হয়ে যাবে দর্শনার্থীরা।
উপভোগ করুন
এখানে এমন এক পরিবেশ বিরাজমান যেখানে এক গ্লাস খাবার পানি নেই; অথচ পেদা টিং টিং চা, কফি আর চিকেন ফ্রাই নিয়ে দর্শনার্থীদেরকে আহ্বান জানাচ্ছে খাবার উপভোগের জন্য। এখানে রেস্তোঁরা, কটেজ, নৌবিহার ব্যবস্থা, সেগুন বাগান ও অসংখ্য বানর রয়েছে।
কোথায় থাকবেন
রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। থাকার জন্য বেশ কয়েকটি কক্ষ সুসজ্জ্বিত অবস্থায় রয়েছে। চাঁদনি রাতে এমন একটি পাহাড়ের উপর রাত্রিযাপন সত্যিই দূর্লভ বিষয়।

##বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ এর সমাধিস্থল
রাঙ্গামাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন সাত বীরশ্রেষ্ঠদের একজন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ। রাঙ্গামাটি শহর হতে জলপথে এক ঘন্টার দুরত্বে অবস্থিত বুড়িঘাটে এই সমাধি অবস্থিত। চারদিকে কাপ্তাই লেকের নীলজল খেলা করে আর তার মাঝখানে একটি ছোট্ট দ্বীপে ঘুমিয়ে আছেন আমাদের চিরস্মরণীয় অসামান্য বীর। দেশপ্রেমিক আর ইতিহাস সচেতন পর্যটকরা এই বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অপূর্ব এক সুযোগ পাবেন।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাঃ-নানিয়ারচরে থাকার তেমন ভাল কোন সুবিধা নেই। রাঙ্গামাটিতে থেকে এই সমাধিস্থলে পর্যটকরা যেতে পারে। এক্ষেত্রে খাবার সঙ্গে নিলে ভাল হয়।
কিভাবে যাওয়া যায়:
রাঙ্গামাটি ও নানিয়ারচর হতে লঞ্চযোগে সরাসরি যাতায়াত করা যায়। নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে এই সমাধিস্থল অবস্থিত। সময় লাগবে ১/২ ঘন্টা।

##বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র
রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র। ৩০ জানুয়ারী ১৯৭০ খ্রি: তারিখে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৪ জুন ১৯৭৫ খ্রি: বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ উদ্বোধন করেন। বর্তমানে উক্ত কেন্দ্রের মাধ্যমে সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, হংকং, ওমান, পাকিস্তান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মুম্বাই অর্থাৎ মোট ১১ টি দেশের সাথে টেলিফোন ডাটা কমিউনিকেশন, ফ্যাক্ম, টেলেক্ম ইত্যাদি আদান-প্রদান করা হয়। প্রায় ৩৫,৯০০ কি.মি. বা ২২,৩০০ মাইল উর্ধ্বাকাশে অবস্থিত কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে শক্তিশালী এন্টেনার দ্বারা বার্তা/তথ্য আদান-প্রদানের কাজ সম্পাদিত হয়।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাঃ-চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি শহরে অবস্থান আবাসন ও খাওয়ার সুব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কিছু হোটেলেও খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
কিভাবে যাওয়া যায়:
যাতায়াত ব্যবস্থাঃ-চট্টগ্রাম থেকে রাঙ্গামাটির বাসযোগে বেতবুনিয়া যাওয়া যায়। রাঙ্গামাটি থেকে বাসে অথবা সিএনজি করে বেতবুনিয়ায় পৌঁছানো যায়।

##কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পিলওয়ে :

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পানি শক্তি দ্বারা পরিচালিত। বন্দর নগরী চট্টগ্রাম হতে ৫০ কিলোমিটার দূরে রাংগামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় এ প্রকল্পটির অবস্থান। ১৯৫৬ সালে এ বাধের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৬০ সালে শেষ হয়। ইন্টারন্যাশানাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানী এবং ইউতাহ ইন্টারন্যাশানাল ইনকর্পোরেট ৬৭০.৬ মিটার দীর্ঘ এবং ৪৫.৭ মিটার উচু এই বাধটি তৈরী করে। বাধের সুরক্ষা এবং উজানের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য ১৬টি জল কপাট যুক্ত ৭৪৫ ফুট দৈঘ্য একটি জল নির্গমন পথ বা স্পিলওয়ে রাখা হয়। এই স্পিলেওয়ের প্রতি সেকেন্ডে পানি নির্গমনের ক্ষমতা ৫,২৫,০০০ কিউসেক ফুট।
কিভাবে যাওয়া যায়:
চট্টগ্রাম বদ্দারহাট হতে বাস যোগে কাপ্তাই যেতে হবে। কাপ্তাই বিপিডিবি রিসিভসন গেইট হতে অনুমতি নিয়ে স্পিলওয়ে দেখতে যেতে হবে।

##কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান
উপমহাদেশের যে কটি প্রাচীন উদ্যান আছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাই উপজেলায় এটি গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৫৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে এ বনের অবস্থান। আর রাঙ্গামাটি শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। ১৮৭৩, ১৮৭৮ এবং ১৮৭৯ সালে এখানে বনায়নের ফলেই গড়ে উঠেছিল একটি ক্রান্তীয় বনাঞ্চল। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনের আওতায় ১৯৯৯ সালে এটি জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা পায়। এর আগে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান সীতাপাহাড় সংরক্ষিত বনের অংশ ছিল।
পাহাড়ের ঢালে ঢালে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। নানা রকম গাছপালা সমৃদ্ধ এ উদ্যানে আছে– সেগুন, চাপালিশ, জারুল, চম্পা, সোনালু, চালতা, চিকরাশি, শাল, শিলকড়ই, ধারমারা, গামারি, অর্জুন, আমলকি, আমড়া, বহেরা, বাজনা, বড়ই, পিটরাজ, পিটাল, বাঁশপাতা, বৈলাম, নাগেশ্বর, হিজল, উদল, উরিয়া, লোহাকাঠ ইত্যাদি। এসব গাছপালার ছায়ার নিচ দিয়ে আঁকাবাঁকা পায়েচলা পথে হাঁটলে মন হারিয়ে যাবে অজানায়।

নানান জীববৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ এ বনাঞ্চল। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বাসিন্দাদের মধ্যে আছে বন্যহাতি, হরিণ, হনুমান, উল্লুক, শুকর, বনবিড়াল, গুইশাপ, অজগর ইত্যাদি। ভাগ্য ভালো থাকলে বিশ্বের অন্যতম বড় বিষধর সাপ শঙ্খচুড়ের দেখা পেয়ে যেতে পারেন। বর্তমানে প্রায়ই এ বনে বন্যহাতির দেখা মিলছে। দলবেঁধে হাতিরা বনের ভেতরে ঘুরে বেড়ায় অবাধে।

বিভিন্ন প্রজাতির পাখপাখালির নিরাপদ বিচরণ ক্ষেত্র এই জঙ্গল। ধনেশ, ফিঙ্গে, বুলবুলি, কাঠময়ূর, বনমোরগ, ময়না, ঘুঘু, টিয়া, মাছারাঙ্গাসহ নানান ধরনের পাখির দেখা মিলবে গাছের ডালে, ঝোঁপের আড়ালে। তবে তাদের দেখতে চাইলে ঠোঁটে কুলুপ এঁটে চলতে হবে বনের পথে।

বন এলাকা ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির আওতায় বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণস্থান আর পায়েহাঁটা পথ তৈরি করা হয়েছে এ বনে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও উল্লেখযোগ্য পথটি হল ব্যাঙছড়ির মাঝারি বনপথ। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের ব্যাঙছড়ি মারমাপাড়া থেকে শুরু হওয়া বনের ভেতর পথটির দৈর্ঘ্য আড়াই কিলোমিটারের একটু কম। এ পথেই জীববৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি। রয়েছে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং টাওয়ার। উঁচুনিচু পাহাড়ি এ পথে আরও আছে ছোটবড় কয়েকটি ঝরনা।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান এলাকায় আছে মারমা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের দুটি গ্রাম। একটি ব্যাঙছড়ি মারমাপাড়া অন্যটি চিৎমুরং বড়পাড়া। এসব গ্রামে দেখতে পাবেন তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা। তবে গ্রামে প্রবেশের আগে অবশ্যই কারবারি বা হেডম্যানের অনুমতি নিয়ে নিতে হয়।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে একাকী ভ্রমণ না করাই ভালো। দলবদ্ধভাবে ভ্রমণে গেলে অবশ্যই অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে নেয়া উচিত। তাতে জঙ্গলে ভ্রমণ এবং বন্যপ্রাণী দেখা সহজ হবে। কাপ্তাই উদ্যানে প্রশিক্ষিত কয়েকজন গাইড আছেন। নির্ধারিত সম্মানির বিনিময়ে এসব গাইডের সেবা নেয়া যাবে। এছাড়া যে কোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারেন কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের কার্যালয়ে ০৩৫২৯-৫৬৩৫৭।
কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন কিংবা আকাশপথে চট্টগ্রাম আসতে হবে। এখানে বহদ্দারহাট বাস স্টেশন থেকে পনের মিনিট পরপর বাস ছেড়ে যায় কাপ্তাই এর উদ্দেশ্যে। পৌঁছাতে সময় লাগে দেড়-দুই ঘণ্টা। ভাড়া ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি কাপ্তাই যায় ডলফিন, সৌদিয়া, এস আলম, শ্যামলী পরিবহনের বাস। ঢাকার কলাবাগান, ফকিরাপুল ও সায়দাবাদ থেকে এসব বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।

কোথায় থাকবেন: থাকার জন্য রয়েছে সাধারণ মানের কিছু হোটেল। কাপ্তাই শহরের এসব হোটেলগুলো হল- হোটেল থ্রি স্টার, হোটেল নিরাপদ, বোয়ালখালী বোর্ডিং, কামাল বোর্ডিং ইত্যাদি। ২০০ থেকে ৬০০ টাকায় দুজন থাকার কক্ষ আছে। এ ছাড়া বন বিভাগের রেস্ট হাউসে থাকতে হলে পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে। কাপ্তাই এলাকায় খাবার জন্য সাধারণ মানের বেশ কিছু রেস্তোরাঁ আছে। সবচেয়ে ভালো খাবারের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ঝুম রেস্তোরাঁ উৎকৃষ্ট।

প্রয়োজনীয় তথ্য: কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে একাকী ভ্রমণ না করাই ভালো। দলবদ্ধভাবে ভ্রমণে গেলে অবশ্যই অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে নেয়া উচিত। তাতে জঙ্গলে ভ্রমণ এবং বন্যপ্রাণী দেখা সহজ হবে। কাপ্তাই উদ্যানে প্রশিক্ষিত কয়েকজন গাইড আছেন। নির্ধারিত সম্মানির বিনিময়ে এসব গাইডের সেবা নেয়া যাবে।

##চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার
পাহাড়ী অঞ্চলের অন্যান্য জেলার ন্যয় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাই উপজেলাতেও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনার জন্য অনেক বৌদ্ধ বিহার আছে। কিন্তু কাপ্তাই উপজেলার ৩নং চিৎমরম ইউপিতে প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ বিহারটি সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের জন্য অন্যতম বিহার। মূলত এটি ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত করে তারা উপাসনা শুরু করেন। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এটি সংস্কার করে আকর্ষণীয় করে তোলেন। উক্ত বিহারটি ২টি পাহাড়ের উপর থাকায় আকর্ষণের মাত্রাকে আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এই বিহারে প্রতিদিন তিন পার্বত্য জেলা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে অসংখ্য পর্যটক পূণ্যার্থী ও পর্যটক উপাসনা ও পরিদর্শন করতে আসে। বিহারটি চট্টগ্রাম হতে ৪৫ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত।
কিভাবে যাওয়া যায়:
যাতায়াত ব্যবস্থাঃ-রাঙ্গামাটি থেকে জল ও স্থল উভয় পথেই কাপ্তাই যাওয়া যায় (সময় লাগে ১ থেকে ২ ঘন্টা)। বাস, মাইক্রো, অটোরিক্মা, ইঞ্জিনচালিত বোটযোগে যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল হতে বাস অথবা চট্টগ্রামস্থ কাপ্তাই রাস্তার মাথা হতে সিএনজিযোগে কাপ্তাই চিৎমরম কিয়াং ঘাটে নামতে হবে। কিয়াংঘাট নেমে নৌকাযোগে কর্ণফুলি নদী পার হয়ে কোয়ার্টার কি.মি. গেলেই চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার চোখে পড়বে।

##নৌ বাহিনীর পিকনিক স্পট
নৌ বাহিনীর পিকনিক স্পটটি বিশাল এলাকাজুড়ে ছোট ছোট অনেকগুলো বিনোদন স্পট তৈরি করা হয়েছে কাপ্তাই লেকের পাড়ে। সবুজের ঝোঁপ-ঝাড়ের ফাকেঁ ফাকেঁ নিজেকে আড়ারল করে বিশাল কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য অবলোকন করা যাবে। লুকোচুরি খেলার এ এক অনন্য জায়গা। পাহাড়ের আড়ালে নিজেকে হারিয়ে অনুভব করা যাবে অনাবিল প্রশান্তি। ইঞ্জিনবোটযোগে কাপ্তাই লেক ভ্রমণসহ রাঙ্গামাটি ঘুরে আসা যাবে।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাঃ-কাপ্তাই এ থাকা ও খাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রেস্টহাউস ও বেসরকারী পর্যায়ে কিচু আবাসিক হোটেল রয়েছে। এছাড়া রাঙ্গামাটি অবস্থান করে কাপ্তাইয়ের বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানে যাওয়া যাবে।
কিভাবে যাওয়া যায়:
যাতায়াত ব্যবস্থাঃ-রাঙ্গামাটি থেকে জল ও স্থল উভয় পথেই কাপ্তাই যাওয়া যায় (সময় লাগে ১ থেকে ২ ঘন্টা)। বাস, মাইক্রো, অটোরিক্মা, ইঞ্জিনচালিত বোটযোগে যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট হতেও বাস বা অটোরিক্মা বা অন্য কোন পরিবহনযোগে কাপ্তাই নৌ বাহিনীর বা নৌ জা শহীদ মোয়াজ্জেম পিকনিক স্পটে যাওয়া যায়।

##কর্ণফুলী পেপার মিলস্ লিমিটেড
১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে রাঙ্গামাটি কাপ্তাই উপজেলাধীন চন্দ্রঘোনা নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়ার বৃহত্তম কাগজের কল কর্ণফুলি পেপার মিলস্ লিমিটেড। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরই এ প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয়করণ করা হয়। কাগজ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল বাশেঁর প্রাপ্যতার উপর ভিত্তি করে কর্ণফুলি পেপার মিলটি চন্দ্রঘোনায় স্থাপন করা হয়। এই মিলে সাদা কাগজ এবং বাদামী ও অন্যান্য রঙ্গিন কাগজ উৎপাদিত হয়। এদেশে সরকারী চাহিদার প্রায় অর্ধেকের বেশি কাগজ সরবরাহ করে থাকে এ প্রতিষ্ঠানটি। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি পর্যটকদের নিকট আকর্ষণীয় স্থান। এখানে বাঁশ ও পাল্পউড থেকে কাজগ তৈরির সকল পর্যায় দেখা যাবে। অনুমতি সাপেক্ষে এখানে প্রবেশ করা যাবে। এছাড়া রাইখালী থেকে এ বিশাল মিলটি দেখা যায়।

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাঃ-কাপ্তাই এ থাকা-খাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রেস্টহাউস ও বেসরকারী পর্যায়ে কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। এছাড়া রাঙ্গামাটি অবস্থান করে কাপ্তাইয়ের বিভিন্ন দর্শণীয় স্থানে যাওয়া যাবে।
কিভাবে যাওয়া যায়:
যাতায়াত ব্যবস্থাঃ-রাঙ্গামাটি থেকে জল ও স্থল উভয় পথেই কাপ্তাই যাওয়া যায় (সময় লাগে ১ থেকে ২ ঘন্টা)। বাস, মাইক্রো, অটোরিক্মা, ইঞ্জিনচালিত বোটযোগে যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট হতেও বাস/মাইক্রোযোগে কাপ্তাই/চন্দ্রঘোনা যাওয়া যায়। এর চন্দ্রঘোনা পেপার মিল ১নং গেটে যেতে হবে।


আরোও সংবাদ