অভাবনীয় জালিয়াতি

নিউজচিটাগাং২৪/ এক্স প্রকাশ:| শনিবার, ৭ এপ্রিল , ২০১৮ সময় ১০:১৬ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) ওয়েবসাইটে গিয়ে ৬০৯১৯ নম্বর দিয়ে নিবন্ধিত চিকিৎসকদের খোঁজ করলে রেজাউল করিম নামের একজন চিকিৎসকের ছবিসহ নাম দেখা যেত। বাবার নাম আবুল কাশেম। বাড়ি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থানার মুসাপুর গ্রামে। গত মঙ্গলবারও এই তথ্যটি ছিল। গত বৃহস্পতিবার তা স্থগিত দেখা যায়।

চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক (এমবিবিএস) পাস করার পর চিকিৎসা করার অনুমতি দেয় বিএমডিসি। রেজাউল করিমকে বিএমডিসি চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধন দিলেও তিনি কোনো দিন মেডিকেল কলেজে পড়াশোনাই করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, হাসপাতালের পরিচালকের সই জালসহ ধাপে ধাপে জালিয়াতি করে তিনি এ অনুমতি নিয়েছেন। প্রথম আলোর অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি বিশ্লেষণ করে জালিয়াতির এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জালিয়াতি করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ডিএ কোর্সে ভর্তিরও সুযোগ করে নিয়েছেন রেজাউল। ডিপ্লোমা ইন অ্যানেসথেশিওলজি (ডিএ) কোর্সে দুই বছর পড়াশোনা করেছেন তিনি। এর আগে নিবন্ধিত চিকিৎসক হিসেবে ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে ক্লিনিক ও হাসপাতালে রোগী দেখে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন
(প্রাইভেট প্র্যাকটিস)।
সিলেটের জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস করার দাবি করে বিএমডিসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিলেন রেজাউল। কলেজটি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) চিকিৎসা অনুষদের অধিভুক্ত। বিএমডিসিতে তিনি যে প্রশংসাপত্র ও সাময়িক সনদ জমা দিয়েছেন, তার সবই ভুয়া। এই মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের সই করা প্রশংসাপত্রের যে ক্রমিক নম্বর আছে, সেটিও সঠিক নয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, জালিয়াতি করে সইটি বসানো হয়েছে।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এ কে এম দাউদ জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমাদের মেডিকেলের নামে ইস্যু হওয়া প্রশংসাপত্র ও ইন্টার্নি সমাপ্ত করার সনদ জাল।’ এই হাসপাতালের পরিচালক মো. তারেক আজাদ বলেন, সব নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কথিত এই শিক্ষার্থী এই মেডিকেলে ভর্তিই হননি।
জাল সনদ দিয়ে কীভাবে রেজাউল চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধন পেলেন, জানতে চাইলে বিএমডিসির রেজিস্ট্রার জাহেদুল হক বসুনিয়া প্রথম আলোকে বলেন, এমনটি হতেই পারে। এখন তো ধরা পড়ল। সনদের সত্যতা যাচাই কত দিনের মধ্যে করতে হয়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মেডিকেল কলেজের সনদ নিয়ে আবেদন করলে আমরা সনদ দিয়ে দিই। ভুয়া হলে একসময় না একসময় ধরা পড়বেই। কত দিনের মধ্যে সত্যতা যাচাই করতে হবে, সে রকম কোনো নীতিমালা নেই।’
জালিয়াতির মাধ্যমে চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধন নেন রেজাউল করিম। ছবি: সংগৃহীতজালিয়াতির মাধ্যমে চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধন নেন রেজাউল করিম। ছবি: সংগৃহীতএই অভাবনীয় জালিয়াতি ধরা পড়তে সময় লাগল পাঁচ বছর। এভাবে ভুয়া চিকিৎসকের হাতে কোনো রোগীর মৃত্যু হলে তাঁর দায়-দায়িত্ব কে নেবে, জানতে চাইলে বিএমডিসির রেজিস্ট্রার বলেন, ‘আমরা চাই না এ রকম ঘটনায় কারও মৃত্যু হোক। তবে এ রকম ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে আমাদের কিছু করার নাই।’
রেজাউল প্রাথমিক নিবন্ধন পেয়েছিলেন ২০১২ সালে। পরের বছর তিনি স্থায়ী নিবন্ধন পান। বিএমডিসির ওয়েবসাইটে সর্বশেষ ৩ এপ্রিলও তাঁকে নিবন্ধিত চিকিৎসক হিসেবে দেখা যায়। এ বিষয়ে বিএমডিসির সঙ্গে কথা বলার পর গত বৃহস্পতিবার ওয়েবসাইটে গিয়ে তা স্থগিত দেখা যায়।
রেজাউল যে নিবন্ধন নম্বরটি ব্যবহার করেছেন, সেটি মূলত মো. মনজুরুল আহসান নামের আরেক শিক্ষার্থীর। সাময়িক সনদেও একই রকম জালিয়াতি করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘রেজাউল করিম নামে যে সনদ পাওয়া গেছে, সেটি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। আমরা নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখেছি সনদটি ভুয়া।’
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, জাল সনদ ব্যবহার করে তিনি উচ্চতর শিক্ষার ভর্তি পরীক্ষায় পাস করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ডিএ কোর্সে দুই বছর অধ্যয়নও করেছেন। এখন প্রশ্ন উঠছে, তিনি এমবিবিএস না পড়েও কী করে ডিএ কোর্সে ভর্তির মতো তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাস করলেন?
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অ্যানেসথেশিওলজি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ‘রেজাউল নামে ওই শিক্ষার্থী আমাদের বিভাগে ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুলাই পর্যন্ত ডিএ কোর্সে অধ্যয়ন করেছেন। তবে কোর্স সম্পন্ন করতে পারেননি।’
রেজাউল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি রেজিস্ট্রেশন নম্বরে ভুলের কারণে এসব আলোচনায় আসছে বলে জানান। তিনি সিলেটের রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজে পড়েছেন বলে দাবি করেন। আসল রেজিস্ট্রেশন নম্বর জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক আগে পড়াশোনা করেছি তো। দেখে বলতে হবে।’ এ বিষয়ে আরও অনেক প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

যেভাবে ধরা পড়লেন রেজাউল
রাজশাহী মেডিকেলে ডিপ্লোমা কোর্সে পড়ার সুযোগ পাওয়া রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে রেজাউলের পরিচয় হয়। কথোপকথনের একপর্যায়ে সন্দেহ হলে ওই প্রাক্তন শিক্ষার্থী ফেসবুকে মেডিকেল কলেজটির একটি গ্রুপে বিষয়টি নিয়ে একটি পোস্ট দেন। এরপর ‘প্ল্যাটফর্ম’ নামে চিকিৎসকদের বড় একটি ফেসবুক গ্রুপে এ নিয়ে আলোচনা হয়। প্রায় ৮০ হাজার চিকিৎসকের ওই গ্রুপে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পর জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর টনক নড়ে বিএমডিসির। গত ২৯ মার্চ তারা শাবিপ্রবির চিকিৎসা অনুষদের ডিন ও রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর চিঠি দিয়ে সনদগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন পাঠাতে অনুরোধ করে।


আরোও সংবাদ