অবিস্মরণীয় আখেরী চাহার সোম্বা

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর , ২০১৬ সময় ১১:৩৮ অপরাহ্ণ


গোটা মদিনা নগরি নিরব নিস্তব্দ। সোমবার সুবেহ সাদিকে বেলালের আজান নিস্তব্ধতা ভেঙে জাগিয়ে দিল সব মানুষের। রসূল (স.) ইশারায় ফজরের নামাজ আদায় করলেন। হযরত আয়শা (রা.) বললেন, আমার হুজরার বাতি সেসময় নিভে গেল। মহানবী (স.) এর সকল সম্পদ সেইমুহুর্তে এমনভাবে শেষ হলো যে, বাতি জ্বালানোর তেলটুকুও ছিল না। অর্থাত্ তাঁর প্রাণ প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগেই আলোর প্রদীপ নিভে গেল। হযরত জিব্রাইল (আ.) এসে বললেন, হে রসূল (স.), আপনাকে আল্লাহ সালাম দিয়েছেন

জাকির হোসাইন আজাদী
%e0%a6%86%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%beআল্লাহর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (স.) এই পৃথিবীতে তেষট্টি বছর হায়াত পেয়েছিলেন। এর মধ্যে কখনোই তিনি বড় ধরনের কোনো রোগ ব্যাধির কবলে পড়েন নাই। কাফের মুশরিকদের শত অত্যাচার ও নির্যাতনের মাঝেও তিনি ছিলেন হিমাদ্রির ন্যায় অবিচল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ (স.) কে পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নেবেন তার আগে রোগে আক্রান্ত হলেন। উম্মুল মু’মেনীনগনও সাহাবা আজমাইনগন তাতে খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন। এর আগে সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি সুস্থতা অনুভব করলেন। তিনি আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) কে ডেকে বললেন, বিবি আমার কাছে আসুন ও আমার কথা শুনুন। হযরত আয়শা (রা.) দৌঁড়ে চলে এলেন এবং বললেন, হে আল্লহর রসূল (স.), আমার বাবা-মা আপনার জন্য উত্সর্গ হোক, বলুন! আমাকে কি জন্য ডেকেছেন। মহানবী (স.) বললেন, আয়েশা আমার মাথা ব্যাথা চলে যাচ্ছে এবং আমি সুস্থ্যতা অনুভব করছি। আপনি হাসান হোসাইন ও মা ফাতিমা কে আমার করছে ডেকে নিয়ে আসেন। হযরত আয়েশা (রা.) তাই করলেন। রসূল (স.) এর মাথায় পানি ঢাললেন। তাকে সুন্দর ভাবে গোসল করালেন। এই খবর মদীনায় সকল স্থানে ছাড়িয়ে পড়লো। অনেক সাহাবী এই খবর পেয়ে আনন্দে আত্মাহারা হয়ে গেলেন। কেউবা দাসমুক্ত করে দিলেন। কেওবা উট দান করলেন। কেউবা বহু দান সাদকা করলেন। সাহাবিরাও অনেকে রাব্বুল আলামীনের কাছে শুকরিয়ার নামাজ ও দোয়া করলেন। এটা ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার। এজন্য এই দিনটিকে আখেরী চাহার সোম্বা বলা হয়। আখেরী আর্থ শেষ আর চাহার সোম্বা হলো বুধবার। রসূল (স.) এর আগে তার পরম বন্ধু আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌছানোর জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। একজন মুসাফির যেমন দূরবর্তী সফরে বের হওয়ার আগে সবার নিকট বিদায় নেয় সব কিছু গুছিয়ে নেয়। যা দেখে অনুভব করা যায় যে, উনি কোনো সফরে বের হবেন। ঠিক তদ্রূপ মহানবী (স.) তাঁর ইন্তেকালের আগেই তার বিদায় যাত্রার প্রস্তুতি দেখে নিকটতম সাহাবীরা অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, রসূল (স.) বোধ হয় আমাদের মাঝে আর বেশিদিন থাকবেন না। এর পর হঠাত্ জিব্রাইল (আ.) আসলেন এবং বললেন, হে রসূল (স.) আল্লাহ তায়ালা আপনাকে শীঘ্রই এই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার অথবা আরো কিছুদিন এখানে থাকার অবকাশ দিয়েছেন। এখন আপনি যেটা পছন্দ করেন। প্রিয় পাঠক! আল্লাহর নবী রসূলগন হলেন জগতের সেরা সন্তান। তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুর আগে ছালাম জানিয়েছেন থাকা ও যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। কিন্তু সকল নবী যাওয়াটাকেই বেছে নিয়েছেন। মহানবী (স.) ও তাই করলেন। তিনি একদিন বলেছিলেন, আল্লাহ তাঁর কোনো এক বান্দাকে এই পৃথিবীতে থাকার ও এখান থেকে যাওয়ার ইখতিয়ার দিয়েছেন। কিন্তু সেই বান্দা-বলেছে-আল্লাহুম্মার রফিকুল আলা” আমি আমার পরম বন্ধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্নিধ্যকেই বেছে নিচ্ছি। সাহাবীরা বলেন, রসূলের এই কথায় সম্মুখের নিকটতম সাহাবী আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, তালহা, যুবারের, আবদুর রহমান বিন আউফ এসব জলিল-এ-ক্বদর সাহাবীরা ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তাদের কান্নার শব্দ পিছনের কাতার থেকে শোনা গিয়েছিল। সাহাবীরা বুঝে ছিলেন রসূল (স.) হয়ত আর বেশিদিন আমাদের মাঝে থাকবেন না। এরপর রসূল (স.) শেষ অসুস্থ হলেন-তার স্ত্রী মায়মুনার বাড়ী থেকে ফেরার পথে। হযরত আয়শার কাছে আসলেন। রসূল (স.) তাঁর অসুস্থতার কথা আয়শাকে বলার আগেই আয়শা (রা.) রসূল (স.) কে বললেন, মাথা গেল, মাথা গেল, তখন রসূল (স.) বললেন, কার মাথা? আমার না তোমার? আয়শা (রা.) বললেন আমার মাথা গেল। রসূল (স.) তখন রসিকতা করে বললেন, তোমার মাথা গেলে তো তুমি সৌভাগ্যবর্তী হবে। কেননা আমি আখেরী নবী, তোমার স্বামী তোমাকে নিজে কবরে শায়িত করে রেখে আসবো এর চেয়ে সম্মানের আর কি হতে পারে? আয়শা (রা.) রসিকতা করে বললেন, হ্যাঁ আমি আগে মৃত্যুবরণ করি আর আপনি আর একজন বিবি এনে আনন্দে কাটাতে পারেন। এথেকে তাদের মধ্যে দাম্পত্য জীবনের মধুর সম্পর্কের কথাও জানা যায়। রসূল (স.) আয়শাকে বললেন, আয়শা! খয়বারের ইহুদীনী মহিলার সেই বিষ মিশানো খাবার এখনো আমাকে পীড়িত করছে। মহানবী (স.) কখনোই জামায়াত ছাড়া ফরজ নামাজ আদায় করেননি। যখন থেকে জামায়াতবদ্ধ ভাবে নামাজ ফরজ হয়েছে। সর্বশেষে যখন বেশি অসুস্থ্য হয়ে পড়লেন। তখন তিনি সতের ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে যেতে পারেননি। শেষ যে নামাজে গিয়েছেন তখনকার অবস্থা ছিল অন্যান্য দিনের মত হযরত বেলাল আজান দিলেন। কিছুক্ষন পর বেলাল মহানবী (স.) কে এসে ডাক দিলেন রসূল (স.) জামায়াতের সময় হয়েছে। মহানবী (স.) বললেন আমি বোধহয় একাকী জামায়াতে যেতে পারবোনা তুমি কাওকে ডেকে নিয়ে এসো। তিনি হযরত আলী অথবা অন্য একজন সাহাবী নিয়ে এলেন। মহানবী (স.) দু’জন সাহাবীর কাঁধে ভর দিয়ে জামায়াতে চলে গেলেন। অসুস্থতার কারণে দাড়াতে পাড়ছেননা। তিনি বসলেন। আর আবু বকরকে পাশে ডাকলেন। বেলালকে ইকামত দিতে বললেন। তখন মহানবী (স.) বললেন, হে আবু বকর! তুমি আমার অনুসরণে নামাজ পড়বে আর তোমরা সবাই আবু বকরের অনুসরণে নামাজ পড়বে। সেভাবেই শেষ হলো। এটা হলো জোহরের নামাজ। নামাজ শেষে রসূল সাহবীদেরকে কিছু কথা বললেন, “তোমরা কেউ শিরকে লিপ্ত হবেনা। বিদেশ হতে আগত দূতদেরকে সম্মান করবে। সাবধান আমার কবরকে তোমরা পুজা করবেনা। কেননা নবী রাসূলদের কবর পুজা করে বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর পরের ওয়াক্ত অর্থাত্ আসরের ওয়াক্তের সময় আসল। বেলাল ডাক দিলেন। রসূল (স.) বললেন, বেলাল! আমি বোধ হয় আর জামায়াতে যেতে পারবোনা তুমি হযরত আবু বকরকে নামাজ পড়াতে বলো। যখন নামাজ চলছিল তখন রসূল (স.) আয়েশাকে বললেন, আয়েশা! হুজরার পর্দাখানা একটু সরিয়ে দাও আমি নামাজরত আমার সাহাবীদের কাতারগুলি একটু দেখতে চাই। আয়শা পর্দা সরিয়ে দিলে মসজিদের মধ্যে রসূল (স.) এর দৃষ্টি পড়লো। সাথে সাথেই মলিন চেহারাটা আলোকে উদ্ভাসিত হলো। আয়শা (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, প্রচণ্ড অসুস্থতার কারণে আপনার চেহারাটা মলিন কিন্তু আপনি মসজিদের দিকে তাকাতেই আপনার চেহারা উজ্জল হয়ে গেল তার কারণ কি? মহানবী (স.) বললেন, আমি দেখলাম আমার অবর্তমানে আমার সাহাবীরা নামাজে ব্যতিক্রম করে নাই। ঠিক আমার মত সুন্দর করে নামাজ পড়ছেন। এই দৃশ্য দেখে আমার হূদয় কন্দরে আনন্দের হিল্লোল প্রবাহিত হয়েছে তাই আমার চেহারা আলোকিত হয়েছে। বৃহসপতিবার আসরের নামায়াজের পর হতে আর মসজিদের জামায়াতে যেতে পারেনি। এরপর ধীরে ধীরে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। গোটা মদিনা নগরী নীরব নিস্তব্দ। সোমবার সুবেহ সাদিকে বেলালের আজান নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে জাগিয়ে দিল সব মানুষদেরকে। রসূল (স.) ইশারায় ফজরের নামাজ আদায় করলেন। হযরত আয়শা (রা.) বললেন আমার হুজরার বাতি সে সময় নিভে গেল। মহানবী (স.) এর সকল সম্পদ এই মুহুর্তে এমন ভাবে শেষ হলো যে, বাতিজ্বালানোর তেলটুকুও ছিল না। অর্থাত্ তার প্রাণ প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগেই আলোর প্রদীপ নিভে গেল। হযরত জিব্রাইল (আ.) এসে বললেন হে রসূল (স.)! আপনাকে আল্লাহ সালাম দিয়েছেন। রসূল (স.) তখনই ধরাধাম হতে চিরবিদায় নেবেন। মেয়ে ফাতিমা সে সময় খুব কাঁদছিলেন। মহানবী (স.) ফাতেমাকে ডাকদিয়ে কি যেন বললেন। তার কান্না বন্দ হয়ে গেল। হযরত আয়েশা (রা.) ফাতেমাকে ডেকে বললেন তোমার আব্বা তোমার কানে কি বললেন, আর তোমার কান্না বন্ধ হয়েগেল? ফাতেমা বললেন, আব্বাজান আমাকে বলেছেন মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সবার মধ্যে আগে তাঁর সাথে আমার দেখা হবে। এর পর মালাকুল মওত আজরাইল (আ.) আসলেন। আর একটু পরেই জান কবজ হবে। জিব্রাইল (আ.) জিজ্ঞাস করলেন ইয়া রসূল (স.)! আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে। মহানবী (স.) বললেন হ্যাঁ, মৃত্যুর যন্ত্রণা খুবই কষ্টকর। জিব্রাইল (আ.) বলেন, ইয়া রসূল (স.) আপনাকে পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে কম কষ্টে জান কবজ করা হচ্ছে। মহানবী (স.) বলেন, আমারতো মনে হচ্ছে ওহুদ পাহাড়টি আমার বুকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রিয় পাঠক! গভীর ভাবে চিন্তা করুন, সবচেয়ে কম কষ্ট যদি এই হয় তাহলে যারা আল্লাহ বিরোধী, বিপদগামী, বেনামাজী মৃত্যুর সময় তাদের কি অবস্থা হবে? এরপর রসূল (স.) আস্-সলাত! আস্-সলাত!! অমা মালাকাত আইমানুকুম। নামাজ! নামাজ!! তোমরা তোমাদের অধীনস্থদের ব্যাপারে সাবধান থাকবে। এই কথা বলতে বলতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে গেলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট মহামানব আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)। ভোর না হতেই চারিদিকে আওয়াজ উঠল রসূল নেই! রসূল নেই!! সবাই যেন বাক্যরূদ্ধ হয়ে গেলেন। নিকটতম সকল সাহাবী খবর পেয়ে হাজির হলেন। হযরত ওসমান একবার হুজরার মধ্যে যান আবার বের হয়ে এসে লোকদের শান্ত করেন। সাহাবী উনায়েস (রা.) বেহুশ হয়ে গেলেন। হযরত ওমরের মত বড় বীর পাগল প্রায় হয়ে গেলেন। নাঙ্গা তরবারি বের করে বলছিলেন, যে বলবে মুহাম্মদ (স.) নেই, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব। এ খবর যখন হযরত আবুবকরের কাছে পৌছলো। তখন তিনি সুনুহ পল্লীতে অবস্থান করছিলেন। হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমার পিতা হযরত আবুবকর (রা.) একটি ঘোড়ায় চড়ে এলেন। ঘোড়া হতে নামলেন। কারো সাথে কোন কথা বললেন না। সোজা হুজরায় ঢুকলেন। রসূলের চেহারা হতে কাপড় উঠালেন। ললাটে চুম্বন করলেন। আর বললেন, হে প্রিয় বন্ধু! তুমি সত্যি ইন্তেকাল করেছো। এরপর তিনি মনটাকে হিমাদ্রির মতো শক্ত করে বাইরে এসে বললেন, হে জনমন্ডলি! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদের পূজারি তারা শোন, মোহাম্মদ (স.) ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর পূজারী, তারা শোন, সেই আল্লাহ চিরঞ্জিব, অমর। তিনি কখনো মৃত্যু বরণ করবেন না। হে ওমর! ঠান্ডা হও। অতঃপর তিনি কুরআনের ‘অমা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূল’ আয়াত পাঠ করলেন, যার অর্থ হলো মুহাম্মদ (স.) একজন রসূল ছাড়া আর অন্য কিছু নন। তার আগে বহু রসূল এসেছিলেন ও তারাও মৃত্যুবরণ করেছেন। সুতারাং যদি মুহাম্মদ (স.) ইন্তেকাল করেন, অথবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা তোমাদের পূর্বের অবস্থায় (জাহেলিয়াতে) ফিরে যাবে? হযরত ওমর (রা.) বললেন, যখন আবুবকর এই কথাগুলো বলছিলেন ও কুরআনের আয়াত পড়ছিলেন তখন আমার হাত থেকে তরবারি পড়ে গেল। ধীরে ধীরে পা ভারি হতে লাগলো। অবশেষে আমি বেহুশ হয়ে পড়ে গেলাম। আখেরী চাহার সোম্বায় যদি আমরা এ সমস্ত দৃশ্য ও কথাগুলো হূদয় পটে জাগরুক করতাম তাহলে আমাদের মন মানসিকতার আমুুল পরিবর্তন ও আলোর উন্মীলনে উদ্ভাসিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা কি হয়? তাই আমরা এবার আখেরী চাহার সোম্বা হতে শপথ নিয়ে রসূলের খাটি উম্মত হওয়ার লক্ষে তার প্রতিটি সুন্নাহ বা আদর্শকে আকড়ে ধরি ও আমলে জিন্দেগী গড়ে তুলে আল্লাহর রিজামন্দি হাসিল করি। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই তাওফিক দান করুন, আমিন।