অবরোধে হেফাজতের সমর্থন রয়েছে?

প্রকাশ:| শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি , ২০১৫ সময় ১০:৪০ অপরাহ্ণ

দেশ-বিদেশের শত শত মুসল্লির অংশগ্রহণে শুরু হয়েছে তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। শুক্রবার ভোরে ফজরের নামাজের পর আম বয়ানের মাধ্যমে শুরু আনুষ্ঠানিকতা। রোববার জোহরের নামাজের আগে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ইজতেমার প্রথম পর্ব।

তবে দেশজুড়ে চলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ চলার কারণে ইজতেমায় আসতে সমস্যায় পড়ছে মানুষ। বেশ কিছু সংগঠনের পক্ষ থেকে এই অবরোধ ইজতেমার সময় স্থগিতের আহ্বান জানানো হলেও বিএনপি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্ব ইজতেমার সঙ্গে অবরোধও চলবে।

এদিকে ১০ জানুয়ারির বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ১২ জানুয়ারি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। অবশ্য এটা ইজতেমার জন্য নয় বরং নিরাপত্তার স্বার্থে।

বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় বিষয়ে নানা মন্তব্য এবং কর্মসূচি পালন করলেও ইজতেমার সময়ে অবরোধের ব্যাপারে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না। যদিও নেতারা বিচ্ছিন্নভাবে এসময়টাতে অবরোধের বিপক্ষেই বলছেন। তবে অনেক নেতা বলছেন, সরকার হেফাজতকে পছন্দ করে না তাই তারাও চাচ্ছে অবরোধ চলুক, সরকারের পতন হোক।

বিশ্ব ইজতেমায় আগত দেশ-বিদেশের মুসল্লিরা যাতে কোনো বিড়ম্বনায় না পড়েন সে লক্ষ্যে ইজতেমা পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করার জন্য দেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা এবং ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, ‘ইজতেমা মোসলমানদের বড় একটি জমায়েত। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি গৌরবের বিষয়। তাই এই আয়োজন সফল করতে সকলের সহায়তা প্রয়োজন। সাধারণ মুসুল্লিরা এই অবরোধের কারণে দুর্ভোগে পড়বেন। উচিৎ ছিল ইজতেমার সময় অবরোধ প্রত্যহার করা।’

অবরোধ নিয়ে হেফাজতের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, ‘আমি বেশকিছু দিন যাবৎ ওয়াজ মাহফিল নিয়ে ব্যস্ত আছি। এখনো ঢাকার বাইরে আছি। ফলে হেফাজত এই বিষয়ে কোন অবস্থানে আছে, কী পরামর্শ করেছে আমি জানি না। তবে মোসলমান হিসেবে সবাই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় এমন প্রতিবন্ধকতা চাইবে না। কেন ইজতেমার সময় অবরোধ রাখলো তার কারণ বুঝতে পারছি না। মানুষের মনের বিরূপ প্রভাব পড়বে। আমি ঢাকায় থাকলে হেফাজতকে পরামর্শ দিতাম অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানোর জন্য।’
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী মনে করেন অবরোধের ফলে বিএনপিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতো দিন আন্দোলন ছিল না। এখন ইজতেমার সময়ে এই অবরোধ ইসলাম বিরোধীদের উৎসাহিত করবে বলেই তিনি মনে করেন।

মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী একই সঙ্গে হেফাজতের ইসলামের নেতাও। হেফাজতের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। কেন্দ্রীয় নেতারা হয়ত এই বিবেচনায় কোন কিছু নেই। তবে কেন্দ্রীয় নেতারা ভালো বলতে পারবেন। এই বিষয়ে আমি তেমন কিছুই জানি না।’

হেফাজতে নেতা মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াছেল মনে করেন অবরোধ প্রত্যাহার বা ইজতেমা অবরোধের আওতামুক্ত এমন ঘোষণা পরিষ্কার ভাবে এলে ভালো হত।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় বায়তুল মাল সম্পাদক মাওলানা আতাউল্লাহ আমীনও একই মত দেন।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হেফাজত নেতা বলেন, হেফাজত ইসলামকে আওয়ামী লীগ সরকার ভালো চোখে দেখে না। হেফাজতও এই সরকারের পতন চায়। আর এই অবরোধ সরকার পতনের, তাই এই অবরোধে হেফাজতের সমর্থন রয়েছে। এছাড়াও বিএনপি জোটভুক্তগুলোর নেতারাও হেফাজতের নেতা তারাও চায় না এই বিষয়ে হেফাজত কিছু বলুক।

‘খেল-তামাশা’ না করতে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে হেফাজত
দেশের মানুষের অধিকার নিয়ে ‘খেল-তামাশা’ না করতে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে হেফাজত। তারা বলেছে, দেশে মানবাধিকার বলতে কিছুই নেই। সরকার পুলিশ দিয়ে মানুষকে জিম্মি করছে; গুম-খুনের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। সরকারের ইন্ধনে লুটেরা বাহিনীতে পরিণত হয়েছে পুলিশ। এভাবে দেশ চলতে পারে না।

শুক্রবার হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন ইকরামের পাঠানো এক বিবৃতিতে এই হুঁশিয়ারি করেন হেফাজতের নেতারা। দেশের মানুষ এ ধরনের ‘জুলুমবাজের’ সমুচিত জবাব দেবে বলেও বিবৃতিতে হুঁশিয়ার করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, “হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আন্দোলন একক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন অধিকার আদায়ের আন্দোলন। সন্ত্রাসবাদ, জুলুমবাজ, মিথ্যাবাদীদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন চলবে।”

ক্ষমতাসীনদের হুঁশিয়ার করে হেফাজতের নেতারা বলেন, “দেশের মানুষের অধিকার নিয়ে খেল-তামাশা করবেন না। আজকে মানবাধিকার বলতে কিছুই নেই। পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করছে পুলিশ। যে পুলিশকে জনগণের টাকা দিয়ে বেতন-ভাতা দেয়া হয়, সেই পুলিশ সরকারের ইন্ধনে লুটেরা বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। এভাবে দেশ চলতে পারে না।” জনগণকে প্রতিরোধের হাতিয়ার নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করা হয় বিবৃতিতে।

বিবৃতিতে বলা হয়, “হেফাজতের আন্দোলন দল-মতনির্বিশেষে সব দেশপ্রেমিক কৃষক-শ্রমিকের আন্দোলন। এই আন্দোলনকে বর্তমান সরকার ভয় পায়। কারণ তারা দেশের মঙ্গল চায় না। তারা পুলিশ দিয়ে মানুষকে জিম্মি করে আর গুম-খুনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়।”

এই সরকারের আমলে ইসলাম ও গণতন্ত্র নিরাপদ নয়, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে হেফাজতের নেতারা বলেন, “দেশের সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধরাও নিরাপদ নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মন্দির ভাঙার ঘটনা ঘটে। তারা সাপুড়ের মতো একদিকে দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায়, অন্যদিকে তাদের জন্য মায়াকান্না দেখায়।” হেফাজতের ১৩ দফা বাস্তবায়ন হলে দেশের সংখ্যালঘু কৃষক-শ্রমিক তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে বলে দাবি করেন নেতারা।

বিবৃতিদাতারা হলেন হেফাজতের নায়েবে আমির আল্লামা শামশুল আলম, আল্লামা আহমদ উল্লাহ আশরাফ, আল্লামা মুফতি হাফেজ আহমদ উল্লাহ, আল্লামা মুফতি মুজাফ্ফর আহমদ, আল্লামা আবদুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর, আল্লামা নুর হুসেন কাসেমী, আল্লামা ইদরিস, আল্লামা আবদুল মালেক হালিম, আল্লামা তাফাজ্জুল হক, আল্লামা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী, আল্লামা হাফেজ তাজুল ইসলাম, মহাসচিব আল্লামা জুনাঈদ বাবুনগরী, আল্লামা লুকমান হাকিম, আল্লামা মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা সাজেদুর রহমান, মাওলানা জুনাঈদ আলহাবিব, মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা ছলিমুল্লাহ, মাওলানা মঈনুদ্দীন রূহী, মাওলানা আনাছ মাদানী, মাওলানা কাতেব ইলিয়াছ ওসমানী প্রমুখ।