অন্ধকারে আলোর দিশা,বিদ্যুৎ ছাড়া চলে পরিবেশবান্ধব বোতল বাতি

প্রকাশ:| শনিবার, ২৩ নভেম্বর , ২০১৩ সময় ১১:৫১ অপরাহ্ণ

প্লাস্টিকের বোতল থেকে সৌর বিদ্যুতের বাতি এবং ওয়াটার হিটার, ফেলে দেওয়া আবর্জনা থেকে বাড়ি নির্মাণের উপাদান এবং প্লাস্টিক ব্যাগ ছাড়া কাজ চালিয়ে নেওয়া, এমন কয়েকটি প্রকল্পের অংশ, যার মাধ্যমে প্লাস্টিকের উপাদানের ব্যবহার কমিয়ে আনা, এবং এগুলোর পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি কেবল নিছক মজা বা গ্রহণযোগ্য দামে জিনিষ পাওয়ার বিষয় নয়, একই সাথে সারা বিশ্বের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ।বোতল বাতি

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ সংকট খুবই সাধারণ একটি বিষয়। ব্যাপারটি একই সাথে বেশ দুঃখজনকও বটে। উন্নত দেশগুলোতে যখন কয়েক বছরে কালেভদ্রে দু’-একবার লোডশেডিং হয় সেখানে আমাদের দেশে এমন অনেক অঞ্চল আছে যেখানে এখনও বিদ্যুতই পৌঁছায়নি। আর বড় বড় শহরগুলোতেও দিনে গড়ে ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় চেষ্টা যে কম করা হচ্ছে না, তা নয়। নিত্যনতুন প্রযুক্তিও আবিষ্কৃত হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এসব আবিষ্কারের প্রতি সরকারি তেমন কোন পৃষ্ঠপোষকতা থাকে না বিধায় অধিকাংশ সময়ই এগুলো লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায় কিংবা কিছুদিন পর চাপা পড়ে যায়। এরকমই কার্যকরী অনেক আবিষ্কারের মধ্যে একটি নিয়ে আজ আলোচনা করব। যার নাম হচ্ছে ‘বোতল বাতি’।

বোতল বাতি। হ্যাঁ, শুনতে খানিকটা অদ্ভুত লাগতে পারে। তবে এটাই সত্যি যে বোতলের সাহায্যেই এখন অনেক ঘরে ঘরে জ্বলছে বাতি। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই বাতি জ্বালাতে কোন বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই। নেই কোন পরিবেশ দূষণ। যারা ভাবছেন, “বাপরে! বিদ্যুৎ লাগবে না, পরিবেশ দুষিত হবে না। নিশ্চয়ই অনেক হাই টেক যন্ত্রপাতি হবে বুঝি!”, তাদের বলি, না, এতে খরচও পড়বে একেবারেই নগণ্য। প্রতিটি বাতির পেছনে খরচ হবে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা। আর কোন রকম যত্নআত্তি ছাড়াই জ্বলবে টানা ৫ বছর!
কি? অবাক হচ্ছেন? আচ্ছা ঠিক আছে, চলুন জেনে নেই আসলে কি জিনিস এই বোতল বাতি, আর কীভাবেই বা কাজ করে এটি।
‘বোতল বাতি’ কি?

এই প্রযুক্তিতে সাধারণ একটি কাঁচ অথবা প্লাস্টিকের বোতল বাতি হিসেবে কাজ করে। বোতলে বিশুদ্ধ পানি ও ৩ চামচ (১০ মিলিলিটার) ব্লিচ কিংবা তরল ক্লোরিন দ্রবণ মিশ্রিত করে বোতলের মুখ ভালোভাবে গালা দিয়ে বন্ধ করা হয়। এরপর ১ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১ ফুট প্রস্থ আয়তনবিশিষ্ট একটি টিন মাঝখানে ছিদ্র করে বোতলের গায়ে লাগিয়ে দেয়া হয়।

বাড়ি বা বাসার ছাদের টিনটি বোতলের পরিমাপে ছিদ্র করে ওই স্থানে বোতল স্থাপন করা হয়। স্থাপনের সময় বোতলের ১ তৃতীয়াংশ টিনের উপরিভাগে এবং ২ তৃতীয়াংশ ঘরের ভিতর রেখে বোতলটি বসানো হয়। বৃষ্টির পানি ঘরে প্রবেশ না করার জন্য বোতলের চতুর্দিকে গালা দিয়ে শক্ত করে আটকে দেওয়া হয়।

কিভাবে কাজ করে?
স্বাভাবিক অবস্থায় টিনের চালে ছিদ্র করলে দিনের বেলায় সূর্যের আলো সেখান দিয়ে একটি সরলরেখা আকারে ঘরে প্রবেশ করবে। কিন্তু পানিভর্তি বোতলের উপরের অংশে সূর্যের আলো পড়লে সে আলো প্রতিফলিত হয়ে বোতলের পানির সাহায্যে ঘরের ভিতর সমানভাবে আলো ছড়িয়ে পড়বে। যা কিনা ৫৫ ওয়াটের একটি এনার্জি বাল্বের আলোর সমতুল্য। রাতের বেলায় বোতলের মধ্যে রাস্তার কোন বাতির আলো পড়লে তাও প্রতিফলিত হয়ে ঘর আলোকিত করবে। বোতলে ক্লোরিন অথবা ব্লিচ মিশ্রিত পানি পরবর্তী ৫ বছর পর্যন্ত বদলানোর প্রয়োজন হবে না। একটি বোতল বাল্ব তৈরি করে বাড়িতে স্থাপন করলে সূর্যের আলো থেকে এই বাল্বটি কোনরকম খরচ ছাড়াই টানা ৫ বছর পর্যন্ত নিয়মিত আলো দিয়ে যেতে সক্ষম।
সুবিধা

এই বাল্ব ব্যবহারে কোন বিদ্যুৎ খরচ নেই। সূর্যের আলোই এই বাল্বের মূল বিদ্যুৎ শক্তি। এ প্রযুক্তি প্রস্তুতকরণে প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো সহজলভ্য এবং দামেও সস্তা। এটি পরিবেশবান্ধব ও কোন প্রকার দুর্ঘটনার ঝুঁকি নেই। সারা বছরই আলোর নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। নিজ চেষ্টাতে এটি বাড়িতে বসেই তৈরি করা সম্ভব।

সীমাবদ্ধতা
এটি স্বাভাবিক অবস্থায় কেবলমাত্র দিনের বেলায় আলো দিতে সক্ষম।
তবে এরও সমাধান রয়েছে। যদি ছাদে সৌর প্যানেল লাগানো থাকে তবে বোতলের মাধ্যমে দিনের আলো ভিতরে আসে৷ তখন বোতল-বাতির নীচে সৌরশক্তি চালিত বাতি ঠিকমতো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়৷ দিনের বেলায় তা চার্জ হয়ে যায়৷ ফলে রাতেও আলো পাওয়া সম্ভব। তবে এর জন্যে স্বাভাবিকভাবেই খরচ খানিকটা বেশি পড়বে।

কোথায় ব্যবহার করা যাবে?
দেশের বিদ্যুত্ ঘাটতি অনেকাংশে পূরণসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিদ্যুত্ চাহিদা মেটাতে এ প্রযুক্তি অনেকটাই কার্যকর। দেশের অনেক জনগোষ্ঠীই দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে থাকেন। আবার যেসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ নেই সেসব অঞ্চলের মানুষদের জন্যে বোতল বাতি হতে পারে একটি আশীর্বাদ। পার্বত্য এলাকায় বিশেষভাবে এ প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এছাড়া শিল্পকারখানার টিনের ছাদে এর বহুল ব্যবহার বিদ্যুৎ খরচ কমিয়ে আনবে বহুলাংশে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও সম্ভব।