অনুপম একজন বড় পন্ডিত, একজন বড় মানুষ

প্রকাশ:| বুধবার, ৫ আগস্ট , ২০১৫ সময় ০৯:৫৮ অপরাহ্ণ

অনুপম একজন বড় পন্ডিত, একজন বড় মানুষ

উপমহাদেশের খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী ড.অনপুম সেনের পঁচাত্তরতম জন্মজয়ন্তীতে বরেণ্য বুদ্ধিজীবী প্রফেসর ইমিরেটাস ড.আনিসুজ্জামান বলেন, ‘অনুপম বড় পন্ডিত, বড় মানুষ, একজন সমাজ সচেতন কর্মী। তিনি দেশকে অনেক কিছু দিয়েছেন। আমরা তার কাছে অনেক ঋণী। তিনি অনেক ঋণে আমাদেরকে আবদ্ধ করেছেন। অনুপম দীর্ঘজীবন লাভ করুক, তার কাছে আমাদের ঋণ আরও বাড়ুক। ’ বক্তব্য দিয়ে মঞ্চে আসার পর নিজের শিক্ষক আনিসুজ্জামানের পা ছুঁয়ে আর্শীবাদ নেন অনুপম সেন।

শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে আনিসুজ্জামান বলেন, অনুপম সেন বলতে পারেন। দীর্ঘসময় ধরে বলতে পছন্দ করেন। এজন্য অনেক সময় আমরা তার সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করতাম। তিনি বিনয়ের সঙ্গে মেনে নিতেন।

‘কিন্তু অনুপম সেনের এত জানাশোনা যে তিনি কোন বিষয়কে বৃহৎ পটভূমিতে, সামগ্রিক পটভূমিতে স্থাপন করে এর তাৎপর্য অনুধাবন করতে চান। সামগ্রিক বিষয়টিও উঠে আসে তার বক্তব্যে। ’ বলেন আনিসুজ্জামান।

তিনি বলেন, অনুপমের লেখার মধ্যে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দু’টি দিকই আছে। দু’টো দিকেই তিনি সমান সফল। এজন্য আমরা বলতে পারি, অনুপম বড় পন্ডিত, বড় মানুষ। তার মধ্যে অনেক গুণের সমাহার।
অনপুম সেন
‘অনুপম সেন সামাজিক দায় স্বীকার করেছেন, আমরা যারা তাকে জানি, তার চরিত্রের বিভিন্ন গুণ সম্পর্কে জানি, এটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক। ’ আনিসুজ্জামানের বিশ্লেষণ।

তিনি বলেন, অনুপম সেন আমাকে শিক্ষক বলেছেন। যদিও আমি বাংলার শিক্ষক আর অনুপম সেন যে বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন, সেখানে বাংলা নেই। তারপরও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন আর আমি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলাম। সেই সূত্রে তিনি আমাকে শিক্ষক বলেছেন, মাঝে মাঝে আমার ক্লাশে যেতেন বলেছেন। বিষয়টি আমার জন্য গর্বের।

আনিসুজ্জামান বলেন, অনুপম যখন বুয়েটে শিক্ষকতা করেন তখন তার সঙ্গে আমার পরিচয়। ১৯৬৯ সালে অনুপম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন, আমি কিছুদিন পর যোগ দিই। তারপর আমরা বেশ কিছুকাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে শিক্ষকতা করেছি।

‘১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমি আর অনুপম চট্টগ্রামে ফিরলাম। শহরে অনুপমের বাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আমার বাসা-দু’টো বাসাই লুট হয়। আমার বাসায় শুধুমাত্র তিনটি প্লেট রেখে গিয়েছিল। সম্ভবত আমি, আমার স্ত্রী আর মেয়ের কথা ভেবে রেখে গিয়েছিল। তো, আমি একদিন নিউমার্কেট গেলাম। জিনিসপত্র কিনতে হবে। নতুন করে সংসার পাততে হবে। সেখানে অনুপমের সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, স্যার আপনি কিন্তু টি সেট কিনবেন না। আমার বাসায় দুই সেট রেখে গেছে। আমি এক সেট আপনাকে দেব। অনুপমের এই ঔদার্য্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ’ এভাবে স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান আনিসুজ্জামান।

জন্মজয়ন্তীতে ভক্ত-শুভাকাঙ্খীদের শুভকামনা গ্রহণ করে অনুপম সেন বলেন, আজকের আয়োজনে আমি কালের যাত্রার ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। আমাকে যেন বলা হচ্ছে, তোমার সময় আর বেশি নেই। আমি সামান্য মানুষ। আমি আপনাদের ভালবাসার যোগ্য কিনা জানিনা। তবে আপনাদের ভালবাসায় আমি ধন্য। আমি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কর্মক্ষম থাকতে চাই।

বাংলানিউজের সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রসঙ্গ টেনে অনুপম বলেন, আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কি অমর হতে চান? এই প্রশ্নে আমি প্রথমে থতমত খেয়ে যাই। কিছুক্ষণ চিন্তা করে আমি বলি, চাঁদ যদি সারাবছর আলো দেয়, ফুল যদি ঝরে না পড়ে তাহলে ফুল আর চাঁদের মূল্য কি?

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনও ২৩ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। একাত্তরে ৬০ শতাংশ লোক দারিদ্যসীমার নিচে বাস করত। সেদিক থেকে আমরা অনেকদূর এগিয়েছি।

‘বাংলাদেশে কিছু লোকের হাতে সম্পদ পূঞ্জীভূত হয়ে আছে। আমরা ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলাম। আবার আন্দোলন করতে হবে। বহুদিন ধরে রাস্তায় থাকতে হবে। মানুষর অধিকার আদায়ের জন্য আবারও রাস্তায় যেতে হবে। ’ শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ডাক অনুপমের।

চট্টগ্রাম একাডেমি আয়োজিত ‘ভেঙেছ দুয়ার-এসেছ জ্যোতির্ময়’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শহীদ জায়া বেগম মুশতারি শফি। এতে আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড.মাহবুবুল হক ও গোলাম মুস্তাফা, কবি ও সাংবাদিক আবুল ‍মোমেন, কথাসাহিত্যিক ফেরদৌস আরা আলীম এবং জন্মজয়ন্তী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আনোয়ারা আলম বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে ড.অনুপম সেনকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন আনিসুজ্জামান। তার হাতে সম্মাননা এবং উপহারও তুলে দেন আনিসুজ্জামান। তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার প্রথম দিনে একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন সনজীব বড়ুয়া ও শুভ্রা বিশ্বাস এবং দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের শিল্পীরা।