অনুজের জন্মদিনে … ভালোবাসা

প্রকাশ:| শুক্রবার, ১ জানুয়ারি , ২০১৬ সময় ১১:২৩ অপরাহ্ণ

অজয় দাশগুপ্ত:: আমাদের দেশে বেশ কিছু অদ্ভূত নিয়ম চালু আছে। অনুজদের সম্মান জানানো কে আমরা প্রেস্টিজ মেটার বলে বিবেচনা করি। খুব বাধ্য না হলে বয়সে ছোটদের আমরা পাতে নিতে চাই না। এমনকি তাদের আকাশ ছোঁয়া প্রতিভার দ্যূতি থাকলেও না। আরো একটা বিষয় বড় গোলমেলে মরণোত্তর সব কিছুতেই আগ্র্হ আমাদের। জীবদ্দশায় কাউকে সম্মান জানানোর আনন্দ ও ভালোলাগা বঞ্চিত সমাজে আমাদের তারুণ্য এমনকি তারুণ্য পেরিয়ে যাওয়া মানুষ ও প্রহর গুনতে গুনতেই জীবন পাড়ি দিয়ে দেয়। এই প্রবনতা মানুষের বৃদ্ধি বা বেড়ে ওঠায় সাহায্য করে না। উন্নত দেশ ও আধুনিক সমাজে এমন কোন অলিখিত বা স্ব আরোপিত বিধি নিষেধ নেই। বরং পক্ক কেশ মানুষকে দেখি তারুন্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তারুণ্য ও অবলীলায় বড়দের প্রশংসা বা নিন্দা করতে অভ্যস্ত। তবে একটা নির্দিষ্টগণ্ডি বা আওতার বাইরে পা বাড়ায় না এরা। প্রশংসা বা সমালোচনা কখনোই স্তাবকতা বা নিন্দা পর্যন্ত গড়ায় না। পরিমিতি বোধ আর সৌজন্যে বড় হ ওয়া সমাজ তাই সুষম ও সুন্দর।

১ জানুয়ারি নববর্ষের পাশাপাশি আমার অনুজপ্রতিম এক শিশু সাহিত্যিকের জন্মদিন। এই লেখকের বেড়ে ওঠা ও অগ্রযাত্রার সাথে আমার পরিচয় শুরু থেকে। মফস্বল থেকে চট্টগ্রামে আসা তরুণের ছড়া চর্চার পাশাপাশি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দানের ইচ্ছে আমাকে তার প্রতি কৌতুহলী করে তোলে। তখনো কোন পেশা বা চাকরি শুরু করেনি। নানা ভাবে জীবন শুরুর সুযোগ থাকার পর ও তখনকার অনিশ্চিত পেশা সাংবাদিকতা কেই বেছে নেয়। চট্টগ্রামের  সাংবাদিকতা জগতে তখন একদিকে বয়সী মানুষদের ভীড় অন্যদিকে পরিবর্তনের প্রতি অনীহা। তার মত তরুণদের প্রয়োজন যখন তুঙ্গে তখনই তার আবির্ভাব ঘটে। জনপ্রিয় প্রাচীন দৈনিক আজাদীর বয়সী মানুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা এই তরুণ ধীরে ধীরে নিজের অবস্হান শক্ত করে কখন  যে  আমাদের ভরসাস্হল হয়ে উঠল তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি।

যা হয়  সমাজের মত আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গন ও বহুধা বিভক্ত। আমরা যারা ছড়া লিখি কবিতা লিখি গান গাই বা আবৃত্তি করি আমাদের ভেতরের ভাঙ্গনও ব্যাপক।  বরং সাধারণ মানুষের চেয়ে বিদ্যা বুদ্ধি  আর মেধায় এগিয়ে থাকার কারণে আমাদের বিরোধ অন্তহীন এবং কৌশলের মারপ্যাঁচে ভয়ঙ্কর। তখনকার এই তরুণ ও আমাদের এই বিরোধিতার বাইরে থাকতে পারেনি। শুরু থেকে তার প্রতি শর্তহীন ভালোবাসা আর অনুরাগ থাকার পর ও আমাদের সম্পর্ক পড়েছিল সংকটের গ্যাড়াঁকলে। তরুণের  না ছিল কোন পছন্দ না নিজের অবস্হানে দৃঢ থাকার কোনো সুযোগ। তারপরও  ছড়া উৎসবকে ঘিরে আমাদের সম্পর্কের টানাপড়েন সামাল দেয়ার ভেতর এই তরুণের যে দূরদর্শিতা সেটাই শেষ পর্যন্ত টিকে রইল। দূরে হটে গেল ষড়যন্ত্র আর উস্কানিদাতার দল।

জীবনের একপ্রান্তে আমি চলে আসলাম বিদেশে। অভিবাসী  হয়ে প্রশান্তপাড়ের এই দেশে থিতু হবার পর আমার লেখালেখির এক অনিবার্য বাহন হয়ে রইলো এই তরুণ। দেশে গেলে তার আন্তরিকতা আর উৎসাহে ছড়া উৎসব উদ্বোধনের মত জটিল কাজ ও করতে হয়েছে। অনুষ্ঠান আড্ডা আর নানা জাতীয় আয়োজনে সতীর্থ অগ্রজ অনুজ ও দেশ বরেন্যদের একমঞ্চে হাজির করতে জুড়ি নেই তার। আমি এখন এ কথা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি তাকে ছাড়া চট্টগ্রামের সাহিত্যাঙ্গন অচল। দেশের বুদ্ধিজীবীদের সম্মান জানিয়ে সচল রাখার কাজ করে চলা তাকে এখন আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। পারবে না জেনেই এক শ্রেণির উন্নাসিকরা তাকে হয় এড়িয়ে চলে নতুবা তথাকথিত মানদণ্ডের প্রশ্নে নিজেদের চেহারা আড়াল করে চলে।

কিন্তু তার জ্যোতি বাড়ছেই, বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে সাংবাদিকতার নেতৃত্বে শিশু সাহিত্যে সম্পাদনায় তার কলম ও ভূমিকা এখন সবার নজর কাড়ছে। মেঘে মেঘে বেলা বাড়ে সময় বয়ে যায়। সেদিনের সে তরুণ ও আ্জ প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না রাশেদ রউফ দাঁড়িয়ে  আছে পঞ্চাশে(৫২)। সুগৃহী পুত্র কন্যা গুনবতী পত্নী শিমুকে নিয়ে সুখের সংসারে অতীতের বেদনা আজ ছায়া মাত্র। শিমুর মত সুকন্যা এমন বাঙালি নারী আজ সত্যি বিরল। দূর দেশ থেকে নানা কারণে ঈর্ষা করা রাশেদের এই জন্মদিনে আমি তার শতায়ূ কামনা করি। চট্টগ্রামের গৌরবকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি নিজের সৃষ্টির আলোয় দেশ আলোকিত করে চলা রাশেদের জয়ে আমাদের জয়। সে বারবার সেটাই প্রমাণ করে চলেছে। আমরাও যেন তাকে সে ভাবে ভালোবাসি।

অজয় দাশগুপ্ত দার লিকাটি রাশেদ ভাই এর পঞ্চাশ তম জন্মদিন উপলক্ষে ২০১৩তে লেখা

 


আরোও সংবাদ