অনিয়ম-দূর্নীতি ও কাঠ পাচারের হিড়িক

প্রকাশ:| সোমবার, ১৫ জুন , ২০১৫ সময় ০৯:১৪ অপরাহ্ণ

পাহাড় কাটা

শওকত হোসেন করিম,ফটিকছড়ি প্রতিনিধি॥
ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ণহাট রেঞ্জের চারটি বনবিট অফিসে নানান অনিয়ম দূর্নীতি ও সংরক্ষিত বনায়ন থেকে কাঠ পাচারের হিড়িক পড়েছে। বিধি ভঙ্গ করে একজন বিট কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নারায়ণহাট রেঞ্জে অফিসের নিয়ন্ত্রণে দাতমারা বনবিট, নারায়ণহাট বনবিট, বালুখালী বনবিট ও ধুরুং বনবিট রয়েছে। ৩-৪ বছর নারায়ণহাট বনবিটের কর্মকর্তা ছিলেন মো. ইছমাইল হোসেন। সম্প্রতি তাকে ধুরুং বনবিটে বদলী করা হয়েছে। এদিকে রেঞ্জ কর্মকর্তা আলী আকবর কাজী বদলী হওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে। যা সরকারী চাকুরী বিধিমালা ভঙ্গের সামিল।
২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে এই চার বনবিটের ২০০৪-০৫ সালের সামাজিক বনায়নের বাগান নিলাম হয়েছে। নিলামের তালিকা তৈরীর সময় গাছ ব্যবসায়ী, কতিপয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে আঁতাত করে শুভঙ্করের ফাকি রাখা হয়েছে। আবার গাছ কর্তন করার সময় লট প্রতি ২০-২৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নিচ্ছে বন কর্মকর্তা ও বন প্রহরীরা। গাছের টিপি তৈরীর সময় ৩শ ঘনফুট গাছকে ২শ ফুট দেখানো হচ্ছে। নিলামের গাছ কর্তনের নামে সামাজিক ও রাজস্ব বনায়নের গাছও কর্তন করা হচ্ছে।
২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে সৃজিত বনায়নের উপকারভোগী নিয়োগেও ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। প্লট প্রতি ২০-৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে উপকারভোগী থেকে।
২০১৫-১৬ অর্থ বছরের সামাজিক বনায়নের জন্য প্লট প্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা করে অবৈধ অর্থ নিচ্ছে দাতমারা বিট কর্মকর্তা আশরাফ, বালূখালী বিট কর্মকর্তা আলাউদ্দিন, নারায়ণহাট বিট কর্মকর্তা মিনার, ধুরুং বিট কর্মকর্তা ইছমাইল ও সংশ্লিষ্ট বন প্রহরীরা।
বনবিট গুলোর প্রচুর জায়গায় ভূমিহীন উদভাস্ত মানুষ ও ভূমিহীন উপকারভোগীদের বসত ঘর রয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শন কালে তারা জানায়, এদের বসত ঘর প্রতি বুলুখালী বিট কর্মকর্তা আলাউদ্দিন ১০-১৫ হাজার টাকা করে নিচ্ছে। এবিটের আলয়িার ছোলা, কুমারী, পুজারঘাট, বান্ধরমারা, আনন্দপুর, ধৈলারখীল এলাকা থেকে দালাল ইছমাইলের মধ্যস্থতায় ব্যাপক বনায়নের গাছ কাটা হচ্ছে। এগুলো নারায়ণহাট-শ্বেতছড়া সড়ক দিয়ে প্রতিরাতে গাছ পাচার হচ্ছে। দাতমারা বিট কর্মকর্তা আশরাফের সহযোগিতায় ২০১০ সালের সামাজিক বনায়নের টিলা কেটে জমি তৈরী হচ্ছে। রামগড়, মানিকছড়ি থেকে এই বনের ভিতর দিয়ে ব্যাপক গাছ পাচার হচ্ছে। নারায়ণহাট বিট কর্মকর্তা মিনার কৈয়া, সাপমারা, হাপানিয়া, সন্ধিপ পাড়ার ভূমিহীন মানুষের কাছ থেকে ১০, ১৫, ২০ হাজার টাকা করে ঘর প্রতি চাঁদা নিচ্ছে। এরকম চাঁদা না দেওয়ায় গত ২৮ মে সাপমারা এলাকায় বেশ কিছু ভূমিহীন মানুষকে পিটিয়ে মামলা দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। সম্প্রতি বিট কর্মকর্তার যোগসাজসে এই বনের এক কিলোমিটারের ভিতর দুইটি ইটভাটা তৈরী করা হচ্ছে। ফটিকছড়ির ইউএনও এখানে অভিযান চালিয়ে এগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর নারায়ণহাট বিট কর্মকর্তা তাদের নামে মাত্র নোটিশ করে।
ধুরুং বিট কর্মকর্তা ইছমাইলের যোগদানের পর থেকে উত্তর কাঞ্চনপুর, নয়া বাজার, গাড়িটানার উত্তরের টিলা, কারবালা টিলা, কাঞ্চন নগর ও রাঙ্গামাটিয়া রাবার বাগার এলাকা থেকে সংরক্ষিত বনায়ন ও সামাজিক বনায়নের ব্যাপক গাছ কেটে গাছ পাচারকারীও ইট ভাটার মালিকের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এখান থেকে রাত দিন কর্ণফুলী চা বাগান হয়ে নানুপুর অঞ্চলে সব কাঠ পাচার হচ্ছে। এ জন্য বিট কর্মকর্তা মোটা অংকের অবৈধ টাকা লেনদেন করছে।
নারায়ণহাট ইউপি চেয়ারম্যান আবু জাফর মাহমুদ সিকদার বলেন, বালুখালী ও নারায়ণহাট বিট অফিসের নানান অনিয়ম দূর্নীতির কথা আমি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) আবদুল লতিফ মোল্লাকে অবহিত করা হয়েছে। আর ইটভাটা দুটি অপসারণ করতে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কাঠ পাচার রোধে ও বনাঞ্চল উজাড় রোধে উপজেলা চোরা চালান প্রতিরোধ কমিটির সভায় কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর নারায়ণহাট বিট সংলগ্ন দুইটি ইটভাটাকে প্রাথমিক ভাবে তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিতে এবং বন আইনে ব্যবস্থা নিতে বিট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফটিকছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল আলম বাবু বলেন, বন ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতরা যেখানে অনিয়ম দূনূীতি করে সেখানে বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্ভব নয়। নারায়ণহাট রেঞ্জ থেকে অবাধে কাঠ পাচার হচ্ছে দেখে একদিন আমি পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় কয়েক হাজার মন লাকড়ী ও বেশ কিছু গোলকাট আটক করে থানায় সোপর্দ করি। উপজেলা সমন্বয় সভা থেকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম উত্তর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. জগলুল হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, নারায়ণহাট রেঞ্জের ব্যাপারে অভিযোগ গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আরোও সংবাদ