অনিয়মের স্বর্গরাজ্য চট্টগ্রাম কারাগার!

প্রকাশ:| মঙ্গলবার, ৮ জুলাই , ২০১৪ সময় ০৮:৫২ অপরাহ্ণ

:: বিশেষ প্রতিনিধি ::

Jailঅনিয়ম, অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার। কারাগারের অসংখ্য অনিয়মকে সেখানে নিয়ম হিসেবেই দেখা হয়। নিয়ম-শৃঙ্খলার বদলে সব আসামীকে এসব অনিয়মের অধীনে থাকতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। কারাগারে আটক থাকা বেশ কয়েকজন আসামী কারাফটকে নিউজচিটাগাং২৪ডটকমকে জানিয়েছেন, কারাগারের অনিয়মগুলোর প্রতিবাদ নেই, প্রতিবাদের ভাষা নেই, সুযোগও নেই। কারাগারে বিনিময়ের মাধ্যম হচ্ছে সিগারেট। কেউ কোন অভিযোগ করলে বা একটু এদিক সেদিক হলে সংশ্লিষ্টদের সিগারেট দিতে হয় নতুবা নির্মম নির্যাতনের শিকার হন তারা।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়েছেন নগরীর শেরশাহ এলাকার মঞ্জুর আলম ও সাতকানিয়ার তারেক হোসাইন নামের দুই যুবক। স্বজনদের সাথে দেখা করার জন্য এই দু’জন কারাগারে এসেছিলেন গতকাল। কারা অভ্যন্তরে এ প্রতিবেদকের সাথে তাদের কথা হয়। কারাগারের ভেতরের অবস্থা কেমন প্রশ্নে মঞ্জুর আলম বলেন, ‘দুনিয়ায় যত ধরনের অনিয়ম আছে, সব সেখানে হয়। কারারক্ষী ও কয়েদিদের নিয়মিত সিগারেট দিতে না পারলে চলে নির্মম নির্যাতন। এককথায় দুনিয়ার জাহান্নাম হচ্ছে কারাগার।’

কারাগারের অনিয়ম প্রসঙ্গে তারেক হোসাইন অভিযোগ করে বলেন, ‘কারাগারে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে টাকার ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও পুরনোরা টাকা ব্যবহার করেন। নতুন আসামীরা টাকার পরিবর্তে সিগারেট ব্যবহার করেন। আমদানী থেকে ইনচার্জের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে ওয়ার্ডে নতুন আসামী প্রেরণ করা হয়। কয়েদিদের সিগারেট না দিলে নিম্ন মানের খাবার প্রদান করা হয়। এছাড়া পিসিতে বিক্রিত দ্রব্যের দাম খুব বেশী। বিভিন্ন অযুহাতে কারারক্ষীরা আসামীর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত সিগারেট (উৎকোচ) নেন। বাথরুমে পানি ব্যবহারের লাইন থাকলেও পানি সরবরাহ নেই। মাসে ১০ থেকে ৫০হাজার টাকার বিনিময়ে হাসপাতালে রাখা হয় সুস্থ মানুষকে। ঘুষ না দিলে কোর্ট থেকে দেরীতে আসামী এনে সারারাত ডান্ডাবেড়ী পড়িয়ে রাখা হয়। নির্ধারিত দুইটি পত্রিকা ছাড়া অন্য পত্রিকা নেই।’

তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘৫০০ জন বিশিষ্ট একটি ওয়ার্ডে সকালে ছোট হাউজে ৩০ মিনিট গোসলের জন্য পানি দেওয়া হয়। সেখানে তীব্র প্রতিযোগিতায় কঠোর পরিশ্রম করে কেউ কেউ গোসল করতে পারে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাড়িয়ে সারাদিন ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ৫ লিটার পানি সংগ্রহে রাখতে পারে।’

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, কর্মস্থলে প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ‘রহস্যজনক’ কারণে বদলি হন না চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ছগির মিয়া। আরো অভিযোগ উঠেছে, কারা অভ্যন্তরে দুই ক্যান্টিনের ব্যবসা চলে সিনিয়র জেল সুপারের নিয়ন্ত্রণে। বন্দির সাথে স্বজনদের সাক্ষাৎ সহ খাতে তিনি প্রতিদিন আয় করেন প্রচুর টাকা। অবৈধ আয়ের মাধ্যম হিসেবে আনজু মিয়া নামের একজন সুবেদারকে ব্যবহার করেন তিনি। এছাড়া কারারক্ষী হিসেবে তার ভাগ্নির জামাই আমিনুর, ২০১২ সালে তার ভাগিনা রিয়াজুল ইসলাম সুমন ও ভাতিজি আসমাকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। তাদেরকে কেবল কারারক্ষী হিসেবে দেখিয়ে বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হয়, এরা কারাগারে নির্ধারিত কর্তব্য পালন করেন না বলে কারা সূত্রে জানা গেছে।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ছগির মিয়া বলেন, ‘এসব আপনার শোনা কথা। অভিযোগগুলো মিথ্যা, ভিত্তিহীন। নিয়মের মধ্যেই চলছে কারাগার।’ ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনি ডেপুটি জেলার জাহেদুল আলমের সাথে কথা বলেন।’

কারাগারের ডেপুটি জেলার জাহেদুল আলম বলেন, ‘প্রত্যেকটি সরকারী প্রতিষ্ঠানেই সমস্যা রয়েছে। এখানেও যে নেই তা নয়। আমরা এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠার চেষ্ঠা করছি।’

বন্দীদের সাথে দেখা করিয়ে দেয়ার বিনিময়ে কারারক্ষীরা প্রকাশ্যে এক’শ পঞ্চাশ থেকে ১২’শ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে স্বজনদের কাছ থেকে। এক্ষেত্রে টাকা দেয়ার নিয়ম আছে কি না প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘টাকা নেয়ার কোন নিয়ম নেই। মানুষ টাকা দেওয়ায় তারাও নিচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’