‘‘অধ্যাপক খালেদ স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিরল নেতা ছিলেন’’

প্রকাশ:| বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর , ২০১৫ সময় ০৮:২৭ অপরাহ্ণ

এক বিরল নেতা ২
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি তরুণ বয়স থেকে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদকে দেখে আসছেন উল্লেখ করে বলেন, তিনি ধৈয্যশীল ছিলেন। তাঁর মত সত্যবাদী ও আদর্শ মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে খুব কম দেখেছি। জীবনে কোন পাওয়াকে তিনি কোনদিন তোয়াক্কা করেননি। সম্মান-খ্যাতি তাঁর পেছনে দৌঁড়িয়েছে, তিনি সেসবের পেছনে সময় ব্যয় করেননি।

নিজের রাজনীতির পেছনে অধ্যাপক খালেদের অসামান্য অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে তিনি আরো বলেন, আমার এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস। অত্যন্ত নীতিবান সাংবাদিক ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে অধ্যাপক খালেদকে নিলোর্ভ ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করে মন্ত্রী আরো বলেন, অর্থ বিত্তহীন অধ্যাপক খালেদ ধনাঢ্য ফজলুল কাদের চৌধুরীকে পরাজিত করে সারাদেশে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন।

তরুণ সমাজকে ন্যায় ও সত্যের পথে চলার অনুরোধ জানিয়ে বর্ষিয়ান এ রাজনীতিক বলেন, অধ্যাপক খালেদের নির্দেশিত পথে নিজেদের জীবন পরিচালিত করতে পারলে তোমাদের জীবন স্বার্থক হবে, সমৃদ্ধ হবে। অধ্যাপক খালেদ আওয়ামী রাজনীতি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের এক বিরল নেতা ছিলেন। ছিলেন আওয়ামী রাজনীতির এক বিরল বরপুত্র। সুতরাং এদেশের ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে চির জাগরিত থাকবে।

বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক, মনীষী অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গৃহিত কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় গত ৩০ ডিসেম্বর ’১৫, বুধবার বিকেল ৩টায় চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ মিলনায়তনে ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক ও অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে ‘গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ’ শিরোনামে স্মরণায়োজনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এক বিরল নেতা
পরিষদের সভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি মুহাম্মদ ওসমান গণি চৌধুরী’র সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক লেখক-সাংবাদিক শওকত বাঙালির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। প্রধান বক্তা ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক মেয়র আলহাজ এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কবি এজাজ ইউসুফী, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. শিরীণ আকতার, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুদ্দিন খালেদ বাহার, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ-সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, মহানগর যুবলীগ যুগ্ম আহবায়ক ফরিদ মাহমুদ, মো. হেলাল উদ্দিন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা কে.বি.এম শাহজাহান প্রমুখ।

প্রধান অতিথির হাত থেকে ‘মনীষী অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্মাননা স্মারক-২০১৫’ গ্রহণ করে অনুভূতি ব্যক্ত করেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বরেণ্য সাংবাদিক ও রম্য লেখক আতাউল হাকিম।

পরিষদের অর্থ সম্পাদক মুহাম্মদ মহসীন চৌধুরী এবং প্রচার প্রকাশনা সম্পাদক ও স্মরণায়োজনের সদস্য সচিব মঈনুদ্দিন কাদের লাভলু’র যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ মৃত্যুবার্ষিকী পালন উপ-কমিটি ’১৫-এর আহবায়ক মো. হেলাল উদ্দিন। পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বক্তব্য দেন মরহুমের পুত্র সাপ্তাহিক স্লোগান সম্পাদক মোহাম্মদ জহির। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন মুসলেহ্ উদ্দিন মুহম্মদ বদরুল, মো. হাসান মুরাদ চৌধুরী, আসাদুজ্জামান খান, মো. আমিনুল হক বাবু, ইফতেখার মারুফ, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা জাহেদুর রহমান সোহেল, পংকজ কুমার রায়, মোহাম্মদ নাছিমুল গণি চৌধুরী, শাহাজাদা সৈয়দ সিরাজুদ্দৌলা, নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এ্যানেল, শিক্ষিকা কাজী শাহনাজ সুলতানা, এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কে.এম মঈনুদ্দিন খান, মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন, আবদুল হাকিম, চৌধুরী আহসান খুররম, শওকত আল-আমিন, অ্যাডভোকেট শিবু চন্দ্র মজুমদার, ডা. আলী আহম্মদ খান, জহিরুল আলম চৌধুরী প্রমুখ।

প্রধান আলোচক সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর øেহ ও মমতাবোধ ছিল। তিনি সারা জীবন নীতি আদর্শের প্রতীক ছিলেন এবং স্বচ্ছ মনের অধিকারী ও সৎ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। চট্টগ্রামের সাংবাদিকের অভিভাবক হিসাবে তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিশ্বাসী ছিলেন। এ পেশায় তিনি শিক্ষা গুরু হিসেবে পরিণত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের জন্য তিনি সক্রিয় ছিলেন, স্বাধীনতার পরাজিত শত্র“রা যখন বাংলাদেশ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিল তখন প্রফেসর খালেদকে বিচলিত হওয়ার পাশাপাশি আমরা তাঁকে এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে দেখেছি।

তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সংগঠক হিসেবে অধ্যাপক খালেদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হবে। সংবিধান ও স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপর বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে। একাত্তরের চেতনায় দেশের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখতে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ দমন করে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

বিদেশীরা বাংলাদেশকে এখন আধুনিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সাফাল্যে আজ বিশ্বব্যাংকও বিস্মিত। প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ যদি এদেশে বাস্তবায়িত হয় তবেই অধ্যাপক খালেদসহ স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন, ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের সেই ত্যাগ অনেকাংশেই সফল হবে।

প্রধান বক্তা আলহাজ এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, মানুষের মৃত্যুর পর তার ভালো গুণাবলীগুলো ভেসে উঠে। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ বহুগুণে গুণান্বিত ব্যক্তি। নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল একজন সত্যিকার পুরুষ ছিলেন। বর্তমান ছাত্রদের নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত না হয়ে আদর্শবাদী হতে হবে। আচার-আচরণ ও পড়ালেখায় ছাত্রসমাজকে নিজেদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

মাদক ও জঙ্গিবাদ থেকে দেশকে রক্ষার জন্য ছাত্রদের অনন্য ভূমিকা রাখতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশকে শান্তি ও প্রজন্মকে আদর্শবাদী করে অধ্যাপক খালেদের মত জীবন গড়তে পারলে সুন্দর আগামী প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

আবদুচ ছালাম বলেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের মন, মেধা, কর্ম ও জীবনকে অনুসরণ করলে দেখা যায় তিনি ছিলেন সততা, আদর্শবাদীতা ও ন্যায়পরায়নতার মূর্ত প্রতীক। সাংবাদিকতায় এরকম শুদ্ধ পুরুষ বর্তমানে বিরল।
কবি এজাজ ইউসুফী বলেন, অধ্যাপক খালেদের মতো কৃতী পুরুষকে সম্মাননা জানানো হলে তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্মের উপলব্ধিগুলো ব্যাপৃত হবে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের রচয়িতা হিসেবে তিনি চট্টগ্রামবাসীকে গৌরবান্বিত করেছেন।

প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার বলেন, অধ্যাপক খালেদ ছিলেন চট্টগ্রামের বাতিঘর। তাঁর বিত্ত ছিলোনা, কিন্তু চিত্ত ছিলো। চিত্তের জোরেই তিনি চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন।

পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লেখক-সাংবাদিক শওকত বাঙালি বলেন, দীর্ঘ একযুগ ধরে আমরা দাবি জানাচ্ছি দৈনিক আজাদী কিংবা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেককে একুশে পদক এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার জন্য। কাউকে ছোট না করে আমি বলতে চাই-খালেক সাহেব কিংবা খালেদ সাহেবের চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাও একুশে কিংবা স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। সকল পদকের উর্ধ্বে থাকার এই মনীষীদের পদক প্রদান করা মানেই পদকটি সম্মানীয় হয়ে ওঠা। তিনি আগামী বছর বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র আজাদী কিংবা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ খালেককে একুশে পদক এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করার জোর দাবি জানান। পাশাপাশি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিকট একটি ফ্লাইওভার অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের নামে নামকরণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।

সম্মাননা প্রাপ্ত সাংবাদিক আতাউল হাকিম অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করার পর এই সম্মাননাটি আমি পেলে এটি আমার জন্য আরো অনেক বেশি সম্মানের হতো। আগামীতে যাঁরা এই সম্মাননা স্মারকে ভূষিত হবেন তাঁরা যেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করতে পারেন সে ব্যাপারে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি মুহাম্মদ ওসমান গণি চৌধুরী বলেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন সাধারণ চলাফেরায় অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানব এবং বিনয়ী চরিত্রের অধিকারী। বিলাসিতা তাঁর জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি। রাজনীতি যখন পঙ্কিলতার আবর্তে পতিত হয়েছিল সে সময় তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে দূরে রেখে তাঁর লেখনি, বিবেক ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।