অজ্ঞাত পচন রোগে চাষীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন ধনিয়া চাষ

প্রকাশ:| শনিবার, ১৫ মার্চ , ২০১৪ সময় ০৯:০৩ অপরাহ্ণ

নজরুল ইসলাম লাভলু, কাপ্তাই

”বিলাতি ধনিয়ার গ্রাম” হিসেবে পরিচিত কাপ্তাইয়ের ওয়া¹া ইউনিয়নের সাপছড়ি তংচংগ্যা পাড়া ও শীলছড়ি মারমা পাড়ার কয়েকশ’ উপজাতীয় পরিবার ধনিয়া চাষ বাদ দিয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছে। বছরের পর বছর ধরে এ এলাকার প্রায় ৫ শতাধিক পরিবার বিলাতি ধনিয়ার চাষ করে নিজেরা ¯া^বলম্বী হয়ে উঠেছিল। এ এলাকার ধনিয়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানী করা হতো। ফলে ওয়া¹া ইউনিয়নের এ এলাকা বিলাতি ধনিয়ার গ্রাম হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অজ্ঞাত রোগে ধনিয়া ক্ষেতে পচন রোগ দেখা দেওয়ায় কৃষকরা আর্থিকভাবে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ে। ওষুধ-দাওয়াই ব্যবহার করেও এ রোগের কবল থেকে ধনিয়া রক্ষা করতে না পারায় পরিবারগুলো ধনিয়া চাষ বাদ দিয়ে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

সংশি¬ষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিলাতি ধনিয়া রাঙামাটি পার্বত্য জেলার অর্থকরী ফসলের মধ্যে অন্যতম একটি। জেলার কাপ্তাইয়ের ওয়া¹া ইউনিয়নের সাপছড়ি ও শীলছড়ি মারমা পাড়া এলাকায় ব্যাপক আকারে চাষ করা হতো। জেলার কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ও ঘাগড়্ াএলাকার কিছু কিছু এলাকায়ও এর চাষ করা হতো। রাঙামাটি জেলা ছাড়াও খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার কয়েকটি এলাকায় বিলাতি ধনিয়ার চাষাবাদ হয়। মূলত কাপ্তাইয়ের সাপছড়ি ও মারমা পাড়ায় বাণিজ্যিকভাবে ধনিয়ার চাষ করা হতো। বিলাতি ধনিয়ার চাষ করে এলাকার অসংখ্য উপজাতীয় পরিবার নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়। সুত্র জানায়, ছায়াপ্রিয় নাতিশীতোষ্ণ থেকে উষ্ণ ও আদ্র অবহাওয়ায় বিলাতি ধনিয়া চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। অত্যাধিক শীতল আবহাওয়ায় বিলাতি ধনিয়ার বৃদ্ধি কমে যায়। অন্যদিকে প্রখর সূর্য্যালোকের চেয়ে ছায়াতে বা হালকা বিক্ষিপ্ত আলোতেই ভাল পাতা উৎপাদিত হয়ে থাকে। প্রায় সব ধরনের মাটিতে বিলাতি ধনিয়া জন্মে। তবে পাহাড়ী অঞ্চলে পাহাড়ের পাদদেশে এবং পাহাড়ের ঢালে বিলাতি ধনিয়ার ফলন বেশী হয়। যে কারনে এলাকার অধিকাংশ উপজাতীয় পরিবার অত্যন্ত লাভ জনক এই বিলাতি ধনিয়ার চাষে মনোনিবেশ করে। দেশে ও বিদেশে ব্যাপক চাহিদা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকায় এ ফসলটির উন্নয়ন ও আরো উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য কাপ্তাইয়ের রাইখালী কৃষি গবেষনা উপ কেন্দ্রের গবেষকগন গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনি অবস্থায় অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে একরের পর একর ধনিয়া ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। নানাবিধ ওষুধ ব্যবহার করেও পচনরোগের হাত হতে ধনিয়া রক্ষা করতে না পারায় কৃষকরা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।অর্থ খুইয়ে অনেক পরিবারকে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। ফলে উপজেলার কয়েকশ’ পরিবার ধনিয়া চাষ বাদ দিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। সামান্য কিছু পরিবার এখনও এ পেশা আকড়ে আছে।

এ ব্যাপারে শীলছড়ি মারমা পাড়ার বাসিন্দা ধনিয়াচাষী পাইুমং মারমা কারবারী জানান, দীর্ঘ ৮/১০ বছর যাবত তিনি বিলাতি ধনিয়া চাষ করে আসছেন। বেশ ক’বছর ভালই লাভ হওয়ায় চাষকৃত জমির পরিমার বাড়িয়ে দেন। সে অনুযায়ী ২০০৮-০৯ অর্থ বছর উপজেলার চিৎমরম এলাকায় বর্গা নিয়ে প্রায় ২শ’৪০ শতক জমিতে (স্থানীয়ভাবে ১০ কানি) বিলাতি ধনিয়ার চাষ করা হয়। চাষকৃত জমিতে বিভিন্ন জাতের প্রয়োজনমত সার সহ হালকা ছাউনি দেওয়া হয়।এতে তার ব্যয় হয় সাড়ে ৫ লাখ টাকা। যথা নিয়মে ধনিয়ার চারা গজায় এবং ধীরে ধীরে ধনিয়া বড় হতে থাকে। কিন্তু এক দেড় মাসের মাথায় ধনিয়া পাতা লাল হয়ে প্রথমে পাতায় পচন রোগ দেখা দেয়। এরপর ধীরে ধীরে ধনিয়ার গোড়ায় পচন লেগে পুরো গাছটি মরে যায়। এ অবস্থায় উপজেলা কৃষি অফিসের স্থানীয় ব¬ক সুপারভাইজারের পরামর্শ নিয়ে ধনিয়া ক্ষেতে ”দাইথেন-এম ” (¯েপ্র করা হয়) ও ”জিপসার” ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তাতে কোন উপকার পাওয়া যায়নি। ফলে চাষকৃত জমির পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যায়। এতে ধনিয়া চাষে ব্যয়কৃত পুরো টাকাই গচ্ছা যায় তার। বিপুল অংকের টাকা লোকসান দিয়ে তার অনেকটা পথে বসার উপক্রম হয়েছে। ধনিয়া চাষে লোকসান দিয়ে পাইমং মারমার মত শীলছড়ি মারমা পাড়ার চাষী পাইচিং মারমা, মংসুইচিং মারমা, শীলু অং মারমা, মংসু মারমা, সুইচাপ্র“ মারমা, চিংপ্র“ মারমা সহ অনেকে এখন ধনিয়া চাষ ছেড়ে দিয়েছে। তারা জীবিকার তাগিদে বর্তমানে অন্য পেশার সাথে জড়িয়ে পড়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কাপ্তাই উপজেলা কৃষি অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, ধনিয়া বীজ ছিটানোর পূর্বে যথাযথভাবে বীজ শোধন করা, জমিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হতে বিরত থাকা এবং কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী এমপিও এবং টিএসপি সার সুষম ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া সার্বক্ষনিক উপজেলা কৃষি অফিসের সাথে চাষীদের যোগাযোগ রক্ষা করার পরামর্শ দেন ঐ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, অর্থনৈতিভাবে বিলাতি ধনিয়ার ব্যাপক চাহিদা ও সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি অফিসের পরামর্শে কাজ করলে ধনিয়া চাষীদের ফসল মার খাওয়ার সম্ভাবনা নেই। প্রসংগত উল্লে¬খ্য, পার্বত্য অঞ্চল ছাড়া সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় সীমিত আকারে বিলাতি ধনিয়ার চাষ হয়ে থাকে। এছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে আর্জেন্টিনা, তুর®,‹ জর্ডান, জার্মানী, ভারতের ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের বিভিন্ন এলাকায় বিলাতি ধনিয়ার চাষ করা হয়। তবে ভিয়েতনাম এবং ওয়েষ্ট ইন্ডিজের ত্রিনিদাদ ও টোবাগো থেকে ছালাদ জাতীয়অর্থকরী ফসল হিসেবে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়। উৎপাদন খরচ বেশী সত্বেও দেশের ক্রমবর্দ্ধমান চাহিদা, উচ্চ বাজার মূল্য ও অধিক অয়ের কারনে (স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ২০০ টাকা) বিলাতি ধনিয়া পার্বত্যাঞ্চলে কৃষকদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিলাতি ধনিয়াকে ঘিরে পাইকারি ক্রেতা, আড়তদার ও বিক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এ এলাকার ধনিয়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো। বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে বাংলাদেশী হোটেলগুলোতে বিলাতি ধনিয়ার চাহিদা রয়েছে।