অকাল মৃত্যুর ছয় বছর পরও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের মহানায়ক মান্নার অভাবটা পূরণ হয়নি

প্রকাশ:| সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি , ২০১৪ সময় ১০:০৮ অপরাহ্ণ

অকাল মৃত্যুর ছয় বছর পরও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের মহানায়ক মান্নার অভাবটা পূরণ হয়নি। পর্দায় কিংবা নেতৃত্বে। অথবা চলচ্চিত্রের নানা দুঃসময়ে মান্নার মতো আর কাউকেই খুঁজে পায়নি চলচ্চিত্র শিল্প। দর্শকরাও পায়নি তাদের প্রাণপ্রিয় তারকা মান্নার বিকল্প কাউকে। পর্দায় জনগণের পক্ষে প্রতিবাদ করে দর্শকদের মনে স্থান করে নিতে পারেননি আর কেউই। ফলে মান্নার অভাবটা নিয়েই চলচ্চিত্র শিল্পকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে। কিন্তু এই হাঁটার মধ্যে কোন আনন্দ নেই, নেই সফল হওয়ার মতো কিছু আশার আলো। মান্নাবিহীন চলচ্চিত্রে এখনও কেবল হতাশা আর হতাশা। ছবি হচ্ছে, ডিজিটাল নামে নতুন প্রযুক্তিও যুক্ত হয়েছে। নতুন নায়ক-নায়িকা আসছে। কিন্তু দর্শক মনে মান্নার মতো দাগ কাটতে পারছেন না কেউই। তাই তো মান্নার অকাল এবং আকস্মিক মৃত্যুর ছয় বছর পরও একুশে পদকপ্রাপ্ত পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামকে আক্ষেপের সুরে বলতে হয়, মান্নার অভাব কি এতো সহজে পূরণ হয়? মান্নার অকাল মৃত্যু আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে একপ্রকার বিপদেই ফেলে গেছে। কারণ মান্না নেই তো প্রতিযোগিতা নেই, চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবার কেউ নাই। এসব না থাকলে কি আর কোন শিল্প চলে? চাষী নজরুল ইসলাম বলেন, ছয় বছরে তো অনেক নায়কই দেখলাম। কিন্তু একজনকেও তো মান্নার মতো পেলাম না। ঠিক একই ধরনের কথা মান্নার অসংখ্য সফল ছবির নায়িকা মৌসুমীর। তিনি বলেন, মান্না ভাই তো শুধু নায়কই ছিলেন না। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন চলচ্চিত্রপ্রেমী। ফিল্মের বাইরে আর কিছুই বুঝতেন না তিনি। কিভাবে ফিল্মের ভাল হবে, উন্নতি হবে, এসব চিন্তায় সময় ব্যয় হতো তার। এমন একজন মানুষের অভাব চলচ্চিত্র পূরণ করবে কাকে দিয়ে?
২০০৮ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য ছিল ভয়াবহ একটি দিন। এই দিনটির জন্য কেউ বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। আগের দিন মধ্যরাত পর্যন্ত যিনি শুটিং করেছেন, সকাল বেলায় তিনি আর নেই- এমন একটি সংবাদের জন্য কেউ কি কখনও অপেক্ষায় থাকে? চলচ্চিত্র শিল্পসহ পুরো দেশবাসীও ছিলেন না। একেবারে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো করেই ঘটে গেল ঘটনা। হঠাৎ মান্না চলে গেলেন না ফেরার দেশে। অবিশ্বাস্য এ ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে পুরো জাতি। নাম্বার ওয়ান নায়ক, পর্দায় প্রতিবাদী যুবক, চলচ্চিত্রের প্রধান ভরসা ইত্যাদি সবকিছুই তখন মান্না। তার অকাল ও আকস্মিক মৃত্যুতে থমকে যায় পুরো দেশ। সবারই এক কথা, এমন তো হওয়ার কথা নয়, কেন এমন হলো, এখন কি হবে, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। আর মান্না-ভক্তদের এফডিসির সামনে ভিড় প্রমাণ করে দেয়, মান্না মান্না-ই, তার কোন বিকল্প নেই। ওই দিন ঘটে অনেক অভাবনীয় ঘটনা। ইউনাইটেড হাসপাতালে হাজারো মানুষের জটলা। এফডিসির প্রধান দুটি সড়কে জনস্রোত। নাগরিক শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হয় সেখানে লাখ লাখ ভক্তের উপস্থিতির কারণে। মান্নার মরদেহ যাবে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু জনস্রোতের কারণে এফডিসি থেকে মরদেহ বের করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বাত্মক চেষ্টা- আকুলতা তখন এফডিসির সড়ক ছেড়ে বিভিন্ন ভবনের ছাদে, বিলবোর্ডের স্ট্যান্ডে। অন্যরকম এক পরিস্থিতি। চলচ্চিত্র শিল্প নতুন করে জানতে পারলো মান্নার আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। মান্নার মৃত্যুর পর অনেক কিছুই হলো, এলো অনেক আশ্বাস। এফডিসিতে ডিজিটাল কালার ল্যাবের নামকরণ করা হলো ‘মান্না ডিজিটাল কমপ্লেক্স’ নামে। কিন্তু আজ সেই নেমপ্লেটটা ভবন থেকে খুলে ফেলা হয়েছে। মান্না ফাউন্ডেশন ও মান্না স্মৃতি সংসদ গঠন করা হলো, যা এখন স্থবির। মান্নার নিজ হাতে গড়া প্রযোজনা সংস্থা কৃতাঞ্জলি চলচ্চিত্র আজ কর্মশূন্য। মান্নার নামে একটি মিউজিয়াম গড়ে তোলার কথা ছিল তার স্ত্রী শেলীর। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। মান্না যেখানে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে আছেন, সেখানকার রাস্তার নামকরণ মান্নার নামে করার আশ্বাস দিয়েছিলেন স্থানীয় পৌর মেয়র। কিন্তু সেটাও বাস্তবায়ন হয়নি। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ মান্নার উত্তরার বাসভবনে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে তার পরিবার। কিন্তু এফডিসিতে কোন আয়োজন নেই। তারপরও মান্না আছেন, মান্না থাকবেন তার অগনিত ভক্তের মাঝে। আজ চলচ্চিত্রের কোন দুঃসময় এলেই মান্নার কথা উঠে আসে। কোন আন্দোলনে নেতৃত্বের কথা উঠলেও ফুটে ওঠে মান্নার অভাব। কারণ, অশ্লীল ছবির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে মান্নাকে অস্ত্রের সামনে পড়তে হয়েছিল। তারপরও দমানো যায়নি তাকে। চলচ্চিত্রের অশ্লীলতা বন্ধে তার ভূমিকাও ছিল মনে রাখার মতো। আর পর্দার উপস্থিতি তো দর্শকরা কখনও ভুলতে পারবেন না। লুটতরাজ, আম্মাজান, তেজী, বর্তমান, কষ্ট, লাল বাদশা, উত্তরের খেপ, বীর সৈনিক, স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধ, দুই বধূ এক স্বামীসহ অসংখ্য হিট সুপারহিট ছবির নায়ক মান্নার অভাবটা পুরো চলচ্চিত্র শিল্পে এখনও পূরণ হয়নি। কোন দিন হবে বলেও কেউ মনে করেন না। তার মানে মরেও অমর হয়ে রইলেন মান্না